।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ডিজিটাল বাংলাদেশ—এই শব্দযুগল এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র, নাগরিক সেবা সহজীকরণ, উদ্ভাবনী প্রশাসন—এই সব শব্দে মোড়ানো ছিল উন্নয়নের গল্প।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত আইসিটি খাতের শ্বেতপত্র সেই গল্পের পর্দা টেনে সরিয়ে দিয়েছে। ভেতরে দেখা গেছে, ডিজিটাল রূপান্তরের নামে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি রাজনৈতিক ও আর্থিক লুটপাটের কাঠামো। যার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘এস্পায়ার টু ইনোভেট’—এটুআই।
শ্বেতপত্রের ভাষা খুব স্পষ্ট। এটুআই কোনো সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বয়ান বাস্তবায়নের একটি রাষ্ট্রীয় টুলস। নাগরিক সেবা সহজ করার কথা বলে, প্রশাসনিক সংস্কারের নাম করে, প্রকল্পটি পরিণত হয়েছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্ল্যাটফর্মে। বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু সেই ব্যয়ের বিপরীতে জনগণ কী পেল—তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।
এই শ্বেতপত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, দুর্নীতি এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ছিল পরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। আইসিটি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এলইডিপি, আইডিয়া প্রকল্প—সবখানেই একই চিত্র। স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন, অতিরিক্ত ব্যয় আর লোক দেখানো উন্নয়ন। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু ফলাফল নেই।
এটুআই প্রকল্প ধাপে ধাপে রূপ নেয় এক ধরনের ‘সুপার ইউনিট’-এ, যার কর্মকাণ্ড ছিল কার্যত নজরদারির বাইরে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, কোন কার্যক্রমে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেই ব্যয়ের বিনিময়ে নাগরিক সেবা কতটা উন্নত হয়েছে—এর কোনো সুস্পষ্ট হিসাব কোথাও নেই। সফটওয়্যার, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট, পরামর্শক নিয়োগ ও গবেষণার নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সেসবের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্যটি হলো—ডিজিটাল রূপান্তরের নামে সরাসরি আওয়ামী রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্র নির্মাণ, ‘খোকা’ সিনেমা—এসব প্রকল্পে আইসিটি খাতের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, এসব খাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকার বেশি। প্রশ্ন একটাই—এই ব্যয় কি প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, নাকি রাজনৈতিক ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার হয়েছে?
এখানেই শেষ নয়। বাস্তব চাহিদা বিশ্লেষণ ছাড়াই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। কোথাও প্রশিক্ষক নেই, কোথাও প্রশিক্ষণার্থী নেই—তবু শতভাগ বিল উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১২টি আইটি পার্ক, ফোর-টায়ার ডাটা সেন্টার, ডিইইআইডি, ইডিসি প্রকল্প—সবখানেই একই গল্প। উন্নয়নের মোড়ক, ভেতরে শূন্যতা।
ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব প্রকল্পে অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব ছিল। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরই কিছু ক্ষেত্রে ল্যাপটপ ও সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ প্রকল্পও দলীয়করণের বাইরে ছিল না।
লানিং অ্যান্ড আনিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি) ছিল এই দুর্নীতির আরেকটি বড় উদাহরণ। জাল প্রশিক্ষক নিয়োগ, একই প্রশিক্ষণ একাধিকবার দেখিয়ে বিল উত্তোলন, বাস্তব দক্ষতা ছাড়াই সনদ বিতরণ—সবই নথিভুক্ত হয়েছে শ্বেতপত্রে। কাগজে-কলমে হাজার হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি হলেও বাস্তবে তাদের বড় অংশই বাজারে টেকেনি। কারণ দক্ষতা নয়, এখানে মুখ্য ছিল সংখ্যার ফুলঝুরি দেখানো।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে দেশীয় আইটি শিল্পের ওপর। শ্বেতপত্র বলছে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে একটি সুবিধাভোগী চক্র নীতিনির্ধারণে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। যোগ্য উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়, আর রাজনৈতিক সংযোগ থাকা গোষ্ঠীই সুবিধা পায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ—দেশের প্রযুক্তি খাত দুর্বল হয়েছে, উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই শ্বেতপত্রকে কেউ কেউ প্রতিশোধমূলক দলিল বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন। কিন্তু শ্বেতপত্র নিজেই স্পষ্ট করেছে—এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার দলিল নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও জবাবদিহিহীনতার একটি প্রামাণ্য দলিল। প্রশ্ন হলো—এই দলিলের পর কী হবে?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই শ্বেতপত্রও ‘ফাইলবন্দি দলিল’ হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে এমন শ্বেতপত্র নতুন নয়। নতুন হলো—এবার কি সত্যিই দায়ীদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো হবে?
ডিজিটাল রূপান্তর কোনো স্লোগান নয়, এটি কোনো রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং প্রকল্পও নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এটুআই ও আইসিটি খাতের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয়—প্রযুক্তিকে যখন ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়, তখন উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে। এখন সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার—রাষ্ট্রীয় অর্থে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সংস্কৃতি কি চলতেই থাকবে, নাকি এই শ্বেতপত্র সত্যিই পরিবর্তনের সূচনা করবে?
লেখক:শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
