।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রাজধানীর খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উইলস লিটন ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ—যেখানে হাজারো শিক্ষার্থী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে বেড়ে ওঠে, যেখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিবেদিতপ্রাণ সেবায় চলে শিক্ষার এক অদৃশ্য মহাযজ্ঞ—সেই শিক্ষালয় আজ এক গভীর শোকে নিমজ্জিত। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠানে নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন রামচন্দ্র মন্ডল। কর্মজীবনের প্রায় অর্ধেক সময় এই প্রতিষ্ঠানে কাটিয়েছেন তিনি। ছিলেন একজন সুনিপুণ কাঠমিস্ত্রি, যাঁর হাতে গড়ে উঠেছে স্কুলের বহু আসবাবপত্র, দরজা-জানালা, আলনা-কাঠামো—আরও কত কী!
রামচন্দ্র মন্ডল ছিলেন শুধু একজন কর্মী নন, ছিলেন স্কুল পরিবারের একজন প্রিয় মানুষ। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘দাদা’, শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন এক স্নেহশীল অভিভাবকের মতো। তাঁর মুখে কোনো দিন বিরক্তির সুর শোনা যায়নি, ক্লান্তি ছিল তাঁর অভিধানে অনুপস্থিত।
কিন্তু নিয়তি যেন তার শেষ অধ্যায়টা লিখে রেখেছিল এক গভীর বিষাদের কালি দিয়ে।
আজ শুক্রবার, স্কুলে একটি চাকরির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। অন্যান্য দিনের মতো রামচন্দ্র মন্ডলের ডিউটিও নির্ধারিত ছিল সেই দিনটিতে। কিন্তু আগের দিন সকালেই তিনি কেয়ারটেকার ফখরুদ্দিন সাহেবকে জানিয়ে দেন—“ভাই, কাল আমি ডিউটি করব না, বাড়ি যাব।” সাধারণত এমন কথা তাঁর মুখে শোনা যেত না। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা তার চরিত্রে ছিল না একেবারেই। কিন্তু আজ যেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি বুঝে নিয়েছিলেন—এই পৃথিবীতে তাঁর দায়িত্ব শেষ। তিনি যাচ্ছেন, তবে আর ফিরবেন না।
সে ‘বাড়ি’ যে চিরদিনের জন্য, তা কে জানত?
তিনি সত্যিই বাড়ি গেছেন—তবে লাশ হয়ে।
খবরটি বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্কুলজুড়ে। সহকর্মীরা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থীরা, অভিভাবক—সবাই স্তব্ধ। একজন নিরহঙ্কার, নিবেদিতপ্রাণ সহকর্মী হঠাৎ করে না ফেরার দেশে চলে যাবেন, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
জীবনের শেষপ্রান্তেও তিনি ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। তাঁর অকালমৃত্যু শুধু স্কুল পরিবারের নয়, একটি সাধারণ পরিবারের জীবনের গতিপথ বদলে দিলো। আজ যে মানুষটি ছিল পরিবারের ছায়া, সেই ছায়া আজ নেই।
তার সহকর্মীদের চোখে জল, গলায় ভার। “দাদা তো সবসময় হাসিখুশি ছিলেন। কাজ নিয়েই থাকতেন। এভাবে চলে যাবে ভাবতেও পারি না,”—বলছিলেন একজন সহকর্মী।
মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত, কতটা অপ্রত্যাশিত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে রইলেন রামচন্দ্র মন্ডল। যে মানুষটি সকালে জানিয়েছিলেন কাল আমি ডিউটি করব না’, সেই মানুষটির নিথর দেহ কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছায় নিজ বাড়িতে।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, সম্ভবত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এর নিশ্চিত কারণ জানা যায়নি এখনো। তবে এটুকু স্পষ্ট, শেষ মুহূর্তে কোনো শারীরিক কষ্ট বুঝিয়ে দেননি তিনি। চুপচাপ চলে গেলেন, যেন জীবনটাকেও ক্লান্তি না দিয়ে শেষ বিদায় জানান।
রামচন্দ্র মন্ডলের মতো মানুষরা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণনায় সামান্য “সাপোর্টিং স্টাফ”, কিন্তু বাস্তবের পর্দায় তাঁরাই প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করিয়ে রাখেন দৃঢ় ভিতে। আজ যখন তিনি নেই, তখন প্রশ্ন আসে—তাঁর পরিবারের পাশে প্রতিষ্ঠান কীভাবে দাঁড়াবে ?
জীবনের চাকা থেমে গেলেও কর্মের স্মৃতি থামে না। রামচন্দ্র মন্ডলের মতো মানুষদের মৃত্যু হয় না, তাঁরা থেকে যান প্রতিষ্ঠানের দেয়াল, বেঞ্চ, টেবিল, স্মৃতির পাতায়—আর সহকর্মীদের মনে।
আমরা এই নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক : এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান
শিক্ষক, উইলস লিটন ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল