এইমাত্র পাওয়া

রেগিং প্রথাঃ বর্বরতা যার মজ্জাগত

শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, রেগিং এর নামে আজ বাংলাদেশে যা চলছে তার সবই বর্বরতার নমুনা। মানুষ যত সভ্য হয় তার রেগিং পদ্ধতিও তত সভ্য হয়। রেগিং এর ধরন সমাজ মানস দ্বারা নির্ধারিত। আমাদের সমাজকে খুব বেশি সভ্য মনে করার কারন আজো ঘটেনি। তাই এ সমাজে প্রচলিত সকল প্রকার রেগিং-এ-ই বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। রেগিং নিষিদ্ধের আইন আছে। কিন্তু সমাজে প্রচলিত প্রথাকে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা এক দুরূহ কাজ। তথাপি সতীদাহ প্রথা, বিধবা অ-বিবাহ প্রথার মত একদিন এই বর্বর রেগিং প্রথাও বন্ধ হবে নয়তো সভ্যরূপ নেবে, সেই আশা করতেই পারি।

কাউকে চমকে দেয়া মানুষের স্বভাবজাত কৌতূহল। নতুন কেউ, যে কিনা দলভুক্ত হতে যাচ্ছে বা নতুন দলভুক্ত হয়েছে, তাকে চমকে দিয়ে, বিব্রত করে তার প্রকৃত স্বরূপ দেখতে চাওয়ার কৌশল হিসেবে মানুষ নানাবিধ পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। তার মধ্যে চমকে দেয়া অন্যতম। এর বাইরে বিব্রত করা, রাগান্বিত করা, ক্ষেপিয়ে তোলা, কষ্ট দেয়া ইত্যাদি বহুরকম উপায় রয়েছে। এই পদ্ধতি মানুষের সমাজে আদিমকাল হতে প্রচলিত। বলা যায় দলবদ্ধ হয়ে মানুষের জীবনযাপন আশঙ্কামুক্ত রাখার প্রাগৈতিহাসিক অজস্র উপায়ের মধ্যে একটি নিদর্শন এই রেগিং। ষাড়ের গুতো, ছাগলের শিং নাচানো, কুকুরের খিস্তি, পাখিদের ঠোঁটাঘাত ইত্যাদির মত প্রাণিজগতেও রেগিং প্রথা দেখা যায়। প্রাণীর দলবদ্ধ বসবাসকে নির্বিঘ্ন ও সুসংহত রাখতে প্রাকৃতিকভাবেই এই প্রক্রিয়ার উদ্ভব ঘটেছে। মানুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

রেগিং প্রথা সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। ঠাট্টার সম্পর্কের মধ্যে এর সামাজিক স্বীকৃতি রয়েছে। নতুন বউয়ের চালচলন যাচাই করে তা ঠিক করে নিতে নানারকম আদেশ-নিষেধ ও ধমকাধমকির মাধ্যমে শুরুতেই বেচারীর ত্রাহি-দশার উৎপত্তি ঘটানো বাঙালির বর্বর সংস্কৃতির একটি প্রাচীন নিদর্শন। নতুন জামাইকেও যাচাই করতে নানাবিধ বিড়ম্বনার জন্ম দিতে দেখা যায়। ভিন্ন জেলা থেকে ঠিকানা গাড়তে আসা মানুষকে যুগ যুগ ধরে রেগিং করা হয়। সমাজে এদেরকে রিফুজি, ঘটি, মালধরিয়া ইত্যাদি পরিচয়ে ট্যাগ লাগানো হয় এবং নানাভাবে টিজ করা হয়। অতিথির ক্ষেত্রে যা সচরাচর করতে দেখা যায় না। তবে নতুন আত্মীয়তা শুরু হবার আগেই বিয়ের গেটে বাক-বিতণ্ডা ও আভিজাত্য প্রদর্শন এক প্রকার রেগিং। টিজিং ও রেগিং প্রায় সমার্থক। তবে রেগিং এর রয়েছে স্বতন্ত্র এক ইতিহাস। বলা বাহুল্য, সমাজে প্রচলিত টিজিং পদ্ধতি থেকেই রেগিং এর ধারনাটি এসেছে। টিজ মানে ‘উত্যক্ত করা’ হলেও এর রয়েছে নেতিবাচক ও ইতিবাচক উভয় দিক। হাল আমলে টিজিং শব্দটি সম্পূর্ণ নেতিবাচকতার প্রতিরূপ হয়েছে। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে টিজিং অপরিহার্য। যেমন প্রেম, ভালোবাসা ও রোমান্টিসিজম ইত্যাদি।

