এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষাঙ্গনের প্রত্যাশা: মন্ত্রী হোন অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের গুঞ্জন জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকায় উঠে এসেছে মোঃ সেলিম ভূঁইয়া–এর নাম। তিনি বর্তমানে কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত।

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার সম্ভাব্য মন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে শিক্ষক সমাজের বড় একটি অংশ তাকে শিক্ষাবান্ধব মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাওয়ার কথা জানাচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সংকট নিরসনে মাঠঘাট চষে বেড়ানো একজন শিক্ষক নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পেলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তবভিত্তিক পরিবর্তন আসতে পারে।

বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ, শতভাগ উৎসব ভাতা, পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া, বৈশাখী ভাতা, টাইমস্কেল ও অবসর সুবিধাসহ নানা দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোট। শিক্ষক নেতাদের দাবি, এসব আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া।

শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, “শিক্ষকদের আন্দোলনের ইতিহাসে সেলিম ভূঁইয়ার নাম আলাদা গুরুত্ব নিয়ে উচ্চারিত হবে। তিনি শুধু বক্তৃতা দেননি, রাজপথে থেকেছেন। শিক্ষক সমাজের কষ্ট, বঞ্চনা ও বাস্তবতা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই তিনি মন্ত্রী হলে শিক্ষা প্রশাসনে মানবিকতা বাড়বে।”

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের আরেক নেতা এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশে অনেক সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এমন মানুষ এসেছেন, যারা বাস্তব শিক্ষাঙ্গনের সংকট সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত ছিলেন না। সেলিম ভূঁইয়া একজন শিক্ষক নেতা হিসেবে সেই অভিজ্ঞতা বহন করেন। ফলে নীতিনির্ধারণে মাঠের শিক্ষকদের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।”

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য কমাতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

কুমিল্লার এক কলেজ শিক্ষক মোঃ হাসান ভুইঁয়  বলেন, “জাতীয়করণ এখন আর কেবল দাবি নয়, এটি শিক্ষাব্যবস্থার ভারসাম্যের প্রশ্ন। সেলিম ভূঁইয়া মন্ত্রী হলে অন্তত এই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে আমরা আশা করি।”

গাইবান্ধার এক শিক্ষক নেতা মাহমুদ প্রামানিক  মনে করছেন, শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব প্রয়োজন। তাদের মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একজন আন্দোলন-সচেতন প্রতিনিধি থাকলে শিক্ষক সমাজের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব কমবে।

শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বাস্তবভিত্তিক সংস্কার আনতে হলে শিক্ষকদের মধ্য থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বড় সংকট হলো নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান। একজন শিক্ষক নেতা মন্ত্রী হলে তিনি শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বুঝবেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তবমুখিতা বাড়তে পারে।”

তিনি আরও বলেন,“বর্তমানে শিক্ষার মান, নৈতিকতা ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রশ্নে নতুন চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষক সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসা কেউ দায়িত্ব পেলে সে জায়গায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে।”

সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক নিয়োগ হিসেবে নয়, সামাজিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন হিসেবেও দেখছেন।

সমাজবিজ্ঞানী ড. আলমগীর হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশে শিক্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। একজন শিক্ষক নেতার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এটি শিক্ষক সমাজের আত্মমর্যাদা ও অংশগ্রহণের অনুভূতি বাড়াবে।”

তিনি মনে করেন, শিক্ষা খাতে সংস্কার কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও। আর সে কারণে শিক্ষা খাতে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব প্রয়োজন।

ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন শিক্ষক গ্রুপে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়াকে সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন শিক্ষকরা। অনেকেই পোস্টে লিখছেন, “শিক্ষক সমাজের একজন প্রতিনিধি মন্ত্রিসভায় চাই।”

বিশেষ করে তরুণ শিক্ষকরা মনে করছেন, শিক্ষা খাতে চাকরির নিরাপত্তা, বেতন বৈষম্য ও মর্যাদার প্রশ্নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেন এমন একজন মানুষ প্রয়োজন, যিনি শিক্ষক রাজনীতির ভেতর থেকে উঠে এসেছেন।

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক সংগঠন এর নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ মাদরাসা শিক্ষা হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই খাত নানা বৈষম্য ও অবহেলার শিকার। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া সবসময় সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে আন্তরিক ভূমিকা রেখেছেন। আমরা আশা করি, তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলে সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়, শিক্ষক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

নন-এমপিও ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক প্রিন্সিপাল মোঃ সেলিম মিঞা বলেন, “অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন করে আসছেন। বিশেষ করে বেসরকারি ও নন-এমপিও শিক্ষকদের বঞ্চনা, বৈষম্য এবং মানবেতর জীবনের বিষয়গুলো তিনি সবসময় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলে শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। শিক্ষক সমাজ আজ এমন একজন নেতৃত্বই প্রত্যাশা করে, যিনি মাঠের বাস্তবতা বোঝেন এবং শিক্ষকদের হৃদয়ের ভাষা অনুধাবন করতে পারেন।

বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষক সমিতির নেতা প্রকৌশলী মো আলমগীর হোসেন  বলেন- “কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা দেশের কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই খাত প্রয়োজনীয় গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলে ভোকেশনাল শিক্ষার আধুনিকায়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

নিয়োগ বঞ্চিত ১ থেকে ১২তম নিবন্ধনধারীদের মুখ্য সমন্বয়ক শাহনাজ পারভীন বলেন, “দেশের হাজার হাজার নিবন্ধনধারী দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগবঞ্চিত অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এই সংকটের বিষয়টি যারা কাছ থেকে দেখেছেন এবং শিক্ষকদের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছেন, তারাই প্রকৃতপক্ষে সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষক সমাজের সেই বাস্তবতা বোঝেন বলেই তাকে ঘিরে শিক্ষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলে শিক্ষক নিয়োগ, বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা খাত দেশের বৃহৎ ভোটব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিতে সরকার যদি শিক্ষক নেতৃত্ব থেকে কাউকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়, তবে তা রাজনৈতিকভাবেও ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মন্ত্রী হওয়া আর বাস্তব পরিবর্তন আনা এক বিষয় নয়। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে শিক্ষক সমাজ
শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখন অপেক্ষা করছেন—গুঞ্জন বাস্তবে রূপ নেয় কি না।

তবে এরই মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, শিক্ষক সমাজ এমন একজন নেতৃত্ব খুঁজছে, যিনি তাদের ভাষা বোঝেন, আন্দোলনের ইতিহাস জানেন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সংকট উপলব্ধি করেন।

অধ্যক্ষ মোঃ সেলিম ভূঁইয়া–কে ঘিরে চলমান আলোচনা তাই কেবল একজন সম্ভাব্য মন্ত্রীকে কেন্দ্র করে নয়; এটি মূলত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক সমাজের মর্যাদা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতিকে ঘিরে জন্ম নেওয়া নতুন প্রত্যাশার প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে শিক্ষাবান্ধব, মানবিক ও বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে স্বপ্ন শিক্ষক সমাজ লালন করে আসছে, সেই স্বপ্নেরই এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি।

শিক্ষাবার্তা /এ/ ১০/০৫/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.