এইমাত্র পাওয়া

মাউশির দুই ভাগে লাভ-ক্ষতি!

আল আমিন হোসেন মৃধা, ঢাকা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে দুটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সরব শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা বলছেন, মাউশিকে বিভাজন নয় বরং সমতা ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন পদ ও জনবল বৃদ্ধি করে শিক্ষাকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা। তারা মনে করছেন, মাউশিকে বিভক্তির উদ্দেশ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন করা নয় বরং অতীতের ন্যায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা কর্তৃক পদ দখলের প্রয়াস। অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা মনে করছেন, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করলে মাধ্যমিক শিক্ষার গতি বাড়বে, কমবে মাধ্যমিক শিক্ষকদের বৈষম্য। 

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে দুইটি দপ্তরে ভাগ করার আলাপ বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে উঠলেও এবারের এই দাবি বেশ জড়ালোভাবে আলোচনায় উঠেছে। মূলত গত ৩ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ বা কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামে দুইটি আলাদা অধিদপ্তর করার প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২২ জুলাই প্রত্যাহার হওয়া শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুয়াবের ২১ জুলাই স্বাক্ষর করেন এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার স্বাক্ষর করেন ৩১ জুলাই। মাউশিকে দুই ভাগ করার এই প্রস্তাবের  বিষয়টি জানাজানি হয় ২৯ আগস্ট। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বিষয়টি ইতিবাচক এবং মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের সাথে শতভাগ একমত পোষণ করে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য জেলায় জেলায় কর্মসূচী পালন করছেন তারা। 

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় ৯টি বিভাগীয় কার্যালয় (যা আঞ্চলিক কার্যালয় নামে পরিচিত), ৬৪টি জেলা শিক্ষা অফিস, ৫১৬টি মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, ৬৮৬টি সরকারি কলেজ, ৭০৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০৪টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, একটি উচ্চ মাধ্যমিক টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ২০২৪ এর তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১, ২৩২টি, এর মধ্যে স্কুলের সাথে কলেজ রয়েছে ১,৫১৪ টি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৯ জন  শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ লাখ ৬৬ হাজার ৪২২ জন।

প্রস্তাবনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, “এ সকল প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত মাত্রায় সেবা নিশ্চিত করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। শিক্ষা কাঠামো ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা জরুরী।” শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবকে নিজেদের দাবির প্রতিফলন বলছেন মাউশির মাধ্যমিক শিক্ষার উপ-পরিচালক মোঃ ইউনুছ ফারুকী (মূল পদ সরকারি মাধ্যমিকের প্রধান শিক্ষক)। তিনি দাবি করেন, মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের বৈষম্য কমবে এবং শতভাগ গতি বাড়বে মাধ্যমিক শিক্ষায়। তবে মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অবাস্তব ও অবান্তর বলছে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান ও সাবেক নেতারা। তারা বলছেন, এই একই প্রস্তাবনার আলোকে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা করা হয়েছিল।  একই আমব্রেলা (ছাতা) থেকে বের হয়ে অধিদপ্তর পৃথক হওয়ায় শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি তো হয়নি উপরুন্তু সমন্বহীনতা ব্যাপক হারে বেড়েছে এবং এই দপ্তরগুলোর পদ দখল করেছে প্রশাসন ক্যাডাররা যাদের সাথে শিক্ষার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং শিক্ষা প্রশাসনকে বহুমূখী না করে এক ছাতার নিচে আনতে হবে এবং শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব যেন কোনভাবেই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতের বাহিরে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে দুইটি ভাগে বিভক্ত করার জন্য যে সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে তার একটি সুপারিশ করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) কর্তৃক আয়োজিত ‘Impact Analysis on Education Governance and Management শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে ‘বিয়াম ফাউন্ডেশন গবেষণা ও পরামর্শ সেবা কেন্দ্র (বিএফআরসিএসসি) একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। উক্ত প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং “উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর হিসেবে দু’টি পৃথক অধিদপ্তর সৃজন করার পরামর্শ প্রদান করা হয়। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত ‘বিয়াম ফাউন্ডেশনের গবেষণা সেল মাউশিকে যে দুইভাগে বিভক্ত করার সুপারিশ করেছে তা মাউশিতে প্রশাসন ক্যাডারদের পদ দখলের চেষ্টা বলেই মনে করছেন অধিকাংশ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা। প্রথমত তারা বলছে, এরূপ একটি নীতি নির্ধারনি সুপারিশে শিক্ষার মূল স্টেকহোল্ডার শিক্ষা ক্যাডার তাদের সাথে কোন আলাপ করা হয়নি। বরং বিয়াম ফাউন্ডেশনে কাজ করা প্রশাসন ক্যাডাররা যে সুপারিশ করেছে মুলত মাউশিকে দুই ভাগ করে প্রাথমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি অধিদপ্তরের মত  প্রধান পদগুলোতে নিজেদের আসন বৃদ্ধির পাঁয়তারা ছাড়া কিছু নয়। পতিত হাসিনার আমলের সর্বশেষ ডিসি সম্মেলনে ডিসিরা মাউশিকে দুইভাগ করার প্রস্তাব করেছিল। ডিসিদের কাজ মাঠ প্রশাসনের সংকট নিরসনে সম্মেলনের মাধ্যমে তা সরকারের কাছে সুপারিশ করা। তারা যখন মাউশিকে আলাদা করার প্রস্তাব করে সেখানে যে তাদের দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য ছিল তা সহজেই অনুমেয়। 

