।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
“আলহামদুলিল্লাহ। ধৈর্যের ফল সুস্বাদু হয়”—এই কথাটি রাজনীতির ক্ষেত্রে যতটা প্রযোজ্য, অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার রাজনৈতিক যাত্রাপথ তার বাস্তব উদাহরণ।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক নিষ্ঠা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে তিনি যে অবস্থানে পৌঁছেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং এটি কুমিল্লা অঞ্চলের বিএনপি রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকেই হঠাৎ আলোচনায় আসেন, আবার অনেকেই নীরবে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যান। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া দ্বিতীয় শ্রেণির রাজনীতিকদের প্রতিনিধিত্ব করেন—যারা প্রচারের আলোয় না থেকেও মাঠের রাজনীতিকে সচল রাখেন।
মেঘনা–হোমনা–কুমিল্লা-২ আসনকে কেন্দ্র করে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল পরিকল্পিত, ধৈর্যনির্ভর এবং সংগঠনকেন্দ্রিক। সময়ের বিচারে এই ধৈর্যই আজ তাঁর রাজনৈতিক পুঁজি।
কুমিল্লা-২ আসন ঐতিহাসিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। এখানে রাজনীতি মানেই শুধু নির্বাচন নয়—এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, স্থানীয় নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে সংযোগের প্রশ্ন। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এই বাস্তবতাকে অনুধাবন করেই বছরের পর বছর ধরে তৃণমূল সংগঠনে কাজ করেছেন।
ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল ধারাবাহিক। এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে আজ একজন সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
রাজনীতিতে ‘মিশন’ শব্দটি অনেক সময় আবেগী শোনালেও, অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার ক্ষেত্রে এটি কৌশলগত বাস্তবতা। তাঁর মিশন ছিল কুমিল্লা-২ আসনকে বিএনপির একটি শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি আন্দোলন, সংগঠন ও জনসংযোগ—এই তিনটি স্তম্ভকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বরং রাজনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের সময়েও তিনি মাঠে ছিলেন। ফলে নেতাকর্মীদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোটের দিন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক যাত্রার পরিণতি। ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার সম্ভাব্য নির্বাচন স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। তাঁর সমর্থকেরা মনে করছেন, এটি হবে আন্দোলননির্ভর রাজনীতির বিজয়—যেখানে ত্যাগ ও ধৈর্য শেষ পর্যন্ত ফল দেয়।
তবে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার ভূমিকা শুধু একটি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিজেকে বৃহত্তর কুমিল্লার একজন ‘অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। রাজনীতিতে এই ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, কুমিল্লার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বিভাজনে জর্জরিত। এক আসনের নেতা অন্য আসনের বিষয়ে উদাসীন—এমন চিত্র নতুন নয়। এই জায়গায় অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার অবস্থান ভিন্ন। তিনি কুমিল্লার প্রতিটি আসনের জন্য সাংগঠনিকভাবে কাজ করার কথা বলছেন এবং বাস্তবেও সেই চেষ্টা দৃশ্যমান।
বিশেষ করে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আলোচনার দাবি রাখে। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে তাঁর লক্ষ্য শুধু নিজের বিজয় নয়; বরং কুমিল্লার সব আসনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করা। এখানেই তাঁর রাজনীতির কৌশলগত দিকটি স্পষ্ট হয়। তিনি জানেন, ব্যক্তিগত সাফল্য টেকসই হয় তখনই, যখন দলীয় কাঠামো শক্তিশালী হয়।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বের সঙ্গে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার ভূমিকার একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কৌশল গ্রহণ করেছেন, অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার মতো নেতারা তার মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারী।
একজন সংগঠক হিসেবে তাঁর লক্ষ্য—কুমিল্লার সব আসনকে নির্বাচনে বিজয়ী করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে উপহার দেওয়া। এটি নিছক ব্যক্তিগত আনুগত্য নয়; বরং দলীয় কৌশলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার সচেতন প্রয়াস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিএনপি রাজনীতিতে এমন নেতাদের গুরুত্ব বাড়বে, যারা আন্দোলনের পাশাপাশি সংগঠনের ভাষা বোঝেন। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া সেই ধারার প্রতিনিধি। তিনি জানেন, নির্বাচনী রাজনীতি মানে শুধু স্লোগান নয়; এটি হিসাব, সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। কুমিল্লার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এই দক্ষতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নির্বাচনে বিজয় অর্জনের পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয়—প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন। জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে জনপ্রিয়তা দ্রুত ক্ষয় হয়। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার সামনে এই বাস্তবতাও স্পষ্ট। তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগঠনের অভিজ্ঞতা যদি নীতি-নৈতিকতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে রূপ নেয়, তবেই তিনি সত্যিকারের জননেতায় পরিণত হবেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার রাজনৈতিক যাত্রা ধৈর্য ও পরিশ্রমের এক দীর্ঘ পাঠ। এটি প্রমাণ করে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো মাঠের রাজনীতির মূল্য আছে, সংগঠনের শক্তি আছে এবং সময়ের অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত ফল দেয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যদি তিনি নির্বাচিত হন, তবে তা হবে শুধু একজন ব্যক্তির জয় নয়; বরং একটি ধারার রাজনীতির স্বীকৃতি।
ধৈর্যের ফল সত্যিই সুস্বাদু হয়—রাজনীতিতে এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