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতক থেকেই র‍েগিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। তখন এটি গ্রিক সংস্কৃতির অংশ ছিলো। কোনো ক্রীড়া সম্প্রদায়ে নতুন খেলোয়াড় বা শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটলে, তার ভেতর কতটুকু একতা রয়েছে তা ঝালাই করে নিতে এবং তার মধ্যে ‘টিম স্পিরিট’-এর বীজ বপন করে দিতে, প্রবীণরা মিলে তাকে নানাভাবে উপহাস করতো, তার নানা পরীক্ষা নিতো, শারীরিক ও মানসিক শক্তি যাচাই করতো। পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে এই প্রক্রিয়ায় অনেক পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে সৈন্যদলগুলো এই পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করে, যেখান থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে এটির প্রবেশ ঘটেছে। শুরুতে র‍েগিংয়ের নামকরণ করা হতো বিভিন্ন গ্রিক বর্ণ, যেমন- আলফা, ফি, বিটা, কাপা, এপসাইলন, ডেল্টা প্রভৃতির নামানুসারে এবং এদেরকে বলা হতো গ্রিক লেটার অর্গানাইজেশন বা ফ্র্যাটার্নিটি।

এসব ফ্র্যাটার্নিটিতে আসা নবীনদেরকে বলা হতো প্লেজেস। শুরুর দিকে র‍েগিংয়ের ছিলো একদমই প্রাথমিক রূপ। প্লেজেসদেরকে কেবল কিছু সাহসিকতা, শারীরিক সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা নিয়েই ছেড়ে দেয়া হতো। কিন্তু একপর্যায়ে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কোনো একসময় যেটি ছিলো কেবলই প্রবীণদের সাথে নবীনদের বন্ধন সুদৃঢ় করার একটি উপায় মাত্র, সেটিই এবার পেয়ে যায় প্রাণঘাতী রূপ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর র‍েগিং সংস্কৃতিতে বিরাট পরিবর্তন আসে এবং এটি আগের থেকে আরো বেশি ভয়াবহ, সহিংস ও নৃশংস হয়ে ওঠে। যুদ্ধ চলাকালীন অনেকেই সৈন্যদলে নাম লিখিয়েছিলো এবং সেখানে তারা অনেক কঠিন কঠিন রীতিনীতির সাথে পরিচিত হয়েছিলো। যুদ্ধ শেষে যখন তারা আবার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এলো, তারা চিন্তা করল সৈন্যদলে শেখা রীতিনীতিগুলোকেই এবার প্রাতিষ্ঠানিক র‍েগিংয়ের অন্তর্ভুক্ত করার। এবং এভাবেই বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ র‍েগিংয়ের অংশ হয়ে উঠলো। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন সৈন্যদলে যেসব রীতিনীতি মানতে হতো, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ছিলো দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা, কঠিন কোনো মিশনে যাওয়ার জন্য তারা উপযুক্ত কি না তা যাচাই করার জন্য। কিন্তু নন-মিলিটারি শিক্ষার্থীরা যখন এসব রীতিনীতির সাথে পরিচিত হলো, তারা এগুলোর কার্যকারিতা না জেনেই যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করে দিলো। সেজন্য এখন র‍েগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদেরকে এমন সব কঠিন কঠিন কাজ করতে দেয়া হয়, যার সাথে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সম্পর্কই নেই।

উপরন্তু, ব্যক্তির ধর্ষকামী প্রবণতার নির্লজ্জ প্রকাশ ঘটতে দেখা যায় রেগিং এর ক্ষেত্রে। জোর-জবরদস্তির সংস্কৃতি দ্বারা চালিত তরুণ সমাজ অন্তর্গত অভিলিপ্সার স্খলন ঘটানোর একটি সুযোগ হিসেবে নেয় রেগিংকে। ফলত রাজনৈতিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় নির্ভয় নিপীড়নে অভ্যস্তরাই এ কাজে বেশি বেশি আগ্রহী থাকে। বাকিরা ধর্ষকামকে অবদমিত রাখে। কিন্তু নিপীড়নকে গুরুতরভাবে আপত্তিকর মনে করে না। বরং এটি একরকম স্বাভাবিক একটি ব্যাপার হিসেবেই পরিগণিত হয় তার কাছে। কেননা সুযোগ পেলে সেও একই কাজ করতো কিংবা করবে। এটি একটি বাস্তবতা এবং নিপীড়নকারীদের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছে।

আর্মির সকল প্রকার প্রশিক্ষণ যুদ্ধের প্রয়োজন থেকে পরিচালিত হয়। শুধু প্রশিক্ষণ নয়, প্রাত্যহিক কাজকর্মও পরিচালিত হয় একই উদ্দেশ্য থেকে। যুদ্ধের জন্য একটা সমগ্র জনগোষ্ঠী সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকতে পারে না। স্বাভাবিক জীবন তাই আর্মির জীবন থেকে স্বতন্ত্র এবং ভিন্নরকম। আর্মির মেজাজ ও প্ররোচনা স্বাভাবিক সমাজ জীবনে অপ্রয়োজনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি আরো অপ্রয়োজনীয়। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখার কাজটি হয় বিশ্ববীক্ষার আদলে। শিক্ষা জীবনের এই স্তরে কেউ আর্মিতে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকে না। বোধ করি তার সুযোগও নেই। উচ্চমাধ্যমিক স্তর পার হলেই একজন নাগরিকের সামনে সেনাবাহিনীতে প্রবেশের সুযোগ আসে। সেই সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়ে কিংবা নিতে না চেয়ে একজন নাগরিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যায় বিশ্ববীক্ষা অর্জন করার জন্য। আর্মির রেগিং পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়ে অচল এবং প্রমাদ উৎপাদনকারী।

তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং এর চর্চাটি টিকে আছে কোন যুক্তিতে? উচ্চশিক্ষার ধারনার সাথে বিসদৃশ এই প্রথা টিকে আছে কেবলমাত্র বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। জোর যার মুল্লুক তার, এই নীতিতে সমাজের বিস্তৃত পরিসরে টিকে থাকার মন্ত্র নিতে ও পেতে এই চর্চাটি উগ্র ক্ষমতার চর্চায় অভ্যস্তদের হাতে একটি সুযোগ হিসেবে টিকে আছে। এটি চলতে দেয়ার মাধ্যমে মূলত সমাজে বর্বরতার পুনর্বাসন নিশ্চিত রাখা হচ্ছে। শিক্ষিত-মার্জিত ও রুচিশীল মানুষের মূল্যবোধের সাথে প্রচলিত রেগিং প্রথা সাংঘর্ষিক। অচিরেই এটির নির্মূল আবশ্যক। তবে পেশিশক্তির জয়জয়কার আর আড়ম্বরের মধ্যে সহসা সেটি নির্মূল হবারও কোনো আশা নেই।

