।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
যাদের হাতে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে, যাদের জ্ঞান, শ্রম ও নিবেদনেই একটি দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি বিকশিত হয়—তাদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে। কিন্তু বাস্তবতা যেন প্রশ্নটির মর্মকথাকে উপহাসে পরিণত করে। শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে যখন প্রত্যাশা থাকে সম্মান, স্বীকৃতি ও ন্যায্য সুবিধার ঘোষণা, তখন বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সরকার ঘোষণা দিল—বাড়িভাড়া ভাতা বাড়ানো হলো ৫০০ টাকা!
এই ঘোষণাটি একদিকে যেমন ‘উপহার’ নামে প্রচার পেল, অন্যদিকে সেটি শিক্ষকদের চোখে পরিণত হলো এক নির্মম উপহাসে।
বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক কাজ করছেন। তারা দেশের মোট শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় ৯৭ শতাংশ অংশজুড়ে অবদান রাখছেন। অথচ তাদের বেতন-ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা সুবিধা এমনকি পেনশন—সবই সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় বহু গুণ কম।
একই পাঠ্যক্রম, একই ক্লাসঘণ্টা, একই দায়িত্ব—কিন্তু প্রাপ্য ও মর্যাদার জায়গায় বিশাল বৈষম্য।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষক দিবসের আগে বাড়িভাড়া মাত্র ৫০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণাকে শিক্ষক সমাজ গ্রহণ করতে পারেননি। কারণ, এটি কোনো বাস্তবসম্মত বা মর্যাদাপূর্ণ পদক্ষেপ নয়। আজকের বাজারে এক লিটার তেল, এক কেজি ডাল, বা একদিনের গ্যাস বিলও এই টাকায় পূরণ হয় না। অথচ এটিকে শিক্ষক দিবসের বিশেষ “উপহার” হিসেবে ঘোষণা করা হলো—যেন শিক্ষকদের আত্মসম্মানকেই ব্যঙ্গ করা হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে।
শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের এই বঞ্চনার ইতিহাস নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য দিন দিন বেড়েছে। ১৯৭৩ সালে মুজিবনগর সরকারের সময় থেকেই সরকারি শিক্ষকদের জন্য একের পর এক স্কেল, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি হয়েছে; কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকরা থেকে গেছেন প্রান্তিক অবস্থায়।
এমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য। মাঝে মাঝে সামান্য কিছু বাড়ানো হয়—যা প্রকৃত অর্থে শিক্ষকদের জীবনযাত্রায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।
আজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষক মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে তাঁর পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হয় না। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সব কিছুর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে শিক্ষকরা পরিণত হন চিরস্থায়ী আর্থিক অনটনের প্রতীকে।
প্রশ্ন আসে—এই ৫০০ টাকার সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের বার্তা কী? এটি কি সত্যিই শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কোনো রূপ, নাকি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে সমালোচনা এড়ানোর চেষ্টা?