স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা হলে এই অধিদপ্তরটির প্রধান পদসহ অধিকাংশ পদ-ই যদি মাদ্রাসা, কারিগরি ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মত প্রশাসন ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় তাহলে মাধ্যমিক শিক্ষার গতি বৃদ্ধি এবং মাধ্যমিক শিক্ষকদের সমস্যা নিরসন হবে বলে মনে করেন কি না এমন প্রশ্নে মাউশির মাধ্যমিক শিক্ষার উপ-পরিচালক মোঃ ইউনুছ ফারুকী শিক্ষাবার্তা’কে জানান, আমরা যেমন স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা করার দাবি করেছি তেমনই এই দপ্তরটির পদ সংরক্ষণের দাবিও জানিয়েছি। 

মোঃ ইউনুছ ফারুকী বলেন, মাউশিকে দুই ভাগে বিভক্ত করার বিষয়ে শুধুমাত্র ২০১০ সালের শিক্ষা নীতিতেই প্রস্তাব করা হয়নি এটি বিএনপি সরকারের আমলে অর্থ্যাৎ ২০০৩ সালের শিক্ষা কমিশনেও বলা হয়েছিল।  এই প্রস্তাব বহুবার বহুভাবে করা হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন সময় এসেছে বাস্তবায়ন করার। 

তবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০০৩ সালের শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে মূলত বোঝানো হয় বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩ বা সেই সময়কার শিক্ষার নীতিমালা ও কাঠামো। তবে স্পষ্টভাবে বললে, ২০০৩ সালে বাংলাদেশে কোনও পূর্ণাঙ্গ নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়নি। তবে ওই সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থায়  তিন ধারার শিক্ষা চালু ছিল —সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা।  ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, ও মাদ্রাসা — এই তিন ধারায় শিক্ষার্থীদের মান, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ ভিন্ন ছিল। সিলেবাস ও পাঠ্যবই ছিল পৃথক পৃথক ধারার জন্য আলাদা। পিএসসি/জেএসসি পরীক্ষা ছিল না — এগুলো চালু হয় পরবর্তীতে। তখনকার চ্যালেঞ্জগুলো ছিল ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও মানসম্মত শিক্ষা অভাব।  পরবর্তীতে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে ২০১০ সালে “জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০” প্রণয়ন করা হয়, যেখানে বলা হয় “একই ছাতার নিচে শিক্ষা”, অর্থাৎ সমতা ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। আপনি একই ছাতার নিচে শিক্ষার কথা বলে শিক্ষার দপ্তরে বিভাজন করবেন এবং সেখানে শিক্ষার মূল স্টেক হোল্ডারদের হাত থেকে শিক্ষার বাইরের কর্মকর্তাদের পদায়ন করবেন তাহলে কিভাবে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করবেন? 

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর মূলত শিক্ষা ক্যাডারের কলেজ শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত হয়, স্বাভাবিক ভাবেই মাধ্যমিক শিক্ষকরা বঞ্চিত হবে এবং শিক্ষা ক্যাডাররা সব ধরণের সুযোগ সুবিধা পাবে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় তিন লাখ শিক্ষকের স্বার্থ সংরক্ষণে মাউশিতে মাধ্যমিকের মাত্র তিনটি পদ। বাকি সব শিক্ষা ক্যাডারদের। তাহলে কিভাবে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে কিভাবেই বা মাধ্যমিক শিক্ষকদের স্বার্থ? এখানে উন্নয়ন হলে হবে কলেজ শিক্ষকদের। মাত্র ৮,০০০ মাদ্রাসা এবং ১,৮০০ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক অধিদপ্তর রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২৫,০০০ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও কেন স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর হবে না প্রশ্ন রাখেন তারা। কাজের চাপ কমানোর জন্য হলেও তাদের মতে স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রয়োজন। 

তবে তাদের এই দাবির পক্ষে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে শিক্ষা ক্যাডাররা বলছেন, মাধ্যামিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর যদি কলেজ শিক্ষকদের নিয়ে পরে থাকতো তাহলে প্রভাষক পর্যায়ে পদোন্নতির জন্য এক যুগ অপেক্ষা করতে হতো না। অধিদপ্তর আলাদা হলে একই প্রতিষ্ঠানে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু হবে, শিক্ষার গুণগত মনোন্নয়নে সমন্বয়হীনতা দেখা দিবে। একই আমব্রেলা থেকে বের হয়ে অধিদপ্তর পৃথক হলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি তো হবেই না উপরুন্তু সমন্বয়হীনতা ব্যাপক হারে বাড়বে। এর উদাহরণ প্রাথমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। তারা যে বৈষম্যের কথা বলছেন এর অন্যতম কারণ শিক্ষায় জিডিপি বরাদ্দ কম, পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি না হওয়া, ছাত্র শিক্ষক আদর্শ অনুপাত মানা হচ্ছে না, শিক্ষা প্রশাসনে পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। এর জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি করতে হবে, শিক্ষার মানোন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সুষ্ঠু পদায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, শিক্ষা প্রশাসনকে বহুমূখী না করে এক ছাতার নিচে আনতে হবে। 

স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠায় সরকারের প্রস্তাবকে ইতিবাচক এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে মাউশির মাধ্যমিকের একজন আঞ্চলিক উপ-পরিচালক শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, কলেজ শিক্ষকদের মত চারস্তরীয় পদসোপান না থাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘ চাকরি করেও অবশেষে পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যাচ্ছেন। আমাদের একটি আশা ছিল সরকারি মাধ্যমিকে যেসমস্ত বৈষম্যগুলো আছে, সেই বৈষম্যগুলো দূর হবে। কিন্তু আমাদের সেই আশা পূরণ হয়নি। এর একমাত্র সমাধান মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর উচ্চ মাধ্যমিক থেকে আলাদা করতে হবে। কারণ এই অধিদফতরে যে বাজেট বরাদ্দ সরকার দেয় তার ৯০ ভাগই উচ্চ মাধ্যমিকে চলে যায়। এছাড়াও মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে যে বরাদ্ধ বা যে প্রকল্প তা উচ্চ মাধ্যমিকের তুলনা নগণ্য।  ফলে মাধ্যমিক শাখা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। 

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষকরা শিক্ষকতার উপযুক্ত মর্যাদা হিসেবে নিয়মিত পদোন্নতি চান। নিজের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক স্বহস্তে প্রণয়নের অধিকার চান। শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবি, নায়েম, ব্যানবেইসে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব চান। মাধ্যমিক শিক্ষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, শিক্ষা সংক্রান্ত এসব কাজ সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিখুঁতভাবে সম্পাদন করার মতো যথেষ্ট যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক বাংলাদেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে আছে। অতএব, তাদের চাওয়া ২০১০ সালের শিক্ষানীতির সুপারিশের আলোকে মাধ্যমিক শিক্ষাকে উচ্চ শিক্ষা স্তর থেকে আলাদা করে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করা হোক- যাতে তারা সেখানে স্বাধীনভাবে তাদের শিক্ষার্থীদের শারীরিক মানসিক ও নৈতিক শিক্ষার উন্নয়নে উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারেন, পারেন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। 

