অনলাইন ডেস্ক :
নতুন পাঠ্যপুস্তক পেতে বছরের প্রথম দিনেই ছেলেকে নিয়ে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার হাটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যান ভ্যানচালক মো. শফিউদ্দিন। তবে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাদের।
কারণ বই বাবদ ৭০০ টাকা চেয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। ওই টাকা দিতে না পারায় তাদের বই দেওয়া হয়নি। অথচ সরকারের দেওয়া ওই বই বিনামূল্যেই শিক্ষার্থীদের বিতরণ করার কথা। শফিউদ্দিন বলেন, অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে নতুন বই পেয়েছে। এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কেন টাকা চাইলেন? কেবল শফিউদ্দিনের ছেলেই নয়, ওই বিদ্যালয়ের ৫৪৪ শিক্ষার্থীও সেদিন নতুন পাঠ্যপুস্তক পায়নি টাকা না দিতে পারায়। কয়েকজন অভিভাবক প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা স্কুল কর্তৃপক্ষকে ওই অর্থ দিতে বাধ্য হন। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে হাটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর মোহাম্মদ রতন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, `আমি নতুন বইয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিইনি। ভর্তি ফি ও সেশন চার্জ হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।` হাটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়; সরকারের পক্ষ থেকে গত ১০ বছর ধরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করা হলেও অনেক স্কুলেই তা দেওয়া হচ্ছে না। বিনামূল্যের এই পাঠ্যবই `মূল্য` দিয়েই কিনতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। স্কুলের শিক্ষকরাই তা `বিক্রি` করছেন।
ম্যানেজিং কমিটির এক শ্রেণির অসাধু সদস্যও এতে জড়িত। এ ছাড়া বই বিতরণ নিয়ে চলছে নয়ছয়। নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কৌশল। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভর্তিতে বাড়তি টাকা আদায় করছে, বাড়তি অর্থ দিয়ে ভর্তি হতে না চাইলে বিনামূল্যের বই শিক্ষার্থীর হাতে দেওয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও বোর্ড বইয়ের সঙ্গে একাধিক সহায়ক বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা বিনামূল্যের বইয়ের `পরিবহন খরচ` বাবদ কিছু টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিচ্ছেন। অথচ পরিবহন খরচ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডই (এনসিটিবি) বহন করে। দেখা গেছে, বিনামূল্যের বই বিক্রির সুবিধার্থে অনেক প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থী সংখ্যা কাগজে-কলমে বেশি দেখিয়ে এনসিটিবিতে বাড়তি বইয়ের চাহিদা দেন। এনসিটিবির নিজস্ব তদন্তে সম্প্রতি তা ধরাও পড়েছে। এনসিটিবি এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পত্র দিয়েছে। বিনামূল্যের বই বিতরণের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে গত সপ্তাহে জামালপুরের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, বই নিয়ে নয়ছয় যারা করছেন বা বিক্রি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এটা তাদের এখতিয়ার। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনেকে বাড়তি বই নিয়েছেন, এটা আমরা সরেজমিন তদন্ত করে প্রমাণ পেয়েছি। এ বিষয়ে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি, ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি। চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৩২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৬ কোমলমতি ছাত্রছাত্রীর জন্য ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৬ কপি বই ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) দুই কোটি চার লাখ ৪১ হাজার ৫৯৫ ছাত্রছাত্রীর জন্য ৯ কোটি ৮৫ লাখ পাঁচ হাজার ৪৮০ কপি বই, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৯৭ হাজার ৫৭২ শিশুর জন্য পাঁচটি ভাষায় রচিত প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির দুই লাখ ৩০ হাজার ১০৩ কপি, ইবতেদায়ি (মাদ্রাসার প্রাথমিক) স্তরের ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৫ শিশুর জন্য দুই কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫ কপি, সারাদেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ৭৫০ শিক্ষার্থীর জন্য ৯ হাজার ৫০৪টি, মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি, কারিগরি স্তরের জন্য ১৬ লাখ তিন হাজার ৪১১ কপি, এসএসসি ভোকেশনালের জন্য ২৭ লাখ ছয় হাজার ২৮ কপি এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের জন্য এক লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৫ কপি বই এ বছর ছাপানো হয়। জানা গেছে, গত সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানকে জামালপুরের পাঁচটি বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তকের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছে। গত ৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ চিঠি দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে জানাতে বলেছে। একই সঙ্গে বিনামূল্যের বইয়ের জন্য টাকা নেওয়ার ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদনও দিতে বলেছে। জামালপুরে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠা বিদ্যালয়গুলো হলো- পালিশা উচ্চ বিদ্যালয়, পাতাদাহ উচ্চ বিদ্যালয়, শ্যামনগর উচ্চ বিদ্যালয়, ফুলজোড়া রহিম আফরোজ উচ্চ বিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ উচ্চ বিদ্যালয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসবের দিন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে বিনামূল্যের বই বিতরণ করে ওই বিদ্যালয়গুলো মন্ত্রণালয়ের অনুশাসন লঙ্ঘন করেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) মোমিনুর রশিদ আমিন বলেন, কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, তারা ভর্তির জন্য টাকা নিয়েছে, বইয়ের জন্য নয়। তবে এটা কৌশলী কথা। আমরা পরিস্কারভাবে বলে দিয়েছি, একই দিনে বিদ্যালয়ে বই বিতরণ ও ভর্তি করানো যাবে না।
১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস। সেদিন কেন তারা ভর্তি করাবে? তিনি বলেন, যারা বিনামূল্যের বইয়ের বাড়তি চাহিদা দিচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম জানান, মাঠপর্যায়ে এনসিটিবির তদন্ত দল এবার দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া চাহিদাপত্রের সঙ্গে সরবরাহ পাঠ্যবইয়ের তালিকা যাচাই করেছে।
বাস্তবে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা কত, বইয়ের চাহিদা কত দেখা হয়েছে। অতিরিক্ত চাহিদা দেওয়াদের চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী ২০২১ সালের বইয়ের চাহিদা নিরূপণের সময় যেন সরকারের অর্থের অপচয় না হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছে এনসিটিবি। সমকাল
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
