।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
রমজান এলেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি পরিচিত ও পরীক্ষিত চর্চা চোখে পড়ে—সংক্ষিপ্ত সময়সূচি, পরীক্ষা স্থগিত, সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিথিলতা এবং সর্বোপরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এটি কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং ধর্মীয় বাস্তবতা, সামাজিক অভ্যাস ও শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বিবেচনায় গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক রীতি।
কিন্তু চলতি বছর সেই রীতিতে ব্যতিক্রম ঘটেছে। নানা আলোচনা ও দ্বিধার পর ঘোষণা এসেছে—রমজানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বাস্তবসম্মত, নাকি নীতিগত অস্থিরতার আরেকটি উদাহরণ?
বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাস এ প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই দিয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত—প্রায় সব সরকার আমলেই রমজানে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ সময়েও এই রীতির ব্যত্যয় খুব একটা দেখা যায়নি। অর্থাৎ এটি কোনো দলের সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি জাতীয়ভাবে স্বীকৃত চর্চা।
রমজানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পেছনে যুক্তিগুলোও অযৌক্তিক নয়। বাংলাদেশ একটি মুসলমানপ্রধান দেশ—জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম। রোজা রেখে দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করা কিংবা পাঠদান করা শিশু-কিশোরদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল।
মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় রমজানের গুরুত্ব তো সর্বজনবিদিত। কোরআন তেলাওয়াত, দারস, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির জন্য এই মাসকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় সেই বাস্তবতা পুরোপুরি উপেক্ষা করে রমজানে ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সমাজের বড় একটি অংশের অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
শিক্ষক নেতাদের প্রতিক্রিয়াও তা-ই বলছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা জসিম উদদীন বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমরা দেখেছি রমজানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের কাছেও বোধগম্য নয়।” মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক নেতারাও একই প্রশ্ন তুলছেন—সবসময় বন্ধ থাকলে এবার খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষা বিশ্লেষক মনে করেন, “রমজানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা ধর্মীয় আবেগের বিষয় হলেও এটি একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর সক্ষমতা ও শিক্ষার মান রক্ষার প্রশ্ন। বিশ্বের বহু মুসলিমপ্রধান দেশ—মিসর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া—রমজানে শিক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘ বিরতি দেয়।”
অবশ্য আলিম সমাজের একটি অংশ ভিন্নমত পোষণ করেন। একজন প্রবীণ আলিম বলেন, “রমজান অলসতার মাস নয়। রাসুল (সা.)-এর যুগে যুদ্ধ হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনা হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রমও চলেছে।” এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা আর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক নয়। আজকের শিক্ষার্থীদের বয়স, পরিবেশ, জীবনযাত্রা ও চাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ মানে কি দীর্ঘ ছুটি? নাকি মুসলমানপ্রধান দেশ মানে মানুষের সক্ষমতা ও ধর্মীয় বাস্তবতা বিবেচনায় মানবিক সিদ্ধান্ত? বাস্তবতা হলো, রোজা রেখে নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ ক্লাস করলে শেখার মান কমে, উপস্থিতি কমে, আর শিক্ষার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—এটি সুপরিকল্পিত মনে হয় না। একবার বলা হলো খোলা থাকবে, পরে শোনা গেল ভিন্ন কথা। এই দ্বিধা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তহীনতা আস্থার সংকট তৈরি করে।
রমজান মুসলমানের জন্য পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। কিন্তু সেই পবিত্রতা রক্ষার অর্থ শিক্ষা কার্যক্রম জোর করে চালু রাখা নয়। বরং শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় রমজানে স্কুল বন্ধ রাখাই ছিল যুক্তিসংগত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়তো সাময়িক বিরতি দেয়, কিন্তু সেটি শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতি নয়—বরং বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার একটি দায়িত্বশীল পন্থা। সময়সূচি পুনর্বিন্যাস, পাঠ্যক্রম সামঞ্জস্য এবং পরিকল্পিত একাডেমিক ক্যালেন্ডারের মাধ্যমেই শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
রমজান আসবে, যাবে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় নেওয়া অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই আবেগ নয়, বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে রাষ্ট্র ও শিক্ষার জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
