এইমাত্র পাওয়া

ক্ষমতার দাপট থেকে পতন: ডিসি সুলতানা কারাগারে, শিশিরের অপেক্ষা 

।। হাওলাদার  আবুল কালাম আজাদ ।। 

বাংলাদেশে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা প্রায়শই আলোচনায় উঠে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো—পাপ বাপকে ক্ষমা করে না। অনিয়ম, নির্যাতন ও ক্ষমতার দাপট দিয়ে মানুষকে জিম্মি করার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। দেরিতে হলেও বিচার-প্রক্রিয়ায় সেই দায়-দায়িত্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহ বাস্তবতা নতুনভাবে সামনে এসেছে। একইসঙ্গে আলোচনায় এসেছে আরেকজন আলোচিত কর্মকর্তা—মাউশির শিশির, যিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত সবাই যাকে বলে দুর্নীতিবাজ শিশির। তিনি আবার কেস কাবারি করেন মানুষের বিরুদ্ধে।
এই দুটি ঘটনা সমান্তরালভাবে প্রশাসনের রোগ, দায়বদ্ধতার অভাব এবং জবাবদিহির সংকটকে প্রতিফলিত করে।

২০২০ সালের ১৩ মার্চ রাত। সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে আনা হয়। অভিযোগ আনা হয় যে তার কাছে আধা বোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। কিন্তু সত্য হলো—এটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো অভিযোগ। প্রকৃতপক্ষে, আরিফুল ইসলাম প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন। একটি পুকুরের নামকরণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর থেকে তিনি প্রশাসনের ক্ষোভের মুখে পড়েন।

তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা রাতের অন্ধকারে যে নাটক সাজালেন, তা শুধু সাংবাদিক নির্যাতনই নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ক্ষমতার নগ্ন ব্যবহার ছিল। আরডিসি নাজিম উদ্দিন, এনডিসি রাহাতুল ইসলাম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা—তাদের প্রত্যেকেই এই অপকর্মে জড়িত ছিলেন। সাংবাদিককে চোখ বেঁধে এনে নির্যাতন করা হয় এবং পরদিন ভোরেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। সাংবাদিক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নির্যাতনের ভয়াবহ রূপ সেই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

বছরের পর বছর মামলা চলার পর সম্প্রতি আদালত সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। যদিও তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্ত ছিলেন, তবে স্থায়ী জামিনের আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়। এ রায় প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রযন্ত্র যতই প্রভাবশালী হোক, আদালতের কাছে সবাই সমান।

সাংবাদিক নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত একজন জেলা প্রশাসককে কারাগারে পাঠানো নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি একদিকে যেমন প্রশাসনের জন্য সতর্কবার্তা, অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের আশ্বাস।

সুলতানা পারভীনের ঘটনার সঙ্গে সমান্তরালে আলোচনায় এসেছে আরেকজন আলোচিত কর্মকর্তা শিশির। এই শিশির মামলাবাজ হিসেবে বহুল সমালোচিত। তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম, পদোন্নতিতে দুর্নীতি, অফিসকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার, মনুষকে মামলা দিয়ে হেরেজসহ অসংখ্য অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা গেছে—কর্মকর্তারা নিজেদের সর্বশক্তিমান মনে করেন। তারা ভাবেন, সাধারণ মানুষ কিংবা সাংবাদিকরা তাদের জবাবদিহির আওতায় নেই। ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্ম ঢেকে রাখতে ক্ষমতার ব্যবহার করা হয়।

সুলতানা পারভীন কিংবা শিশির কেবল দুটি উদাহরণ। প্রশাসনের ভেতরে অসংখ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও ঘুষ, কোথাও নিয়োগে অনিয়ম, আবার কোথাও সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন নতুন কিছু নয়। কোনো সময় শারীরিকভাবে হামলা করা হয়, কোনো সময় আইনি হয়রানির ফাঁদে ফেলা হয়। প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত, তারা সাংবাদিকদের শত্রু মনে করেন। অথচ সাংবাদিকদের কাজ হলো দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকাশ করা, যাতে সমাজ ও রাষ্ট্র সঠিক পথে চলতে পারে।

কুড়িগ্রামের ঘটনা যেমন এক ধরনের শারীরিক নির্যাতনের দৃষ্টান্ত, তেমনি শিশিরের মামলা হামলা হলো আইনি নির্যাতনের নতুন রূপ। দুই ঘটনাই সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা।

এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভয়ভীতি বা মামলার ভয় পেয়ে যদি গণমাধ্যম দুর্নীতির খবর প্রকাশ বন্ধ করে দেয়, তবে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আরও সাহসী হয়ে উঠবেন। গণমাধ্যমের উচিত—প্রমাণ, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করা এবং সাংবাদিক সমাজের ঐক্য জোরদার করা।

সুলতানা পারভীনের ঘটনা প্রকাশ না হলে হয়তো তিনি আজও একজন প্রভাবশালী ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। অনুরূপভাবে শিশিরের দুর্নীতির খবর প্রকাশ না হলে তার অসৎ কার্যকলাপ অজানাই থেকে যেত। সুতরাং গণমাধ্যম সমাজের আয়না হিসেবে সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করলেই দুর্নীতিবাজরা বিচারের আওতায় আসবে।

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য জোটের মহাসচিব জাকির হোসেন বলেছেন, “কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা প্রমাণ করেছে যে প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার আর চাপা রাখা যাবে না। সাংবাদিক নির্যাতনের মতো জঘন্য ঘটনায় দোষীরা শাস্তি পেলে শিক্ষক ও কর্মচারীরা যেমন সাহস পান, তেমনি সাধারণ মানুষও ন্যায়বিচারে আস্থা পায়। দুর্নীতিবাজ শিশির সহ সকল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। তারা চায় দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হোক, নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়। সাবেক ডিসি কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় জনগণের ভরসা বেড়েছে যে—ন্যায়বিচার সম্ভব। তবে শুধু একটি বা দুটি ঘটনা দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। এজন্য দরকার—কঠোর জবাবদিহি ব্যবস্থা, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণ হলে দ্রুত শাস্তি।

“পাপ বাপকে ক্ষমা করে না”—কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনের ঘটনা এ কথাটিকে আবারও সত্য প্রমাণ করেছে। একজন জেলা প্রশাসকের মতো ক্ষমতাবান ব্যক্তি রাতের আঁধারে সাংবাদিক নির্যাতন করে ভেবেছিলেন, এই অপরাধ কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু চার বছর পর হলেও আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে।

অন্যদিকে, শিশিরের মতো কর্মকর্তারা এখনও ক্ষমতার দাপটে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে চেষ্টারত। তবে যদি গণমাধ্যম, জনগণ এবং আদালত দৃঢ় থাকে, তাহলে একদিন শিশির সহ তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশকে একটি শিক্ষা দেয়—কোনো অপরাধই চিরকাল গোপন থাকে না, এবং কোনো দুর্নীতিবাজই শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়াতে পারে না। প্রশাসনকে অবশ্যই বুঝতে হবে—তাদের ক্ষমতা জনগণের সেবায়, নিপীড়নে নয়।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক 

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট।

“মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০৩/০৯/২০২৫

 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.