এ বিষয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, মাউশির আওতাধীন বর্তমানে পরিচালিত ৯টি প্রকল্পের মাত্র ২টি প্রকল্প কলেজ শিক্ষার উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বাকি ৭টি প্রকল্প এবং ৩টি স্কিমই মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়নে। মাউশির মাধ্যমিক শাখা, মনিটরিং শাখা এবং শারিরীক শিক্ষা বিভাগের শতভাগ কাজ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট এবং বাকি ৪টি শাখার ৮০ ভাগ কাজও মাধ্যমিক সংশ্লিষ্ট। ফলে এখানে বৈষম্যের কিছু নেই। তিনি বলেন, শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবি, নায়েম, ব্যানবেইস এগুলো কোন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এগুলো বিশেষায়িত পেশাদারী প্রতিষ্ঠান। এগুলোতে এক জন দুই জন প্রতিনিধি নিয়োগ বা পদায়ন উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কাজের ধরণের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। 

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক) ড. মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, মাউশি আলাদা করার ব্যাপারে ২০০৩ সালে মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন সুপারিশ করেছিল। তাই এটা নতুন কিছু নয়। সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (SESIP) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল পৃথক অধিদপ্তর তৈরি করা।

বিদ্যমান বর্তমান কাঠামোতে মাধ্যমিক শিক্ষকদের সর্বোচ্চ পদ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার উপ-পরিচালক পদ। সার্বিক বিষয়ে মাউশির মাধ্যমিকের উপ-পরিচালক মোঃ ইউনুছ ফারুকী শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতি, ২০০৩ সালের শিক্ষা কমিশন, গত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত সচিব-সভায় প্রধান উপদেষ্টা প্রত্যেক মন্ত্রণালয়/বিভাগকে প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য মার্চিং অর্ডার প্রদান করে যার প্রস্তাবনাসমূহের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-এ দু’টি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার করা, জন প্রশাসন সংস্কার কমিশন কর্তৃক দুই অধিদপ্তরে রুপান্তর করার সুপারিশ। এগুলো কাকতালিয়া নয়। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যই সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। আমরা আগে থেকেই দাবি করে আসছিলাম। বর্তমান সরকারও সেই একই অভিমত দিয়েছেন। তাছারা শিক্ষা ক্যাডারদের সর্বোচ্চ পদ চতুর্থ গ্রেডের, আমাদের অন্তত ১০০ জনের উপরে কর্মকর্তা রয়েছেন যারা চতুর্থ গ্রেডে কর্মরত রয়েছে। এরা প্রশাসনিক দক্ষতায় কোন অংশে কম নয়। ২০০৫ সাল থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন।  আমরা মনে করি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা হলে অবশ্যই মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে। 

জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. শওকত হোসেন মোল্লা শিক্ষাবার্তা’কে বলেন,  প্রথমত: মাউশি খন্ডিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। মাউশিতে জনবল বৃদ্ধি করে শক্তিশালী করলেই আলাদা করার কোনো প্রয়োজন হবে না। আলাদা করলে নানা রকম সমন্বয়হীনতা তৈরি হবে। আওয়ামীলীগ আমলে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিন্তু আমাদের যৌক্তিক আপত্তির কারণে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। এটা যদি সরকারের পলিসি হয় তাহলে অবশ্যই সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার হিসেবে শিক্ষা ক্যাডারের সাথে আলোচনা করা দরকার ছিল। অবশ্য এখনও সুযোগ আছে। আমি মনে করি দেশের প্রয়োজনে যদি মাধ্যমিকের জন্য আলাদা অধিদপ্তর প্রয়োজন হয় তাহলে অবশ্যই সেটা শিক্ষা ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণে হতে হবে।