বাস্তবিক অর্থে, এই পরিমাণ বৃদ্ধি শিক্ষকদের জীবনমানের কোনো উন্নতি ঘটাতে পারে না। বরং এটি শিক্ষকদের মানসিকভাবে আরও হতাশ করে তোলে। কারণ, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্র যেন বলতে চায়—‘তোমাদের মূল্য এতটুকুই।’
এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, এটি মানসিক ও সামাজিক অবমূল্যায়নের প্রতীকও। একজন শিক্ষক যখন ছাত্রদের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর চোখে থাকা গর্ব ও আত্মসম্মানই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু যখন রাষ্ট্র তাঁর শ্রমের মূল্য ৫০০ টাকায় মাপে, তখন সেই গর্বের জায়গায় আসে ক্ষোভ ও নিরাশা।
শিক্ষক দিবস হলো সেই দিন, যেদিন একটি জাতি তার শিক্ষককে কৃতজ্ঞতা জানায়, তাঁর অবদান স্মরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশে এই দিনটি ক্রমেই হয়ে উঠছে কেবল ফুল, ব্যানার, বক্তৃতা ও আলোকচিত্রের উৎসব।
সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন, আর্থিক বৈষম্য, পদোন্নতির জটিলতা, এবং এমপিও প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে শিক্ষক সমাজ আজ এক অদৃশ্য অবমূল্যায়নের বেড়াজালে বন্দি।
যেখানে একজন শিক্ষক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করেন জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে, সেখানে তাঁর সংসার চলে ধার-দেনায়। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে ৫০০ টাকার বাড়িভাড়া বৃদ্ধি দিয়ে ‘শুভেচ্ছা’ জানানো হয়! এমন “উপহার” শিক্ষক দিবসের মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না হলে শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই মানসম্মত হতে পারে না।
আজ আমরা দেখি—অনেক যোগ্য মানুষ শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কারণ, এই পেশায় থেকে জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিশ্চয়তাও পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষা পেশা হয়ে উঠছে ‘শেষ বিকল্পের’ পেশা—যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
একজন শিক্ষক যদি আর্থিক দুশ্চিন্তায় দিন কাটান, তাহলে তিনি কীভাবে মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করবেন? শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক গুণ গঠনে যে সময়, শক্তি ও ভালোবাসা প্রয়োজন, তা তিনি কীভাবে দেবেন, যদি প্রতিমাসে বাসাভাড়া মেটাতে হয় ধার করে?
প্রতি বছর শিক্ষক দিবসে নানা প্রতিশ্রুতি শোনা যায়—শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়ানো হবে, বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ হবে, প্রণোদনা দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব প্রতিশ্রুতি অধিকাংশ সময় কাগজে-কলমেই থেকে যায়।
একটি ঘোষণার পর সরকার যেন দায়িত্ব শেষ করে ফেলে। অথচ শিক্ষকদের প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা মানে হলো—দেশের ভবিষ্যতের ভিত্তি মজবুত করা। কারণ, শিক্ষকের হাতে গড়ে ওঠে আগামী প্রজন্ম।
এখন প্রয়োজন কেবল বাড়িভাড়া বাড়ানো নয়, বরং সমন্বিত শিক্ষানীতি—যেখানে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য দূর হবে।
বেতন কাঠামোতে সমতা আনতে হবে।
চিকিৎসা ও পেনশন সুবিধা দিতে হবে।
বাড়িভাড়ার হার বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
শিক্ষকদের পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
শিক্ষকদের প্রতি অবিচার শুধুমাত্র তাদের নয়, এটি জাতির প্রতি অবিচার।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল নীতিমালা প্রণয়ন নয়, সেই নীতির মধ্য দিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষকদের ঘাড়ে জাতি দাঁড়িয়ে থাকে—তাদের সম্মান ক্ষুণ্ন মানে জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল হওয়া।
যে শিক্ষক জাতিকে আলো দেখান, তাঁর ঘরে যেন অন্ধকার না নামে। শিক্ষক দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণ হবে, যখন একজন শিক্ষক হাসিমুখে বলবেন—“আমি শিক্ষক, আমি গর্বিত।”
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় যখন শিক্ষকদের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে আসে মাত্র ৫০০ টাকার বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, তখন সেটি গর্ব নয়—একটি গভীর বেদনার প্রতীক।
এ যেন শিক্ষক দিবসের নাম করে শিক্ষকদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তামাশা।
শিক্ষক দিবসের প্রকৃত সম্মান কোনো ফুলের তোড়া বা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় নয়; তা নিহিত থাকে শিক্ষকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার মধ্যে।
যতদিন পর্যন্ত শিক্ষকরা আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা পাবেন না, ততদিন পর্যন্ত এই দিবসের আনন্দ কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে।
জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। তাই শিক্ষক দিবসের প্রহসন নয়, দরকার প্রকৃত সম্মান—যা বাড়ে না ৫০০ টাকায়, বরং বাড়ে হৃদয়ে, নীতিতে এবং ন্যায়বিচারে।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/১০/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