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, আজকের দিনে র‍েগিংয়ে যারা নেতৃত্ব দেয়, তাদের অধিকাংশ শুধু সিনিয়র বড় ভাইয়া বা আপুই নয়, তাদের বড় একটি পরিচয়, তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনটির সদস্য। এর ফলে র‍েগিং প্রতিহত করা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দুরূহ হয়ে পড়েছে। যারা র‍েগিং করে, তারা আবার ছাত্র রাজনীতিও করে। তাই তারা নিজেদেরকে অনেক ক্ষমতাবান মনে করে। তারা চিন্তা করে, আমাদের পেছনে একটি রাজনৈতিক দলের ‘ব্যাক আপ’ রয়েছে, তাই আমরা যা-খুশি-তাই করতে পারি। এমন মানসিকতা থেকেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍েগিংকে আরো এক ধাপ উপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেটির নাম দেয়া হয়েছে ‘গেস্ট-রুম কালচার’। এটি যদিও সরাসরি ক্যাম্পাস-ভিত্তিক নয়। বরং বিভিন্ন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদেরকে এই বিশেষ র‍েগিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো, অনেক শিক্ষার্থীই র‍েগিং নামক জিনিসটির সাথে মানিয়ে নেয়। প্রথম বর্ষে তারা মুখ বুজে র‍েগিং সহ্য করে এবং এক বছরের সিনিয়র হয়ে যাওয়ার পর তারা নিজেরাও জুনিয়রদেরকে র‍েগ দিতে শুরু করে। এর পেছনে কিছু সাধারণ মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়:
অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, আমরা যেহেতু র‍েগিংয়ের শিকার হয়েছি, তাই আমাদের জুনিয়রদেরকেও আমরা র‍েগ দেব। অনেকেই আবার মনে করে, র‍েগিং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেরই অংশ। ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে যেসব প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে, র‍েগিংয়ের মাধ্যমে সেগুলোর সাথে আগাম পরিচিত হয়ে যাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের যেন ডানা গজায়। সেই ডানা ছেঁটে দিতে এবং তাদেরকে ভদ্রতা শেখাতে র‍েগিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। বরং র‍েগিং হলো তাদের জন্য একটি ‘রিয়েলিটি চেক’।

অথচ বাস্তবতা হলো, রেগিংয়ের শিকার হয়ে মাঝে মাঝেই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এই প্রাণঘাতী প্রথাকে কোনোভাবেই ইতিবাচক মনে করার সুযোগ নেই। ভবিষ্যত কর্মজীবনে প্রতিকূলতার মোকাবেলা করার কৌশল শিক্ষার্থী বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া থেকেই পেয়ে যায়। অভাব-বঞ্চনা-লড়াই-সংগ্রাম ও ঠকা-ঠেকা থেকে ক্রমশই যোগ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাঙ্গনে রেগিং বরং মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি তাকে নিজে লড়াইটি চালিয়ে যেতে বাধা দেয়। আপন সাধনা থেকে বিচ্যূত করে ফেলে। তাই রেগিং তার জীবনে আত্মমগ্নতার প্রতিবন্ধক হিসেবে আবির্ভূত হয়। মনোযোগ ভিন্নদিকে প্রবাহিত করে নিজেকে পরিচর্চা করার ক্ষেত্রে তীব্রতম এক বাধা হয়ে হাজির হয়। রেগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীর ভেতর প্রতিশোধস্পৃহার মত এক অদ্ভুত আপদের উদয় হয়। পরবর্তী জীবনে তার মোড় ঘুরে যায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে মানসিক প্রতিবন্ধীর মত আচরণ করতে দেখা যায়। শিক্ষাঙ্গনে রেগিং স্পষ্টত এক বিড়ম্বনার নাম।

