এইমাত্র পাওয়া

প্রাথমিকে ডিজিটাল হাজিরা এবং বর্তমান সময় সূচি

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ডিজিটাল হাজিরা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে হাজিরা যথাসময়ে নিশ্চিত করতে এই আয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাগত জানাই আয়োজকদের। সফল হউক এই বিশাল উদ্যোগ। তবে যে কোন কাজ করতে হলে প্রয়োজন হয় পূর্ব প্রস্তুতির। মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে, ঝড়ে পড়া প্রতিরোধ করতে, নিকটবর্তী কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর চাইতে সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের উপস্হিতি বাড়াতে শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরী। শিশুবান্ধব পরিবেশ আসলে কী? আমি প্রথমেই বলবো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যালয়ে অবস্হান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। এটা থেকে পরিত্রানের উপায় হচ্ছে – বিদ্যালয়ের কর্মঘন্টা কমানো। আমার তো মনে হয়, কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোর তুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেক মেধাবী( যাঁরা সরকারিভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত)। তারপরও অভিভাবকরা কেন কিন্ডারগার্টেন দিকে ঝুঁকছেন?

এ সমস্যার অন্যতম কারন হচ্ছে – দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্হান। তাই এই সমস্যা থেকে রিমুভ করার একটা উপায় তা হলো- প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সময়সৃচি ১০ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত কার্য্যকর করা মানবিকতার ব্যাপার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূূচি পরিবর্তনের বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। আশার কথা, কর্তা ব্যাক্তিদের হয়তো শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিকের কর্মঘণ্টা কমানো হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন”। আমি বলি, “আগে চাই প্রাথমিকের কর্মঘণ্টা কমানো (১০ টা থেকে ৩ টা), তারপর ডিজিটাল হাজিরার পত্তন” কারন প্রাথমিকের শিক্ষকেরা রোবট নয়, রক্তে- মাংসে গড়া মানুষ। প্রাথমিকের ডিজিটাল হাজিরার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের কর্মঘণ্টা কমানো কেন জরুরি – এ বিষয়ে একটু আলোচনা না করলেই নয়। শিক্ষকতা একটা মহান ও বিশাল মানসিক চাপের পেশা।

শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা ছাড়াও শিক্ষকদের আরও ক্লাশ বহির্ভূত কাজ করতে হয়, যার ফলে শিক্ষকগণ মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। এই তো সে দিন ৩০ অক্টোবর ২০১৯ “দৈনিক ইত্তেফাক” পত্রিকায় প্রকাশিত প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক (৫১) পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন। পড়াতে পড়াতে হঠাৎ করেই মেঝেতে ঢলে পড়েন। প্রিয় শিক্ষকের এমন অবস্থা দেখে শিক্ষার্থীদের চিৎকারে ছুটে আসেন অন্য শিক্ষকরা। অচেতন শিক্ষককে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। সেদিন ছিল মঙ্গলবার লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের তাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকের একজন সহকারি শিক্ষিকা ( নাম ও লোকেশান প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ভাই আমার হার্টের সমস্যা আমি বিশ কিলোমিটার দুর থেকে বিদ্যালয়ে আসি। ছোট বাচ্ছা বাসায় রেখে আসি। রাস্তাঘাটের ব্যাপার। ডিজিটাল হাজিরা খুব ভালো উদ্যোগ। তবে এটা কার্যকরি করার পূর্বে বিদ্যালয়ের সময়সূচি পরিবর্তন করলে আমাদের উপকার হতো। বিশেষ করে সকাল ১০ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত হলে সব চাইতে ভালো হতো।

প্রাথমিকের একজন শিক্ষককে প্রতিদিন ৭/৮ করে ক্লাশ নিতে হয়। একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন এই পরিমাণ ক্লাশ নেন তাহলে শিক্ষকদের স্বাস্থ্য ঝঁুকিতে পরতে হয়। আবার শব্দ দূষণ তো আছেই। শব্দ দূষণের তিনটি প্রধান উৎস এর মধ্যে প্রাইমারী স্কুল টিচিং অন্যতম। একুশ শতকের চ্যালেন্জ মোকাবিলায় শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে যাতে করে পরবর্তী প্রজন্মের কান্ডারীরা শিক্ষকতা পেশাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। এই মহৎ কাজ করতে গিয়ে পিছুটান আসবেই, তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্হান এবং ৯০ থেকে ১১৫ ডেসিবল শব্দ দুষণের মধ্যে ক্লাশ কার্যক্রম চালাতে হয়।

