এইমাত্র পাওয়া

৪৫২ পদের ৫৫% শিক্ষকই নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক।। 

নোয়াখালীর বসুরহাট আব্দুল হামিদ করোনেশান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৭০০। এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ আছে ২৭টি। বিপরীতে এখানে কর্মরত আছেন মাত্র আটজন শিক্ষক।

প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদও শূন্য দীর্ঘদিন ধরে। বছরখানেক ধরে এই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন শেখ সাঈদ উর রহমান। দুটি শিফটে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়।
একই অবস্থায় পড়েছেন জেলার মোট ১৬টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষকের পদ ৪৫২টি। বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২০৩ জন। অর্থাৎ ২৪৯টি পদ ফাঁকা পড়ে আছে। সে হিসাবে জেলার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫৫.০৮ শতাংশ পদ খালি। প্রধান শিক্ষক আছেন শুধু সম্প্রতি জাতীয়করণ হওয়া চারটি বিদ্যালয়ে। বাকি বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। সে হিসাবে জেলার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা শিক্ষকদের শূন্য পদ পূরণে বারবার দাবি জানিয়ে আসলেও কাজ হচ্ছে না। গত সপ্তাহে কথা হয় জেলার চাটখিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদাউসের সঙ্গে। এই শিক্ষার্থী জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নেই। অন্য শিক্ষকের সংকটও চলছে। তাই প্রায়ই ক্লাস হয় না। এতে শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জেলার ৯ উপজেলায় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ১৬টি। এগুলো হলো নোয়াখালী জিলা স্কুল, নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বেগমগঞ্জ সরকারি কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়, বেগমগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সেনবাগ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সেনবাগ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কবিরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সুবর্ণচর শহীদ জয়নাল আবেদীন মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাইমুড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাইমুড়ী রুবিরহাট বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়, চাটখিল পিজি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাটখিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হাতিয়া শহর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাতিয়া ওছখালী খান সাহেব সৈয়দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কোম্পানীগঞ্জ মাকসুদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বসুরহাট আব্দুল হামিদ করোনেশান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থা আছে সদরের নোয়াখালী জিলা স্কুল ও নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষকসহ ১০৬টি শিক্ষকের পদ আছে বিদ্যালয় দুটিতে। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮১ জন। এভাবে পাঠদান করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের। নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪২ জন। বিপরীতে শিক্ষার্থীসংখ্যা এক হাজার ৫৫০ জন। প্রায় এক বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদে থাকা মো. জাহাঙ্গীর আলম এসব তথ্য জানিয়েছেন। নোয়াখালী জিলা স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মীর হোসেনের ভাষ্য, তাঁর বিদ্যালয়ে ৫৭টি শিক্ষকের পদ আছে। কিন্তু কর্মরত আছেন ৩৯ জন।

এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জের দুটি বিদ্যালয়ে ৫৪ জন শিক্ষকদের বিপরীতে ১৯ জন, চাটখিলের দুটি বিদ্যালয়ে ৫৪ জনের বিপরীতে ২৩ জন, হাতিয়ার দুটি বিদ্যালয়ের ৫৪ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন। সুবর্ণচরের একমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৮ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৫ জন।
সোনাইমুড়ীর দুটি বিদ্যালয়ে ৩৩ পদের বিপরীতে ২৫ জন, বেগমগঞ্জের দুটি বিদ্যালয়ে ৫৪ জনের মধ্যে ৩৭ জন, সেনবাগের দুটি বিদ্যালয়ের ৫৪ পদের বিপরীতে ৩১ জন কর্মরত আছেন। কবিরহাটের একমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৫টি পদ থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র ছয়জন।
হাতিয়া শহর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে মো. নুর উদ্দিনের মেয়ে। তাঁর বাড়ি ওছখালী এলাকায়। সম্প্রতি কথা হয় কৃষক নুর উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের সংকট চলছে। তাই শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষা পাচ্ছে না। এটি নামেই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু লেখাপড়ার মানে বেসরকারি বিদ্যালয়ের থেকেও অনেক নিচে।
অভিভাবকদের এসব অভিযোগের সত্যতা মেলে শিক্ষকদের কথায়। হাতিয়া শহর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক শাহ মো. কলিম উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ ২৭টি। অথচ কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৫০ জন। অল্প শিক্ষক দিয়ে তাদের পাঠদান মুশকিল।

একই উপজেলার ওছখালী খান সাহেব
সৈয়দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আরিফুল মাওলা জানালেন, তাঁর বিদ্যালয়ে ২৭ জন শিক্ষক থাকার কথা। অথচ আছেন মাত্র ১০ জন। তাদের দিয়ে নিয়মিত পাঠদান কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেলার কোম্পানীগঞ্জের মাকসুদাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ৪৫০ জনের মতো। এখানে মাত্র ১১ জন শিক্ষক আছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রুহুল আমিন। তিনি বলেন, এখানে ২৭টি শিক্ষকের পদ আছে। মাত্র ১১ জনকে দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন।
সেনবাগ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালামের ভাষ্য, তাঁর এখানে ২৭ শিক্ষকের মধ্যে ১২ জন কর্মরত। বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরিফত উল্যাহ জানান, প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৯ জন শিক্ষক আছেন। অথচ পদ আছে ২৭টি।
শিক্ষক সংকটের বিষয়টি অবগত আছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফরিদুল আলম হোসাইনি। তাঁর ভাষ্য, এসব শূন্যপদ পূরণে গত অক্টোবরে মন্ত্রণালয়ে তথ্য পাঠিয়েছেন। এসব পূরণে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা রয়েছে। তাঁর আশা, শিগগিরই মন্ত্রণালয় শূন্য পদ পূরণে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading