নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা ও এন্ট্রি পদ নবম গ্রেডসহ ৫ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন মাধ্যমিকের শিক্ষক-কর্মকর্তারা। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব দাবি আদায়ে আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা।
বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন এ ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষক – কর্মকর্তারা। স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ এবং ও বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস) পক্ষ থেকে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব দাবি না মানলে চলতি বছরের পাঁচ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ৬৪ জেলায় একযোগে কর্মসূচি ঘোষণার হুশিয়ারে দিয়েছেন তারা ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের, বঞ্চিত সহকারী শিক্ষকদের সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতির এবং বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশের গেজেট করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদের আহবায়ক ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
এসময় বক্তারা আরো বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত জনতার সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করা সরকারের অন্যতম কাজ বলে প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন। এতে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষার মেরুদন্ড মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-কর্মকর্তারা আশান্বিত।
৫ দাবি হলো: স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, সরকারি মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষকের এন্ট্রিপদ ৯ম গ্রেডে উন্নীত করে ৪ স্তরীয় পদসোপান বাস্তবায়ন, অনতিবিলম্বে আঞ্চলিক উপপরিচালকের প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা সংরক্ষণসহ মাধ্যমিকের সকল কার্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা রক্ষা, বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার সব শূন্যপদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন, বকেয়া সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের মঞ্জুরী আদেশ দেয়া।
আরও পড়ুন:
- মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিডিও ক্ষমতা পরিচালকদের হাতে, ক্ষুব্ধ মাধ্যমিকের ডিডিরা
- মাউশিকে দুই ভাগের প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে, নেপথ্যে কী?
- মাউশির দুই ভাগে লাভ-ক্ষতি!
তারা বলেন, সরকারি মাধ্যমিকের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষকের জন্য পদোন্নতিযোগ্য পদ মাত্র ৪ শতাংশ। যৌক্তিক কোনো পদসোপান না থাকায় দীর্ঘ ৩২-৩৩ বছর চাকরি করেও অধিকাংশ শিক্ষককে পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যেতে হয়। পদোন্নতি অনিয়মিত বিধায় বেশকিছু পদ খালি পড়ে থাকে। যা পদোন্নতি বঞ্চিতদের হতাশ করার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। সরকারি মাধ্যমিকে শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রাপ্য বকেয়া টাইমস্কেল, পদমর্যাদা, পদোন্নতি, পদায়নসহ চাকরির বিভিন্নক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সরকারি মাধ্যমিকে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন জরুরি। মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ৫ দাবি বাস্তবায়নে প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের, বঞ্চিত সহকারী শিক্ষকদের সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতির এবং বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশের গেজেট করতে হবে। তবে ওই সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আগামী পাঁচ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ৬৪ জেলায় একযোগে বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে এবং বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের এবং ওইদিন ৬৪ জেলা থেকে একযোগে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে উল্লেখ করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ও নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রেবেকা সুলতানা, ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, নরসিংদীর জেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল খালেক, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এর সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. মঞ্জুরুল হক, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক সিকান্দার আলী খান, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন মাহমুদ সালমী, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির মুখপাত্র ও সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক, গাজীপুর রানী বিলাস মনি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আসাদুজামান নূর, শিক্ষক নেয়া আল মাসুম লিয়েন, শহীদুল্লাহ সাঈদ প্রমুখ।
উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে দুটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সরব শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা বলছেন, মাউশিকে বিভাজন নয় বরং সমতা ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন পদ ও জনবল বৃদ্ধি করে শিক্ষাকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা। তারা মনে করছেন, মাউশিকে বিভক্তির উদ্দেশ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন করা নয় বরং অতীতের ন্যায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা কর্তৃক পদ দখলের প্রয়াস। অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা মনে করছেন, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করলে মাধ্যমিক শিক্ষার গতি বাড়বে, কমবে মাধ্যমিক শিক্ষকদের বৈষম্য। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে দুইটি দপ্তরে ভাগ করার আলাপ বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে উঠলেও এবারের এই দাবি বেশ জড়ালোভাবে আলোচনায় উঠেছে। মূলত গত ৩ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ বা কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামে দুইটি আলাদা অধিদপ্তর করার প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২২ জুলাই প্রত্যাহার হওয়া শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুয়াবের ২১ জুলাই স্বাক্ষর করেন এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার স্বাক্ষর করেন ৩১ জুলাই। মাউশিকে দুই ভাগ করার এই প্রস্তাবের বিষয়টি জানাজানি হয় ২৯ আগস্ট। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বিষয়টি ইতিবাচক এবং মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের সাথে শতভাগ একমত পোষণ করে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য জেলায় জেলায় কর্মসূচী পালন করছেন তারা।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
