।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল এক প্যান্ডেল। বাইরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘ভাগ্যের মহানিলাম’। ভেতরে হাজারো মানুষের ভিড়, সবার চোখেমুখে প্রত্যাশার ঝিলিক। মঞ্চের ওপর একটি রুপালি হাতুড়ি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন এক সুবেশধারী নিলামকারী।
মঞ্চের মাঝখানে একটি কাঁচের বাক্সে রাখা কিছু ধুলোমাখা কাগজ। নিলামকারী হাতুড়ি ঠুকে ঘোষণা করলেন, “ভদ্রমহোদয়গণ, আজ আমাদের শেষ লট। এখানে আছে আগামী পাঁচ বছরের শিক্ষা, চিকিৎসা আর দু-বেলা অন্নের নিশ্চয়তা। অর্থাৎ, সাধারণের নসিব। ডাক শুরু হোক!”
পেছনের শারি থেকে একজন বিশালদেহী ব্যবসায়ী হাত তুললেন, “আমি এক হাজার কোটি টাকা দেব! বিনিময়ে ওই নসিবের ভেতর থেকে আমার কারখানার জন্য সস্তা জমি আর কর মওকুফের সুবিধা চাই।”
পাশ থেকে একজন প্রভাবশালী নেতা হাসলেন। তিনি বললেন, “আমি দেব পাঁচ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর এক চিমটি আবেগ। বিনিময়ে আমার চাই ওই বাক্সে থাকা মানুষের আনুগত্যের সই।”
জনতার ভিড়ের একদম শেষে জীর্ণ পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা এক কৃষক বিড়বিড় করে বললেন, “আমার কাছে তো টাকা নেই, শুধু একটা ভোট আছে। ওটা কি নিলাম হবে?”
নিলামকারী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, “আপনার ওই একটি ভোট তো মুদ্রামাত্র, কিন্তু আসল দরদাম তো পর্দার আড়ালে বড় নোটেই হয়ে গেছে। আপনি শুধু দেখবেন আপনার নসিব কার পকেটে যাচ্ছে।” হাতুড়ির শব্দে প্যান্ডেল কেঁপে উঠল—এক, দুই, তিন! বিক্রি হয়ে গেল! কৃষকটি তাকিয়ে দেখলেন, তার আগামী পাঁচ বছরের ভাগ্য কোনো এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরের ড্রয়ারে বন্দি হতে চলেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৮ বছর। একটি শিশুর জন্ম থেকে পূর্ণবয়স্ক নাগরিক হয়ে ওঠার দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ বিরতির পর যখন একটি দেশ নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়ায়, তখন তাকে ঘিরে আবেগ, উত্তেজনা আর প্রত্যাশার পারদ আকাশছোঁয়া হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজপথে এখন যে হাওয়া বইছে, তাকে ঠিক গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বলা যাচ্ছে না; বরং একে মনে হচ্ছে এক বিশাল ‘নিলামঘর’। ১২ ফেব্রুয়ারির ডেডলাইন সামনে রেখে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এক বিচিত্র নিলাম। পণ্যটি কোনো জড় বস্তু নয়, পণ্যটি হলো আপনার-আমার আগামী পাঁচ বছরের ‘নসিব’ বা ভাগ্য।
গণতন্ত্রের আভিধানিক অর্থ যা-ই হোক না কেন, ভোটের মৌসুমে এর ব্যবহারিক রূপ দাঁড়ায় এক বিশাল বাজারের মতো। রাজনৈতিক দলগুলো এখানে একেকজন বড় নিলামি ডাকদার। তারা রাজপথে মঞ্চ সাজিয়ে প্রতিশ্রুতি বা ‘বিড’ ছুড়ে দিচ্ছেন। কেউ বলছেন ফ্রি রেশনের কথা, কেউ বলছেন বেকারের ভাতা, কেউ বা আবার পরকালের জান্নাতের টিকিটের গ্যারান্টি দিচ্ছেন। এই যে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, একে যদি আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব এখানে ভোটারের অধিকারের চেয়ে নেতার ‘ক্রয়ক্ষমতা’ বেশি প্রদর্শিত হচ্ছে। ভোটার যেন এখানে নাগরিক নন, বরং নিলামঘরের একজন সস্তা পণ্য, যাকে সবচেয়ে লোভনীয় অফার দিয়ে নিজের বাক্সে ভরতে হবে।
একটি প্রজন্ম ভোট দিতে না পেরে বড় হয়েছে। তাদের মনে জমা ছিল এক সমুদ্র অভিমান। রাজনৈতিক দলগুলো সেই ক্ষোভকে পুঁজি করছে। গত দেড় দশকে যারা ক্ষমতার মধু চেটেছেন, তারা এখন সাধু সাজছেন; আর যারা ক্ষমতার বাইরে থেকে ধুঁকছিলেন, তারা এখন ‘বিপ্লবী’ বুলি আউড়াচ্ছেন। এই যে ১৮ বছরের নীরবতা, একে ভাঙার জন্য যে গভীর রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন ছিল, তার বদলে আমরা দেখছি সস্তা পপুলিজম। নেতাদের বিনয় এখন চোখে পড়ার মতো। যে নেতা মাসখানেক আগেও এসি রুমের বাইরে পা রাখতেন না, তাকে এখন দেখা যাচ্ছে চায়ের দোকানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাটির কাপে চা খেতে। এই যে ভোলবদল, এটা কি গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা, নাকি স্রেফ নিলামে জেতার কৌশল?
বাংলাদেশের নির্বাচনে ধর্ম সবসময়ই একটি বড় কার্ড। এবারের নিলামে এই কার্ডের ব্যবহার আরও প্রকট। টুপি আর ঘোমটার যে সমারোহ আমরা দেখছি, তা মূলত ৯৫ শতাংশ মুসলিম ভোটারকে তুষ্ট করার একটা স্থূল প্রচেষ্টা। রাজনীতির ময়দানে ইহজাগতিক চাহিদা (যেমন চাল, ডাল, তেল) মেটানোর পাশাপাশি যখন ‘পরকালের মুক্তি’র গ্যারান্টিও দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্র আর যুক্তির স্তরে নেই, তা অপকৌশলের স্তরে নেমে গেছে। ভোটারদের আবেগ কিনে নেওয়ার এই যে দরদাম, তা প্রকারান্তরে একজন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে অপমান করার শামিল।
একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচন কেমন হবে, তা ঠিক করবে ওই দেশের জনগণ। কিন্তু আমাদের ট্র্যাজেডি হলো, আমরা নিজেদের চেয়েও বেশি ভরসা করি বিদেশি ‘ফতোয়ার’ ওপর। নির্বাচনের পর কে হারল আর কে জিতল, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—ওয়াশিংটন কী বলল? লন্ডন বা দিল্লি খুশি তো? এটি একটি অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক গোলামি। যখন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা ‘হ্যাঁ’ বলেন, তখন কারচুপির পাহাড় থাকলেও আমরা তা মেনে নিতে বাধ্য হই। আমাদের নসিবের এই নিলামে শুধু দেশি রাজনৈতিক দল নয়, অদৃশ্যভাবে অংশ নেয় বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোও। তাদের সমর্থন বা বিরোধিতার ওপর নির্ভর করে আমাদের আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কোটি কোটি নতুন ভোটার। এরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব, এরা প্রযুক্তিবান্ধব এবং এরা পুরনো ঘরানার জরাজীর্ণ রাজনীতি দেখে বিরক্ত। রাজনৈতিক দলগুলো এদের ধরতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এই তরুণদের নসিব কে কিনবে? যারা তাদের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখাবে, নাকি যারা তাদের ডিজিটাল সার্কাসে ব্যস্ত রাখবে? তরুণরা যদি এই নিলামঘরের সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে, তবে তারাও একসময় এই পচালাগা রাজনীতিরই অংশ হয়ে যাবে।
নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর আমরা জানি কী ঘটবে। যিনি জিতবেন, তিনি বলবেন—এটি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম নির্বাচন। আর যিনি হারবেন, তিনি কারচুপির ফিরিস্তি নিয়ে বিদেশের দরবারে ধরনা দেবেন। মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হবে সাধারণ মানুষের সেই ভাগ্য বা নসিব। জিতলে নেতারা রাজপ্রাসাদে যান, হারলে তারা রাজপথে আন্দোলন করে জনজীবন অতিষ্ঠ করেন। কোনো অবস্থাতেই সাধারণ মানুষের জীবনের মান বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ আমরা এই নিলামে দেখতে পাই না।
নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল একটি সুন্দর প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই পরিবেশ কতটা বিদ্যমান? এক পক্ষ আরেক পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। জেতা মানেই হাতে স্বর্গ পাওয়া—এই মানসিকতা রাজনীতিকে কুরুক্ষেত্রে পরিণত করেছে। যখন জয়-পরাজয় জীবনের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন নীতি-নৈতিকতা আর থাকে না। তখন পেশিশক্তি, কালো টাকা আর প্রভাবের চূড়ান্ত ব্যবহার শুরু হয়। আমাদের ভাগ্য এই হিংস্রতার বলির পাঁঠা হতে চলেছে।
গণতন্ত্রের এই নিলামঘরে আপনি একজন নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন, নাকি আপনার নসিবের মালিকানা নিজের হাতে রাখবেন—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ১২ ফেব্রুয়ারি মাত্র একদিনের খেলা। কিন্তু এই একদিনের কেনাবেচা আপনার পরবর্তী ১৮২৫ দিনের হিসাব লিখে দেবে।
নেতারা বাড়িতে আসবেন, হাত মেলাবেন, টুপি পরবেন কিংবা আবেগী ভাষণ দেবেন—এসবই নিলামের দর হাঁকানোর অংশ। মনে রাখবেন, যিনি আজ সবচেয়ে বড় দাম হাঁকছেন, তিনিই হয়তো কাল সবচেয়ে বেশি চড়া সুদে তা আপনার কাছ থেকেই উসুল করে নেবেন। গণতন্ত্রের এই তথাকথিত নিলামঘর থেকে নিজের নসিবকে রক্ষা করতে হলে ভোটারকে সস্তা আবেগ বাদ দিয়ে কঠিন যুক্তির পথে হাঁটতে হবে। নাহলে, ১৮ বছর পর যে সুযোগটি এসেছে, তা কেবল একজন শোষকের বদলে অন্য একজন শোষককে ক্ষমতায় বসানোর উৎসবে পরিণত হবে।
ফেলানীর লাশ যেমন কাঁটাতারে ঝুলে ছিল, আমাদের নসিব যেন ভোটের পর ব্যালট বাক্সের কাঁটাতারে ঝুলে না থাকে—সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কারণ, গণতন্ত্র যখন নিলামে ওঠে, তখন সবচেয়ে বড় লোকসানটা হয় সাধারণ মানুষের।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
