এইমাত্র পাওয়া

দশ তলার কংক্রিট বনাম গাছতলার প্রশান্তি: সুখের এক বিপরীত সমীকরণ

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

শহরের ব্যস্ততম মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সেই অ্যাপার্টমেন্টের দশ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা রহমান সাহেব। পায়ের নিচে দামি মার্বেল পাথর, মাথার ওপর ঝকঝকে ঝাড়বাতি, আর ঘরে এসির কৃত্রিম শীতলতা। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করছে।

জানলার কাঁচের ওপারে দেখা যাচ্ছে দূরে এক বিশাল বটগাছ, যার নিচে এক রিকশাচালক গামছা বিছিয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। রহমান সাহেব ভাবলেন, “এই যে কয়েক কোটি টাকার ফ্ল্যাট, বিলাসিতার সব আয়োজন—তবুও কেন দুপুরের এই তপ্ত রোদে ওই গাছতলার মানুষটার মতো প্রশান্তি আমার নেই?”

এই দীর্ঘশ্বাস কেবল রহমান সাহেবের নয়, আধুনিক নগর সভ্যতার প্রতিটি মানুষের। আমরা যত উপরে উঠছি, মাটি থেকে তত দূরে সরে যাচ্ছি। দশ তলার এই কংক্রিটের খাঁচায় বিলাসিতা আছে, কিন্তু শান্তি যেন সেই গাছতলার ছায়াতেই রয়ে গেছে।

শান্তি বা সুখ বস্তুগত প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে না—এই সত্যটি যুগে যুগে মনিষীরা বলে গেছেন। গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাস বলেছিলেন,-“যাকে অল্পতে তুষ্ট করা যায় না, কোনো কিছুই তাকে তৃপ্ত করতে পারে না।”

আমাদের আধুনিক জীবন যেন এই অতৃপ্তির এক মহাকাব্য। আমরা বড় দালান বানাচ্ছি, কিন্তু পরিবারগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। আরাম বাড়াচ্ছি, কিন্তু ঘুম কমিয়ে ফেলছি। লিও টলস্টয় তার ‘হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ এ ম্যান নিড’ গল্পে দেখিয়েছিলেন, মানুষের লোভের কোনো শেষ নেই, অথচ দিনশেষে তার শান্তির জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটি।

দশ তলার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখি ঠিকই, কিন্তু আত্মার শান্তি খুঁজে পাই না কারণ সেখানে মাটির সোঁদা গন্ধ নেই, নেই প্রকৃতির সহজ সান্নিধ্য।

সমাজবিজ্ঞানীরা বর্তমান এই পরিস্থিতিকে ‘Urban Alienation’ বা ‘নগর বিচ্ছিন্নতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম তার ‘অ্যানোমি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যখন তার সামাজিক ও প্রাকৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার মধ্যে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হয়।

দশ তলার ফ্ল্যাট কালচার আমাদের একাকী করে দিয়েছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকছে, কার বিপদ—সে খবর আমরা রাখি না। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আমাদের মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নেয়। অন্যদিকে, গাছতলার জীবন বা গ্রামীণ জীবন ছিল সামষ্টিক। সেখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে কথা বলত, মানুষের সাথে মিশত।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়েছে প্রকৃতির মাঝে থাকার জন্য, চার দেয়ালের বন্দিত্বের জন্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজের ছোঁয়া মানুষের রক্তচাপ কমায় এবং কর্টিসল (মানসিক চাপের হরমোন) হ্রাস করে। তাই দশ তলার এসি রুমের চেয়ে গাছতলার প্রাকৃতিক অক্সিজেন অনেক বেশি কার্যকর।

ইসলাম ধর্ম শান্তির মূল উৎস হিসেবে আত্মিক প্রশান্তি বা ‘নাফসে মুতমাইন্নাহ’কে গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ: ২৮)

অর্থাৎ, শান্তি কোনো ইট-পাথরের প্রাসাদে নেই, শান্তি আছে স্রষ্টার সান্নিধ্যে এবং সরলতায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবন ছিল চরম সাদাসিধে। তিনি মাদুর বিছিয়ে ঘুমাতেন, যার দাগ তাঁর পিঠে পড়ে যেত। সাহাবীরা যখন তাকে গদি বা আরামদায়ক বিছানার প্রস্তাব দিলেন, তিনি বললেন, “দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক তো একজন পথচারীর মতো, যে ক্লান্ত হয়ে গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় এবং আবার পথে নামে।” (তিরমিযী)।

গাছতলা এখানে কেবল একটি স্থান নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি আমাদের শেখায় যে, আমরা এই পৃথিবীতে মুসাফির। মুসাফিরের জন্য দশ তলার বিলাসিতার চেয়ে একটি গাছের শীতল ছায়াই যথেষ্ট। হাদিসে আরও এসেছে, “প্রকৃত সম্পদ হলো অন্তরের সচ্ছলতা।” আমাদের দশ তলা আছে কিন্তু অন্তরের সচ্ছলতা নেই বলেই আমরা গাছতলার ওই নিঃস্ব মানুষের প্রশান্তিকে হিংসে করি।

আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রযুক্তির দাসে পরিণত হয়েছি। দশ তলায় বসে আমরা ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে প্রকৃতির ছবি দেখি, কিন্তু জানলা খুলে সরাসরি প্রকৃতির দিকে তাকানোর সময় আমাদের নেই। আমাদের পায়ের নিচে মাটি নেই, আছে টাইলস। মাথার ওপর আকাশ নেই, আছে সিলিং। এই কৃত্রিমতা আমাদের শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিষণ্ণ করে তুলছে।

বাস্তবতা হলো, আমরা দশ তলা ছাড়তে পারব না, কারণ আধুনিক জীবনের দাবি অনেক। কিন্তু আমরা কি পারি না আমাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা ‘গাছতলা’ ফিরিয়ে আনতে? আমরা কি পারি না বারান্দায় একটু বাগান করতে, বা প্রতিদিন কিছুটা সময় মাটির ওপর হাঁটতে? যান্ত্রিকতা যখন মানুষের আবেগ গিলে ফেলে, তখনই দশ তলা অভিশাপ মনে হয়।

দশ তলার কংক্রিট আমাদের নাগরিক সুবিধা দেয়, নিরাপত্তা দেয়; কিন্তু শান্তি দিতে পারে না। শান্তি আসলে কোনো উচ্চতায় বা অট্টালিকায় বাস করে না, শান্তি বাস করে আমাদের সন্তুষ্টির মধ্যে। গাছতলা হলো সেই প্রতীকী ঠিকানা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা মাটির মানুষ, মাটিতেই আমাদের শান্তি।

জীবনকে কেবল অর্থের মাপকাঠিতে না মেপে যদি আমরা সম্পর্কের গভীরতায়, প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং স্রষ্টার আনুগত্যে সাজাতে পারি, তবে দশ তলার ওপর দাঁড়িয়েও আমরা সেই গাছতলার প্রশান্তি অনুভব করতে পারব। মনে রাখতে হবে, দিনশেষে আমরা সবাই ক্লান্ত পথিক। আমাদের গন্তব্য কোনো দালান নয়, বরং সেই মাটি—যেখান থেকে আমাদের সৃষ্টি। তাই কৃত্রিমতার খোলস ছেড়ে মাঝেমধ্যে শিকড়ের টানে মাটির কাছাকাছি আসা প্রয়োজন। কারণ, দশ তলায় কেবল শরীর থাকে, কিন্তু আত্মা শান্তি পায় সেই অবারিত গাছতলার ছায়াতেই।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.