।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
নীলক্ষেতের মোড়ে দাঁড়িয়ে হন্যে হয়ে বই খুঁজছিলেন এনামুল হক। পেশায় তিনি একজন নিরাপত্তা প্রহরী। সারা মাস হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যে বারো হাজার টাকা বেতন পান, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনতেই হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু জানুয়ারি মাস মানেই সন্তানের নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ, আর এনামুল হকের মতো বাবাদের জন্য একরাশ দুশ্চিন্তা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া দুই সন্তানের জন্য মাত্র পাঁচ-ছয়টি বই আর খাতা-পেন্সিল কিনতে গিয়ে দোকানদার যখন দুই হাজার টাকার হিসাব মেলালেন, এনামুল হকের কপালে তখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন, সেই পরিমাণ টাকা তার কাছে নেই। শেষমেশ মাথা নিচু করে ভিড়ের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। তার চোখেমুখে কোনো অভিযোগ নেই, আছে কেবল এক গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতা এনামুল হকের একার নয়; বরং এটি আজ বাংলাদেশের কোটি নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ চিত্র।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক বছরে শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। গত বছরের জানুয়ারিতে যে বইয়ের সেট ৮৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এবার তার দাম পড়ছে ১,৩০০ টাকার ওপরে। ডজনপ্রতি পেন্সিলের দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০-১৩০ টাকায়। শুধু কি বই-খাতা? একটি সাধারণ মানের স্কুল ব্যাগের দাম এখন ৮০০ টাকার নিচে নয়।
অভিভাবক তানিয়া ইসলামের কন্ঠে ঝরে পড়ল তীব্র ক্ষোভ। তিনি বলেন, “নতুন বছর অনেকের জন্য উৎসবের হলেও আমাদের জন্য এটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাল, ডাল, তেলের দাম তো আগে থেকেই নাগালের বাইরে, এখন বাচ্চাদের পড়ার খরচ মেটাতে গিয়ে আমাদের একবেলা না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।” প্লে থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতেই পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।
দশ বছর বয়সী শিশু রাফি (ছদ্মনাম) এবার চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেছে। নতুন ক্লাসে নতুন ব্যাগ আর রঙিন মলাটের বইয়ের স্বপ্ন ছিল তার চোখে। কিন্তু বাবার অসহায় মুখ দেখে সে নিজের চাহিদার কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। রাফি জানায়, “আগের চেয়ে খাতার পৃষ্ঠা কমে গেছে, কিন্তু দাম বেড়েছে। কলম কিনতে গেলে দোকানদার ১০ টাকার নিচে কোনো ভালো কলম দিতে চায় না। স্কুলের স্যাররা নতুন ড্রেসের কথা বলছেন, কিন্তু বাবা বলেছেন এবার পুরনোটা দিয়েই চালাতে হবে।” শিশুদের এই যে ছোটবেলা থেকেই অভাবের সাথে লড়াই করে বেড়ে ওঠা, এটি তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ালেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে কেবল অর্থাভাবে।
শিক্ষা খাতের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে শিক্ষক নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে শিক্ষাসামগ্রীর দাম বাড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে শিক্ষা কেবল ধনীদের জন্য সংরক্ষিত হতে যাচ্ছে। আমরা দেখছি স্কুলে অনুপস্থিতির হার বাড়ছে। অনেক অভাবী অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিভিন্ন গ্যারেজ বা দোকানে কাজে লাগিয়ে দিচ্ছেন।”
শিক্ষাবিদদের মতে, ২০২৫ সালের বিআইডিএস-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, অনেক পরিবারকে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে ঋণ করতে হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঝরে পড়ার হার ১৩.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬.২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
প্রশ্ন উঠছে, এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির পেছনে আসল কারণ কী? সরকার কি যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে? বাজারে উপকরণের সংকট ও ডলারের দাম বৃদ্ধির দোহাই দেওয়া হলেও এর পেছনে শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। এনসিটিবি থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হলেও বেসরকারি স্কুলগুলোতে যে বইগুলো পাঠ্য করা হয়, সেগুলোর প্রকাশনী ও দামের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
কাগজের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে প্রকাশকরা বইয়ের দাম দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। অথচ কাগজ আমদানিতে শুল্ক ছাড় কিংবা ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে এই দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল। বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এখানে স্পষ্ট। নীলক্ষেত বা নয়াবাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারগুলোতে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের কোনো শক্তিশালী অভিযান দৃশ্যমান নয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, কাগজ তৈরির পাল্প, কালি এবং প্লাস্টিক উপকরণের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে। ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে সমস্যা হওয়ায় ব্যাগ বা জ্যামিতি বক্সের কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেড়েছে। কিন্তু এই যুক্তি কি শতভাগ সত্য? যখন দেখা যায় একই মানের পণ্য একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে, তখন স্পষ্ট হয় যে এখানে ‘অদৃশ্য হাত’ কাজ করছে। উপকরণের সংকট থাকলেও তা কি এক বছরে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা রাখে? মোটেও না। এটি মূলত তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লাভের প্রচেষ্টা।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে:
© শিক্ষাসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল বিশেষ করে কাগজ ও কালির ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে এবং আমদানিতে ভর্তুকি দিতে হবে।
© বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে প্রতিদিন বাজারে অভিযান চালাতে হবে। কৃত্রিম সংকট তৈরিকারীদের জেল ও জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে।
© বেসরকারি স্কুলের পাঠ্যবইয়ের দাম নির্ধারণে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে প্রকাশকরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে না পারে।
© দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ঋণের ব্যবস্থা এবং উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়াতে হবে যাতে ঝরে পড়ার হার কমে।
© ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে এবং ই-বুকের ব্যবহার বাড়িয়ে কাগজের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমানোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি বাজার সিন্ডিকেটের চাপে ভেঙে পড়ে, তবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এনামুল হক বা তানিয়া ইসলামের মতো সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন আকাশকে ভারী না করে, সেদিকে রাষ্ট্রকে খেয়াল রাখতে হবে। শিক্ষাসামগ্রীর দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতায় রাখা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আজ যদি আমরা অর্থের অভাবে হাজার হাজার মেধাবী প্রাণকে শ্রমবাজারে ঠেলে দিই, তবে আগামী দিনে দক্ষ জনশক্তির অভাবে দেশ আরও পিছিয়ে পড়বে। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে এবং কার্যকরী নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষা খাতকে বাণিজ্যমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, পেনসিল বা খাতার দাম বাড়লে শুধু শিক্ষার্থীর খরচ বাড়ে না, বাড়ে একটি জাতির পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
