শিক্ষকদের আন্দোলনের মঞ্চে অশালীন ভাষা: শিক্ষক রাজনীতির করুণ বাস্তবতা

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। তাদের হাত ধরেই তৈরি হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—যারা একদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সমাজকে নেতৃত্ব দেবে, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষক সমাজের কিছু অংশের আচরণ, বিশেষত আন্দোলনের মঞ্চে ব্যবহৃত অশালীন ও কদর্য ভাষা, জাতিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। শিক্ষকরা যখন গালিগালাজে মুখর হন, তখন প্রশ্ন জাগে—যারা শালীনতা শেখাবেন, তারাই যদি শালীনতা হারান, তাহলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?

গত ১২ তারিখ শিক্ষক নেতা দেলোয়ার হোসেন আজিজির নেতৃত্বে শিক্ষকরা বাড়িভাড়া ভাতা ২০% এবং চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকার দাবিতে প্রথমে প্রেসক্লাবে এবং পরে শহীদ মিনারে টানা আট দিন কর্মসূচি পালন করেন। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হয়ে দাবির পক্ষে অবস্থান নেন। এমন একটি দাবি আদায়ের আন্দোলন জাতি আশা করেছিল। এই আন্দোলনটি  হবে পরিশীলিত, শালীন, যুক্তিনির্ভর—যেখানে শিক্ষক সমাজ তাদের নৈতিক শক্তি, জ্ঞানের দীপ্তি এবং ঐক্যের প্রকাশ ঘটাবে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা গেল, আন্দোলনের মঞ্চে শুরু হলো কাদা ছোড়াছুড়ি, গালিগালাজ, এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে একটি শিক্ষক সংগঠনের দুই নেতা—এর বিরুদ্ধে অশ্রাব্য মন্তব্য, গালাগালি এবং অবমাননাকর স্লোগান দেওয়া হয়। অমক শিক্ষকের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে” — এমন শ্লোগান শিক্ষকদের মুখে শুনে অনেকেই স্তম্ভিত হয়েছেন। হাজার হাজার শিক্ষক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ সেই দৃশ্যের সাক্ষী।

এমন আচরণ শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করেছে। দাবির ন্যায্যতা যাই থাকুক, ভাষার অশালীনতা সেই ন্যায্যতাকে আড়াল করেছে। প্রশ্ন উঠছে—এই কণ্ঠ কি শিক্ষকের?

মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ভাষায় প্রকাশ পায়। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একজনের চিন্তা, শিক্ষা, মানবিকতা, এবং সাংস্কৃতিক পরিশীলনের প্রতিফলন। যে ব্যক্তি ভদ্র ও শালীন ভাষায় কথা বলতে পারে, সে নিজের শিক্ষিত ও পরিপক্ব পরিচয় বহন করে।

শিক্ষকেরা সমাজের দিশারী। তাদের মুখের ভাষা ও আচরণ ছাত্রছাত্রীদের মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে। ভাষার মাধ্যমে শেখানো হয় মূল্যবোধ, শ্রদ্ধাবোধ, মানবিকতা ও সৌন্দর্যবোধ। কিন্তু আন্দোলনের নামে যখন শিক্ষকই কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেন, তখন শিক্ষার ভিত্তিই নড়ে যায়। কারণ শিক্ষার্থী তখন শিখে—গালাগালও প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, অশালীনতা দিয়েও নিজের দাবি তোলা যায়।

শিক্ষকের মুখে গালি মানে সমাজে অন্ধকারের ডাক। কারণ শিক্ষক সমাজের মানসিক শুদ্ধতার প্রতীক। যে মুখে জ্ঞানের বাণী শোভা পায়, সেখানে কদর্যতার গন্ধ মানায় না।

রাজনীতি মানবসভ্যতার অন্যতম সূক্ষ্ম ও নান্দনিক প্রকাশভঙ্গি। রাজনীতির ভাষা হলো ঐক্যের, স্বপ্নের, এবং ভালোবাসার ভাষা—যেখানে ঘৃণা বা বিভাজনের স্থান নেই। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী—তারা কেউ কখনো প্রতিপক্ষের প্রতি অরুচিকর ভাষা ব্যবহার করেননি। মতবিরোধ ছিল, তবু তারা সম্মানের সীমা অতিক্রম করেননি।

আজ সেই রাজনৈতিক শালীনতা হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতির মঞ্চে কিংবা টকশোতে, ভাষা হয়ে উঠছে অস্ত্র; শালীনতা হয়ে পড়ছে দুর্বলতা। দুঃখের বিষয়—এই অসভ্যতার সংক্রমণ শিক্ষক রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষক সংগঠনের নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতে গিয়ে কখনো কখনো এমন ভাষা ব্যবহার করছেন, যা শিক্ষার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

রাজনীতির ভাষা যদি কদর্য হয়, তাহলে শিক্ষার ভাষাও দূষিত হয়। কারণ শিক্ষক সমাজই রাজনৈতিক শালীনতার প্রথম অনুশীলন ক্ষেত্র।

গণতন্ত্রের মূল হলো আলোচনা, শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা। কিন্তু যখন আন্দোলনের মঞ্চে ঘৃণা, হুমকি ও অপমানের ভাষা প্রাধান্য পায়, তখন তা গণতন্ত্রের নয়, বরং বিভাজনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষক সমাজের এই বিভাজন, এই শত্রুভাবাপন্ন বক্তব্য শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা শিক্ষাঙ্গনের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে।

একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার নৈতিক পুঁজি। শিক্ষকরা সেই পুঁজির অভিভাবক। তারা যদি ঘৃণার ভাষা শেখান, তবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

ভাষা শুধু শব্দ নয়, এটি সংস্কৃতি। অশালীন ভাষা ব্যবহার মানে সেই সংস্কৃতিকে কলুষিত করা। যে জাতির শিক্ষকগণ কদর্য ভাষায় মুখর, সে জাতি কখনো সভ্যতার আলোয় পৌঁছাতে পারে না।

একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দেন না; তিনি মূল্যবোধ শেখান, চরিত্র গঠন করেন। ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি শেখান কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়, কিভাবে মতভেদ প্রকাশ করা যায় শালীনতার সঙ্গে।

শিক্ষকের মুখে যখন “জুতা মারো তালে তালে” ধরনের স্লোগান উচ্চারিত হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক পতনের ইঙ্গিত। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তখন শিক্ষক আর আলোর দিশারি নয়, বরং প্রতিশোধপরায়ণ চরিত্রে পরিণত হন।

মনে রাখা দরকার—অপরকে অপমান করলে নিজের মর্যাদাও কমে যায়। অন্যকে সম্মান জানানোই নিজের আত্মসম্মান রক্ষার সর্বোত্তম পথ।

অশালীন ভাষা কেবল শব্দের অপব্যবহার নয়; এটি মানবিকতার অবক্ষয়। একজন মানুষ যখন গালিগালাজে স্বচ্ছন্দ হয়, তখন তার অন্তরেও রুক্ষতা জন্ম নেয়। শিক্ষক সমাজে এই রুক্ষতা দেখা দিলে, তা জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।

আজকাল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আমরা দেখতে পাচ্ছি অশালীন বাক্য, অসম্মানজনক আচরণ, এমনকি শিক্ষকদের প্রতি দুর্ব্যবহার। এগুলোর শেকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়—শিক্ষকেরাই অনেক সময় ভাষার সংযম হারাচ্ছেন। যখন ছাত্র দেখে তার শিক্ষকই অন্য শিক্ষককে গালাগাল করছেন, তখন সে শেখে—অশ্রদ্ধা একটি স্বাভাবিক বিষয়।

এভাবে সমাজে বেড়ে উঠছে অশালীনতার এক প্রজন্ম—যাদের কাছে প্রতিবাদ মানে কণ্ঠের উচ্চতা, নয় যুক্তির দৃঢ়তা।

আজ শিক্ষক রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থ, পদ-পদবি ও রাজনৈতিক আনুগত্যের কারাগারে বন্দি। আন্দোলনের ভাষা তাই নীতি থেকে সরে গিয়ে প্রতিপক্ষের চরিত্রহননে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আদর্শ ও মূল্যবোধের জায়গায় এসেছে প্রতিহিংসা।

একসময় শিক্ষক সংগঠনের মঞ্চ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, শিক্ষানীতি প্রণয়ন, ও নৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। এখন সেই মঞ্চে শোভা পায় মাইক, স্লোগান, আর ব্যক্তিগত বিদ্বেষের চর্চা।

যদি শিক্ষক রাজনীতি সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে চায়, তবে আগে ভাষাকে শুদ্ধ করতে হবে। আন্দোলনের শক্তি আসবে যুক্তি থেকে, জ্ঞানের দীপ্তি থেকে—গালিগালাজ থেকে নয়।

শিক্ষক রাজনীতিতে শালীনতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আত্মসমালোচনার।
** শিক্ষক সংগঠনগুলোর উচিত ভাষা ও আচরণের ওপর প্রশিক্ষণমূলক কর্মশালা আয়োজন করা।
** আন্দোলন হোক যুক্তিনির্ভর, তথ্যসমৃদ্ধ ও সৃজনশীল পদ্ধতিতে।
**ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়—নীতিনির্ভর বক্তব্য হোক আলোচনার ভিত্তি।
**সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

যখন শিক্ষক নিজের কথায় সংযম আনবেন, তখন শিক্ষার্থীও তা অনুকরণ করবে। তখন আন্দোলন হবে সচেতনতার, উন্নতির, মর্যাদার—গালাগালির নয়।

শিক্ষক মানে আলোর মানুষ, জ্ঞানের মানুষ, নীতির মানুষ। তারা যদি ঘৃণার ভাষা বলেন, তাহলে অন্ধকারই বেড়ে যায়। আন্দোলন কখনোই অশালীনতার আশ্রয় নিতে পারে না। ন্যায্য দাবি তখনই মর্যাদা পায়, যখন তা মার্জিতভাবে উপস্থাপিত হয়।

আজ প্রয়োজন শিক্ষকদের আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি। কারণ জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের হাতেই।

ভাষা ও আচরণে শালীনতা ফিরিয়ে আনাই হতে পারে শিক্ষকের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ।
মনে রাখতে হবে—যে শিক্ষক নিজের ভাষায় আলোকিত, তিনিই জাতিকে আলোর পথে নিতে পারেন।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/২৮/০৯/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.