শব্দের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৪৫ ডেসিবল -এটা শব্দ দুষণের মধ্যে পড়ে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হউক বা না হউক। যে কোন সুস্হ ব্যক্তি যদি একটানা ১০ বছর, ৯০ থেকে ১১৫ ডেসিবল শব্দের মধ্যে অবস্হান করে বা পেশাগত কাজ চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শ্রবণ শক্তি হ্রাস পেতে পারে। একথা গুুলো আমি পূূূর্বেও লিখেছিলাম। এখন আসা যাক, শিক্ষকদের ডিজিটাল হাজিরা বাস্তবায়নসহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি কার স্বার্থে পরিবর্তন করা যেতে পারে? কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকতে হয়, -ফলে তারা দুপুরে ঘুমাতে পারে না। এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের সময়সূচি ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কার্যকরি করা প্রয়োজন।

রক্তে মাংসে গড়া একজন প্রাথমিকের শিক্ষক শিক্ষিত জাতি বিনির্মাণের প্রথম কারিগড়- যাঁদেরকে রিলাক্সে রাখাও আমার, আপনার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। রিলাক্স বলতে একজন শিক্ষককে দিয়ে দৈনিক ৬/৭ টি ক্লাশ না নিয়ে, ক্লাশের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে সময় সূচি ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত করা যেতে পারে। সেইসঙ্গে তাদের ক্লাশ বহির্ভূত কাজে না সম্পৃক্ত না করাই উত্তম। ক্লাশ কমানোর ক্ষেত্রে অবশ্য শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ালেও বাড়ানো যেতে পারে। স্কুলিং আওয়ার ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত হলে শিক্ষকেরা অনেকটা রিলাক্সেই থাকবে।

বিদ্যালয়ের সময়সূচি ১০ টা থেকে ৩টা পর্যন্ত করা হলে -শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই ক্লান্তি ও অবসাদগ্রস্ত হবে না। একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন বিরতিহীন বা একটানা ৬/৭ টি ক্লাশ করেন। তাহলে অঘোষিত ক্ষতি শিক্ষার্থীদেরই ভোগ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক প্রথম, দ্বিতীয় ক্লাশটি হয়ত রিলাক্সের সহিত ফলদায়ক বা কার্যকরভাবে নিতে পারেন। কিন্তু পরবর্তী ক্লাশগুলো হয় দায়সারা প্রকৃতির। শিক্ষক হিসেবে তিনি যতই দায়িত্বশীল হউক না কেন তিনি তো রোবট নন।, তাঁরা তো রক্তে মাংসেই গড়া। জকিগন্জ উপজেলার দীপ্তি বিশ্বাস যে ক্লাশে ঘুমিয়েছিলেন, তা ক্লান্তি ও অবসাদের জন্য তো বটেই। শুধু দিপ্তি বিশ্বাসই নন, এ রকম অনেক শিক্ষক আছেন, যারা বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবস্হানের কারনে ও “ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভূ “-এ ধরনের বা প্রাকৃতিক কারনে এখনও মাঝে মাঝে অনেক শিক্ষক ক্লাশেই ঝিমায় বা ঝিমাচ্ছেন। এর কি কোন সমাধান আছে? এটা তো প্রাকৃতিক কারন!

বলছিলাম না? তাঁরা তো রোবট নয়, রক্তে মাংসে গড়া মাটির মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিটি শিক্ষকের সংসার আছে, স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তান- সন্ততিও আছে। তাদের বাচ্চাদেরকেও যে দেখভাল করতে হয়, সেটাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটু ভেবে দেখা দরকার নয় কী? পরিশেষে, শিক্ষক- শিক্ষার্থী এবং বৃহত্তর স্বার্থে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্বের সময়সূচি পরিবর্তন করে ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত কার্যকরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি গুণীজনেরা কামনা করেন। [মতামতের জন্য সম্পাদ দায়ী নন] লেখক : শিক্ষক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.