।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। একটি বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের স্থান নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক মানদণ্ড, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের কারখানা। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রশ্ন জাগে—এটি কি শুধুই শিক্ষক বদলের জটিলতা, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। প্রশাসনিক প্রয়োজনে, শৃঙ্খলা রক্ষায় কিংবা যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পর যদি শিক্ষককে প্রকাশ্যে হামলার শিকার হতে হয়, আর শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয়—তবে বুঝতে হবে, সমস্যা শুধু প্রশাসনিক নয়; সমস্যা গভীরে প্রোথিত।
ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষককে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও ম্যানেজিং কমিটির যোগসাজশে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এখান থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়।
প্রশ্ন হলো—একটি বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় কেন রাজনৈতিক বলয়ের নিয়ন্ত্রণে যাবে? শিক্ষক নিয়োগ, বদলি কিংবা অপসারণ কি শিক্ষাবিদদের হাতে থাকবে না? রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে যদি শিক্ষকদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য কোথায়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার্থীদের ভূমিকা। শতাধিক শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে, স্মারকলিপি দিয়েছে, প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চেয়েছে। এটি একদিকে যেমন সচেতনতার পরিচয়, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। শিক্ষার্থীরা কেন নিজেদের শিক্ষকের নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে? বিদ্যালয় কি আর নিরাপদ আশ্রয় নয়?
শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। তারা ক্লাসরুমের বাইরে এসে রাজনীতি ও সহিংসতার বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে শেখে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ভয়ংকর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে গিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন, অভিযোগ নিতে বলেছেন। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আশ্বাস কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা, নাকি দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত হবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময় আলোর মুখ দেখে না।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্য ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে পড়ছেন ক্ষমতার দ্বন্দ্বের শিকার। ফলে শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা ও পরিবেশ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষক সমাজ যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে তারা স্বাধীনভাবে শিক্ষাদান করতে পারবে না। ভয় ও চাপের মধ্যে থেকে কোনো শিক্ষকই আদর্শ শিক্ষা দিতে পারেন না। আর আদর্শ শিক্ষা ছাড়া একটি জাতি কখনোই আলোকিত হতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের করণীয় স্পষ্ট।
প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, সোনারগাঁয়ের এই ঘটনা শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়—এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
শিক্ষক বদল হোক নিয়মতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও স্বচ্ছ। কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি যদি বিদ্যালয়ের দেয়ালে ঢুকে পড়ে, তবে সেই বিদ্যালয় আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে না—তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার যুদ্ধক্ষেত্র।
আর সেই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের ভবিষ্যৎ—শিক্ষার্থীরা।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