র‍েগিংয়ের কারণে মারা যাওয়া প্রথম শিক্ষার্থী হলেন মর্টিমার লেগেট। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের এক বিখ্যাত জেনারেলের সন্তান ছিলেন তিনি। 1873 সালে নিউ ইয়র্কের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সেমিস্টারে ভর্তি হওয়ার পর তিনি অন্তর্ভুক্ত হন র‍েগিংয়ের কাপা আলফা ফ্র্যাটার্নিটিতে। এক রাতে, সেই ফ্র্যাটার্নিটির দীক্ষা পর্বের অংশ হিসেবে, তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় জঙ্গলে। তার করণীয় ছিলো, পথ চিনে ইথাকায় অবস্থিত চ্যাপ্টার হাউজে ফিরে আসা। নিয়ম অনুযায়ী, ফ্র্যাটার্নিটির অন্য দুই নবীনের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার পর তারা তার চোখ খুলে দেন। এরপর তারা তিনজন মিলে একটি ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করেন, নিকটবর্তী কোনো রাস্তায় গিয়ে ওঠা যায় কি না, সেই আশায়। কিন্তু খুব বড় ভুল করে ফেলেছিলো তারা। যেটিকে তারা ঢাল বলে মনে করেছিলো, যেটি আসলে ছিলো 37 ফুট উচ্চতার খাড়া পাহাড়ের দেয়াল। একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একদম নিচে গিয়ে পড়েন মর্টিমার। শক্ত পাথরের উপর পড়ে তার শরীরটা পুরোপুরি থেতলে যায়। তার সঙ্গী দুজনও আহত হয়েছিলেন বটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচেন তারা।

ভারতবর্ষে গত শতাব্দীর ৬০’র দশকের শেষ ভাগ পর্যন্তও র‍েগিং বিশেষ কোনো সমস্যা ছিলো না। একে কেবল সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যকার পরিচিতি, সম্পর্ক গঠন এবং হাসিঠাট্টার একটি প্রক্রিয়া বলেই মনে করা হতো। এর অপব্যবহার তখনো শুরু হয়নি। কারণ তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজের সর্বস্তরের ছেলেমেয়েরা পড়তে শুরু করেনি। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই ছিলো সমাজের অভিজাত স্তরের। আর মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণীর যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতো, তাদের কাছেও র‍েগিং নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামানোর চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মন দিয়ে ক্যারিয়ার গঠনই বেশি জরুরি ছিলো।

সমস্যার সূচনা ঘটলো উচ্চশিক্ষার দ্বার সমাজের সর্বস্তরের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে। উচ্চশিক্ষা সহজ থেকে সহজতর হতে থাকায়, এর মূল্য যেন কমতে শুরু করলো। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করতো। কিন্তু পরবর্তীতে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, প্রতিটি ব্যাচেই এমন কিছু শিক্ষার্থী দেখা যেতোই, যাদের কাছে মনে হতো: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারা মানেই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য লাভ হয়ে গেছে, এখন আর নতুন করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু শেখার নেই। এ ধরনের শিক্ষার্থীরাই র‍েগিং প্রথাটাকে বর্তমানের ভয়াবহ রূপে নিয়ে আসতে শুরু করলো। তারা নিজেরা ক্লাস-পরীক্ষা ইত্যাদির পরোয়া করতো না, আর তাই অন্যদেরকেও এমনটিই মনে করতো। অন্য আর সবকিছুর চেয়ে, র‍েগিংয়ের মাধ্যমে জুনিয়রদেরকে ‘ভদ্রতা শেখানো’-ই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, বর্তমান সময়েও যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍েগিং নিয়ে বেশি মাতামাতি করে, তাদের মানসিকতাও ঠিক একই রকম।