এ বিষয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি শাহেদুল খবির চৌধুরী শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন  বিসিএস সাধারণ শিক্ষাকে ক্যাডার বহির্ভূত করার সুপারিশ করেছিল। অন্যান্য সংস্কারের ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশন সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সাথে একাধিক বৈঠক করে যেগুলোতে অধিকাংশ অংশীজন একমত পোষণ করেছিল সেগুলো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। অথচ ১৬ হাজার শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা না করেই শিক্ষা ক্যাডারকে বিলোপের সুপারিশ করা হয়েছিল। যা ছিল অনভিপ্রেত এবং অপ্রত্যাশিত। এরই ধারাবাহিকতা হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে পৃথক দুইটি অধিদপ্তরে রুপান্তর করার মন্ত্রণালয়ের ও জনপ্রশাসনের সুপারিশ। সংস্কারের মাধ্যমে সব বৈষম্য নিরসন ও গতিশীল জনবান্ধব জনপ্রশাসন তৈরির লক্ষ্যে গঠিত কমিশনের এ ধরনের সুপারিশ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈষম্যবিরোধী মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রথম গ্রেডে অবসরে যাচ্ছে অথচ শিক্ষা ক্যাডার ৪র্থ গ্রেডে আটকে আছেন।  বছরের পর বছর পদোন্নতি বঞ্চিত রয়েছেন কর্মকর্তারা। এসব বৈষম্য নিরসনে তারা উদাসীন।  কিভাবে একটি দপ্তরকে ভেঙ্গে নতুন দপ্তর সৃষ্টি করা যায় কিভাবে প্রশাসন ক্যাডারদের জন্য নতুন চেয়ার সৃষ্টি করা যায় সেগুলোতেই মনোযোগ বেশি। শিক্ষার মানোন্নয়নে মাউশির বিদ্যমান কাঠামোতে জনবল বৃদ্ধি ও বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। আলাদা দপ্তর কোন সমাধান নয় এটার মধ্যে ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। অতীতে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর তার উদাহরণ। 

জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক  ড. মাসুদ রানা খান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন,  ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান ক্যাডার সার্ভিস তৈরি করেন, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য শিক্ষা ক্যাডার তৈরি করা হয় (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব শিক্ষা ক্যাডারের)।  কলেজে শিক্ষকতা এর একটা অংশ, এর বড় দায়িত্ব হলো শিক্ষার ব্যবস্থাপনা। কেন শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা ক্যাডার দরকার? শিক্ষা ব্যবস্থাপনা শিক্ষকের হাতেই থাকবে এটাই পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত কিন্তু বাংলাদেশে প্রশাসন ক্যাডার প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যবস্থাপনায় আছে।  একটি জাতির উন্নয়নের জন্য ‘sustainable development’ উপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এ জন্য সকল সেক্টরে ‘specialization’ এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে একমাত্র শিক্ষা ক্যাডারই শিক্ষার আওতাধীন সকল কার্যক্রম পরিচালনার বৈধ কর্তৃপক্ষ। মাউশিকে দুই ভাগ করে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার বাইরের কাউকে পদায়নের সুযোগ দিব না। 

জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল শিক্ষাবার্তা’কে শিক্ষার মূল অংশীজন শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই সরকারের এমন প্রস্তাব নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবার মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ক্যাডারের মত একটি বৃহৎ ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ না রেখে সরকারের উচিত সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সামনে এগোনো।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠিত হোক সেটা আমরাও চাই। কিন্তু সেটা যেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায়। অতীতে যেমন অন্যান্য অধিদপ্তর গুলো আলাদা করা হলেও সেগুলো শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। 

জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রাজেকুজ্জামান জানান, দপ্তর মানেই পদ। আর পদ মানেই আধিপত্যের লড়াই। বিদ্যমান কাঠামোতে কি সমস্যা সেগুলো চিহ্নিত না করে শুধু অধিদপ্তর আলাদা করলে তার কোন সুফল মিলবে না বরং ভোগান্তি বাড়াবে। শিক্ষা যদি প্রশাসন ক্যাডারের দখলে চলে যায় তাহলে ভোগান্তি বাড়বেই। বরং আমার মতে দপ্তর আলাদা না করে জনবল বৃদ্ধি ও বরাদ্দ বাড়িয়ে যে সংকট গুলো আছে সেগুলো নিরসন করা সম্ভব। এখানে অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানে অধিক মনোযোগী হওয়া দরকার। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০১/০৯/২০২৫ 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.