।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রমজান মুসলমানদের জীবনে শুধু একটি মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম, মানবিকতা ও সামাজিক সংবেদনশীলতার অনুশীলনের সময়। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডার, সামাজিক জীবন ও শিক্ষা ব্যবস্থায় রমজানের একটি স্বাভাবিক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান।
অথচ ২০২৬ সালের শিক্ষাপঞ্জিতে রমজান মাসের প্রথম ১৮ দিন সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক এবং নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একই সময়ে মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরো মাস ছুটিতে থাকবে—এই বাস্তবতা শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অস্বস্তিকর বিভাজনের চিত্র তুলে ধরছে।
একই দেশের শিক্ষার্থী, একই ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা—তবু কেন এক ধরনের প্রতিষ্ঠানে রমজানজুড়ে ছুটি, আর অন্যটিতে নিয়মিত ক্লাস? এটি কি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রয়েছে নীতিগত অসংগতির ছাপ?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বহুস্তরবিশিষ্ট—প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারায় বিভক্ত। এই বিভাজন কাঠামোগত হলেও শিক্ষার্থীদের সামাজিক বাস্তবতা এক ও অভিন্ন। একজন মাদ্রাসার ছাত্র যেমন রোজা রাখে, ঠিক তেমনি একজন স্কুলের শিক্ষার্থীও রাখে।
রমজানে একজন শিশুর শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক মনোযোগ ও দৈনন্দিন রুটিন স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হয়। অথচ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এই সাধারণ সত্যটি যেন উপেক্ষিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হতে পারে—পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা, শিক্ষাবর্ষের সময়সীমা রক্ষা করা কিংবা পরীক্ষার চাপ সামলানো। কিন্তু এসব যুক্তি কি ধর্মীয় বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের সুস্থতার ঊর্ধ্বে? অতীতে বহু বছর ধরেই রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থেকেছে বা সংক্ষিপ্ত সময়সূচিতে পরিচালিত হয়েছে। তাহলে হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?
রমজানে স্কুল খোলা রেখে মাদ্রাসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘বৈষম্যমূলক’ বলছেন। এই বৈষম্য শুধু ধর্মীয় অনুভূতির জায়গায় নয়, বরং শিক্ষানীতির সামঞ্জস্যের প্রশ্নেও প্রযোজ্য। রাষ্ট্র যখন এক ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধর্মীয় বাস্তবতা বিবেচনায় ছুটি দেয়, তখন অন্য ধারার শিক্ষার্থীদের একই বাস্তবতা অস্বীকার করা ন্যায্য হতে পারে না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শহরাঞ্চলের বহু বেসরকারি স্কুলে দীর্ঘ সময় ক্লাস, অতিরিক্ত কোচিং ও পরীক্ষা নেওয়া হয়। রোজার মধ্যে এসব কার্যক্রম চালু থাকলে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে শিক্ষা গ্রহণ আনন্দের বদলে হয়ে ওঠে এক ধরনের কষ্টকর দায়।
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের সামগ্রিক বিকাশের প্রক্রিয়া। রমজান মাসে একজন শিক্ষার্থী ভোরে সেহরি খেয়ে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যায়, সারাদিন রোজা রেখে ক্লাস করে, বিকেলে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরে—এই চিত্র বাস্তব ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আরও কঠিন।
শিক্ষা যদি মানবিক না হয়, তবে তা কেবল সনদ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও নজর দেওয়া। রমজান মাসে পূর্ণাঙ্গ ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত সেই মানবিক বিবেচনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে। রমজান মাস এবং ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সময় ও উৎসব। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে এই বিষয়গুলোর প্রতিফলন থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
বিশ্বের বহু মুসলিম দেশে রমজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি, সংক্ষিপ্ত ক্লাস বা বিশেষ সময়সূচি চালু থাকে। এমনকি অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য রমজানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশে উল্টো চিত্র দেখা গেলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা কি আমাদের সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো শিক্ষানীতি গ্রহণ করছি?