আগেই বলেছি রেগিং কোনো একাডেমিক সিলেবাসের বিষয় নয়। এটি সমাজ মানস থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চিত হয়ে থাকে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এর ব্যাপক চর্চার ফলস্বরূপ কর্মজীবনেও অনুপ্রবেশ করে। কেননা উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে একজন শিক্ষার্থী যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তার মাথার ভেতর রেগিং এর স্মৃতি দগদগে স্মৃতি হয়ে বিরাজ করতে থাকে। ফলে কর্মজীবনে সামান্য ক্ষমতা হাতে পেয়েই তার মাথায় পুরোনো ভূত, রেগিং এর ভূত চেপে বসে।
বসিং নামক ধারনার সাথে এই রেগিং সম্পর্কিত। ‘কিং ক্যান ডু নো রং’ এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি উক্তি প্রচলিত যে, বস ইজ অলওয়েজ রাইট। একটি দপ্তরের চেইন অব কমান্ড বজায় রাখার জন্য প্রত্যেক নিয়ন্ত্রণকারী কর্মচারীর হাতে কিছু ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়। এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও অপরিহার্য। ‘বস ইজ অলওয়েজ রাইট’ শ্লোগাণটি এই কারনেই উৎপত্তি লাভ করেছে। তবে রেগিং এর স্মৃতি ও বিভীষিকা তাড়িত তরুণ বসিং এর সুযোগে রেগিং এ আগ্রহী হয়ে ওঠে। তার কাছে বসিং, দায়িত্ব পালনের স্থলে উপভোগের কারন হয়। দায়িত্ব পালনের জন্য যে ক্ষমতা তার হাতে প্রদত্ত হয়েছে সেটাকে সে বসিং এর উপভোগ নিশ্চিত করতে ব্যবহার করে।

এখানে সম্পূর্ণ হতাশ হবার কিছু নেই। অনেক সৎ মানুষও এই উপভোগ করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল নয়, সৎ কর্মচারী মূলত বসিং এর আদলে রেগিং এর মজা নিতে ক্ষমতার প্রদর্শন করে থাকে। আদতে তার কোনো অশুভ উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু এই রকম ছেলেখেলার কবলে পড়ে অধীনস্তদের ত্রাহিদশার উদ্ভব ঘটে এবং কাজের পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। আইনের চোখে নির্দোষ হয়েও এই ধরনের কর্মচারী নৈতিকভাবে মারাত্মক অপরাধী। আর অসৎ কর্মচারী বসিংকে অসুদোপায় অবলম্বনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অসৎ কর্মচারী দুই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রেগিং। দুটোই নৈতিকতার বিচারে মারাত্মক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেদারসে দুর্নীতি এবং রেগিং করে কর্মপরিবেশের অবনতি ঘটানো– দুটোই সে নিয়মিত করে চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং এর অভিজ্ঞতাকে বসিং এর ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফা ও পরিতৃপ্তি লাভ করতে উদ্বুদ্ধ হয় সে। শিক্ষাঙ্গন থেকে রেগিং এর প্রচলন এভাবেই সমাজের রন্ধ্রে প্রবেশ করে এবং ভেতর থেকে সবকিছু ধ্বংস করতে থাকে।

এজন্য দেখা যায়, যেনতেনভাবে মেধাবী ও মেধাহীনের দল ক্ষমতাশালী পদের চাকরি বাগিয়ে নিতে গলদঘর্ম হয়। শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন করে দেশ ও সমাজের সেবা করার মানসিকতা ধারন করে না কর্মক্ষেত্রে আসা বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। তাদের কাছে ক্ষমতার মোহ খুবই মারাত্মক। অনেকটা সাইকোপ্যাথের মত। একে সামাজিক সাইকোপ্যাথ বলা যেতে পারে। কারন একদিন তার উপর যে রেগিং হয়েছে সেটি গোটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। রেগিং এর ভূতে আক্রান্ত হয়ে সারা জীবন সে মনের ভেতর পুষে রাখে প্রতিশোধস্পৃহার মত অদ্ভুত এক উপলব্ধি। রেগিং এর শিকার হয়ে কিংবা রেগিং করে বেড়িয়ে একরকম নেশাগ্রস্তে পরিণত হতে দেখা যায় অনেককেই। কর্মজীবনেও যার ভূত নামে না মাথা থেকে। ফলে শিক্ষাঙ্গনের রেগিং ধারাবাহিকভাবে সামাজিকীকরনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলে।

