নিজস্ব প্রতিবেদক।।
দেশের উন্নয়নবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। রাজনৈতিকসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন অবহেলিত প্রায় ২ হাজার ৭০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশনায় প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদের ছুটির পর একাধিক সভার মাধ্যমে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হবে এবং দ্রুত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
এমপিদের সুপারিশে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন:
উন্নয়নবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। প্রতিটি এমপি নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা দেবেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, একজন এমপি সর্বোচ্চ তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠানে সংস্কারকাজের জন্য ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দিতে পারবেন। এসব তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করা হবে।
ব্যয় হতে পারে ৬ হাজার কোটি টাকা:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্পের বিস্তারিত ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
নতুন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই প্রকল্পটি অনুমোদন করানোর লক্ষ্যে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় জরুরি সংস্কার:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জরুরি সংস্কার, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, “বঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। ঈদের পর প্রকল্প আকারে কাজ শুরু করা হবে।”
ডিজিটাল ডাটাবেজ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা
শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজের অভাব, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং জনবল সংকট উল্লেখযোগ্য।
এসব সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংরক্ষণে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হবে।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বড় পরিকল্পনা:
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাকেন্দ্র, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস ভবন, লাইব্রেরি ও অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া জাতীয়করণ করা স্কুল-কলেজ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়ন জোরদার করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে—
৪,৭৬১টি স্কুল ও কলেজে নতুন ভবন নির্মাণ
৫,০৪১ প্রতিষ্ঠানের ভবন সম্প্রসারণ
১,০৯৯টি বেসরকারি কলেজ উন্নয়ন
৩২৫টি স্কুল ও ৩৪৩টি জাতীয়করণ করা কলেজের উন্নয়ন
পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন
মাদরাসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ
পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং সোলার এনার্জি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্বচ্ছতা ও দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা:
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন,
“শিক্ষাখাতে উন্নয়নের জন্য ভালো অবকাঠামো অপরিহার্য। দ্রুত কাজ শেষ করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজনৈতিক কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নতুন সরকার সেই বঞ্চনা দূর করে সব ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়।
বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার
শিক্ষামন্ত্রী জানান, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন করা হবে। সংসদ সদস্যদের দেওয়া তালিকা যাচাই করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ:
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের শিক্ষাখাতে অবকাঠামোগত বড় পরিবর্তন আসবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সঠিক নির্বাচন এবং সময়মতো কাজ শেষ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনা যত বড়ই হোক—বাস্তবায়নই হবে এর সাফল্যের মূল
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