রমজানে স্কুল ছুটি চেয়ে রিট আবেদন দায়ের হওয়া প্রমাণ করে যে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। আদর্শ অবস্থায় এমন একটি বিষয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন পড়ার কথা নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক সংগঠন, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ছিল।
রিট আবেদনটি শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতিবাদ। এটি দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যখন সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখন সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষক সমিতির সেক্রেটারি প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন বলেন-রোজা ও শিক্ষা কার্যক্রম একসঙ্গে চালানো শারীরিকভাবে শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাই দীর্ঘ-সময় বিদ্যালয় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
শিক্ষক নেতা জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, রমজান মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার বর্তমান সিদ্ধান্ত বাস্তবতা ও মানবিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, রোজা রেখে দীর্ঘ সময় ক্লাস করা মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। শিশু-কিশোরদের শারীরিক সক্ষমতা, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখানে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, একই দেশে মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরো মাস বন্ধ থাকবে, অথচ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আংশিক খোলা থাকবে—এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভ্রান্তি ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। একজন শিক্ষার্থী রোজা রাখছে—সে কোন ধারার শিক্ষার্থী, তা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। শিক্ষা নীতিতে সামঞ্জস্য না থাকলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সম্মিলিত নন এমপিও ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সমন্বয়ক অধ্যক্ষ মুনিমুল হক বলেন–রমজান প্রতি বছরই আসে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। সুতরাং শিক্ষাপঞ্জি এমনভাবে প্রণয়ন করা সম্ভব, যাতে রমজানে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং শিক্ষাবর্ষও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তিনি বলেন, শিক্ষা যদি মানবিক না হয়, তবে তা কার্যকর হয় না। তাই রমজান মাসে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একক ও শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশের প্রশ্ন খুব সাধারণ—রমজান মাসে কয়েকদিন স্কুল খোলা রাখলেই বা কী এমন উপকার হবে? পাঠ্যসূচি কি সত্যিই এতটাই পিছিয়ে পড়বে যে শিক্ষার্থীদের রোজার কষ্ট উপেক্ষা করতেই হবে? অভিভাবকদের মতে, শিক্ষার নামে সন্তানদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষ করে মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা এখনো শারীরিকভাবে পূর্ণ সক্ষম নয়। অনেক শিক্ষার্থী জীবনের প্রথম রোজাগুলো রাখে এই বয়সেই। রোজা রেখে দীর্ঘ সময় ক্লাস করা, পরীক্ষা দেওয়া বা কোচিংয়ে বসা—তাদের জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী খোলাখুলিই বলছে, “রোজা রেখে ক্লাসে বসে পড়ায় মনোযোগ দেওয়া যায় না, মাথা ঘোরে, শরীর দুর্বল লাগে।”
শিক্ষার্থীদের ভাষায়, রমজান মাস বিশ্রাম ও আত্মসংযমের সময়। এই সময়ে স্কুল বন্ধ থাকলে তারা শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই পালন করবে না, বরং মানসিকভাবে সতেজ হয়ে ঈদের পর নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় ফিরতে পারবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানই বরং উন্নত হবে।
রমজান মাসে শিক্ষা বিভাজন কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; এটি আমাদের নীতিনির্ধারণী দর্শনের প্রতিফলন। আমরা কি শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানবিক ও বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে চাই, নাকি কেবল কাগুজে ক্যালেন্ডার রক্ষা করাই আমাদের লক্ষ্য?
মাদ্রাসা ছুটিতে, স্কুলে ক্লাস—এই দ্বৈততা শুধু প্রশ্নই তোলে না, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানায়। সময় এসেছে একক, সংবেদনশীল ও ন্যায্য শিক্ষানীতির—যেখানে ধর্মীয় বাস্তবতা, শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একসূত্রে মিলিত।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