এটুকু উপলব্ধি করে আমরা রেগিং এর প্রভাব সম্পর্কে আতঙ্কিত না হয়ে পারি না। মানুষ শিক্ষা গ্রহণের সময়ে সবকিছু গ্রহণের মুডে থাকে। শিক্ষাঙ্গনে চলমান সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ যেমন শিক্ষার্থীকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, তেমনি নেতিবাচক চর্চাগুলোও তার ভেতর নেতিবাচক প্রবণতার জন্ম দেয়। সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজির মত রেগিং সংস্কৃতিও শিক্ষার্থীদের মারাত্মকভাবে দূষিত করে ফেলে। আর শিক্ষাঙ্গনে শেখা যেকোনো জিনিসের প্রভাব একজন মানুষের জীবনে আমৃত্যু বজায় থাকে। সমাজকে বিশুদ্ধ রাখার সবচেয়ে বড় উপায় শিক্ষাঙ্গনকে বিশুদ্ধ রাখা। সেটি করতে হলে শিক্ষাঙ্গনে প্রচলিত সব ধরনের রেগিংকে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করা আপাত অর্থে যৌক্তিক। যৌক্তিক এই কারনে যে, রেগিং এ বর্বরতা পরিস্ফূট। কেননা সমাজে বর্বরতার চর্চা এখনো বজায় রয়েছে। আর সমাজ থেকে আসা শিক্ষার্থী সেই বর্বরতার চর্চা রেগিং এর মধ্য দিয়ে অব্যাহত রাখতে রাখতে এক সময় সে আরো বড় বর্বর হয়ে গড়ে ওঠে।

এটা একটা চক্রের মত কাজ করে। সমাজ থেকে বর্বরতা নিয়ে এসে শিক্ষাঙ্গনে তার চর্চা করে আরো শাণিত করে তোলে। শিক্ষাঙ্গন থেকে বর্বরতার চর্চাটি কর্মজীবনে নিয়ে গিয়ে সমাজটাকে আরো বেশি বর্বর করে তোলে। এই চক্র বন্ধ করার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ স্তরটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং এর মোড়কে বর্বরতার চর্চা অব্যাহত থেকে যেতে পারছে। এই দিকটা আমাদের ভাবিত করে তোলে। দেশ ও সমাজে, মানুষকে মানবিক বোধ সম্পন্ন করে তুলতে চাইলে শিক্ষাঙ্গনে যেকোনো প্রকার বর্বরতা চর্চা করার পরিবেশটি নষ্ট করে দিতে হবে। রেগিং প্রথা ততোদিন বন্ধ থাকা উচিৎ যতদিন না সমাজটা আশানুরূপ সভ্য হচ্ছে। কিংবা চিরতরেই বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিৎ। কেননা সভ্য সমাজ যদি কোনোদিন রেগিংকে ফিরিয়ে আনতে চায়, সেটি সভ্যরূপেই ফিরে আসবে। আমাদের তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে রেগিং সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হওয়া দরকার। শিক্ষাজীবনকে উপভোগ্য করতে রেগিং একমাত্র উপায় নয়। আলোকিত মানুষ তৈরীর জন্যও রেগিং অপরিহার্য নয়, আপৎকালীন পরিস্থিতি তথা যুদ্ধ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত জনগোষ্ঠী তৈরীর জন্যও রেগিং এর কোনো কার্যকারিতা অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই।

কর্মপরিবেশ নষ্ট করা আর দুর্নীতি করা তাৎপর্যগতভাবে একই মাত্রার অপরাধ। দুটোই দেশকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করে। সভ্যদেশ ও উন্নত দেশ একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। শিক্ষাঙ্গনে রেগিং বন্ধ করে আপাতত একটা অগ্রগতি সাধন করা যায়। সেটি করতে যত দেরি হবে তত পিছিয়ে পড়বে দেশের উন্নয়ন ও কাঙ্খিত স্তরে আরোহণ।

তথ্যঋণঃ রোয়ার মিডিয়া

লেখকঃ মাতুব্বর তোফায়েল হোসেন


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.