নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ রাজধানীর মতিঝিলের টি এন্ড টি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগে ‘মহাজালিয়াতি’ নিয়ে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের জেরে টি এন্ড টি কলেজ, মতিঝিলের অধ্যক্ষ মোঃ নূর হোসেনকে অব্যাহতি দিয়েছে কলেজের গভর্নিং বডি। একই সাথে কলেজটির দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে “কোনো নিয়মই মানা হয়নি টি এন্ড টি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগে তবুও এমপিওভুক্তি” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা”য় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
গতকাল রবিবার (১৫ ডিসেম্বর) কলেজটির গভর্ণিং বডির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোঃ ছগীর আহমেদ স্বাক্ষরিত পৃথক পত্রে নূর হোসেনকে অব্যাহতি এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদানের চিঠি ইস্যু করা হয়।
অধ্যক্ষ মোঃ নুর হোসেনের অব্যাবহতি পত্রে বলা হয়, “আপনার বিরুদ্ধে কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দৈনিক পত্রিকায় আপনার নিয়োগের বিষয়ে অনিয়ম সংক্রান্ত রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আপনাকে প্রশাসনিক, আর্থিক ও শিক্ষা কার্যক্রমসহ কলেজের যাবতীয় সকল ধরণের কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি প্রদান করা হলো। সাময়িক অব্যাহতিকালীন আপনি আইন অনুযায়ী ভাতাদি প্রাপ্য হবেন।”
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া পৃথক চিঠিতে বলা হয়, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দৈনিক পত্রিকায় অধ্যক্ষের নিয়োগের বিষয়ে অনিয়ম সংক্রান্ত রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অধ্যক্ষ সাময়িক অব্যাহতিপ্রাপ্ত হওয়ায় আপনাকে অত্র কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হল। আপনি আপনার বর্তমান দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করবেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে বিধি মোতাবেক ভাতাদি প্রাপ্ত হবেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আপনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যক্ষের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবেন।”

উল্লেখ্য, শিক্ষাবার্তা’য় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ ইং তারিখে শূন্যপদের বিপরীতে একজন অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে টি এন্ড টি কলেজ কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ পরিপত্র/প্রজ্ঞাপন মোতাবেক টি এন্ড টি কলেজে শূন্যপদে ১ জন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ২২ মার্চ ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অধ্যক্ষ নিয়োগে কলেজ কর্তৃপক্ষ মোট ০৯টি ব্যাংক ড্রাফট ব্যাংকে জমা প্রদান করেন এবং কলেজ থেকে ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী মোট আবেদনকারী প্রার্থী দেখানো হয় ৮ জনকে। এই আটজনের মধ্যে পরীক্ষা শুরুর ঠিক পূর্ব মুহুর্তে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন গভর্নিং বডির সভাপতি ইঞ্জিয়ার আবু তালেব (টি এন্ড টি বোর্ডের ইঞ্জিয়ার) দুই জন বৈধ প্রার্থীকে বাদ দিয়ে ছয়জন প্রার্থীকে রাখেন। বাদ দেওয়া এই দুইজন প্রার্থীর মধ্যে একজন প্রার্থী মাউশির মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। তবে সে অভিযোগ আমলে নেয়নি মাউশি। এই ছয় জন প্রার্থীর মধ্যে দুই জন প্রার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকেন এবং ছয় জনের মধ্যে তিন জন প্রার্থীর বয়স ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকুরীর শর্তাবলী রেগুলেশন (সংশোধিত) ২০১৯ অনুযায়ী, “৫৫ বছর অতিক্রম করা কোন প্রার্থী স্থায়ী নিয়োগ লাভ করতে পারবে না” মর্মে উল্লেখ রয়েছে। নিয়োগ বোর্ডে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের প্রতিনিধি মনোনয়ন চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘অধ্যক্ষ পদে আবেদনকারী প্রার্থীদের মধ্যে যারা “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকুরীর শর্তাবলী রেগুলেশন (সংশোধিত) ২০১৯” মোতাবেক শর্ত পূরণ করেনি তাদেরকে প্রবেশপত্র প্রদান করা যাবে না।’ নিয়োগ পরীক্ষায় কলেজ কর্তৃপক্ষের করা ছয় জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে তালিকার এক নম্বরে থাকা আবদুল মালেক মিয়ার বয়স ৫৬ বছর নয় মাস ১১ দিন, দুই নম্বরে থাকা মো. মোনতাজ উদ্দিন এর বয়স ৫৭ বছর ৫ মাস ২৫ দিন, চার নম্বর তালিকায় থাকা প্রার্থী হারুন অর রশীদের বয়স ৫৬ বছর ১০ মাস ২২ দিন। দুই জন প্রার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকেন (যারা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরীক্ষায় কোরাম পূরণের জন্য আবেদন করে)। বাকি চার জন প্রার্থীর মধ্যে দুই জন প্রার্থীর বয়স ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সর্বশেষ ১০ জানুয়ারী ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দের পরিপত্র অনুযায়ী, “নিয়োগ পরীক্ষায় প্রত্যেক পদের বিপরীতে কমপক্ষে তিন জন বৈধ প্রার্থী থাকতে হবে। প্রার্থী তিন জনের কম হলে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ না করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।” কিন্তু টি এন্ড টি কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলে শীটের ছয় প্রার্থীর মধ্যে বৈধ প্রার্থী মাত্র দুই জন। নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ না দিয়ে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে মো. নুর হোসেনকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সর্বশেষ ১০ জানুয়ারী ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দের পরিপত্র অনুযায়ী, “অধ্যক্ষ পদে লিখিত পরীক্ষার ৪০ শতাংশ নম্বর পেলেই আবেদনকারী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে মর্মে বিবেচিত হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে।” কিন্তু টি এন্ড টি কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ শতাংশ নম্বরের কম পেয়ে অর্থ্যাৎ লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও প্রার্থী হারুন অর রশীদ তাকে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখানো হয়েছে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেও ফলাফল শীটে দুই প্রার্থীর নম্বর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও ঢাকা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মাঈন উদ্দিন আবেদন করলেও তার আবেদন গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে এবং ৬ জানুয়ারী ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে দুই বার অত্র কলেজে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কোনো যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। যেখানে বর্তমান নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ নূর হোসেন দুই বার পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। আগের দুইবারই তিনি অযোগ্য হলেও এবার সকল নিয়ম নীতি ও পরিপত্রকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে তাকেই যোগ্য দেখিয়ে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ গভর্নিং বডির সভাপতি কর্তৃক অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ আয়োজন করা হয়েছে। জানা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কোন বেসরকারি কলেজ যদি কোন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত হয় সেক্ষেত্রে গভর্নিং বডির সভাপতি পদে ঐ সংস্থা কর্তৃক লিখিতসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়ার শর্ত উল্লেখ রয়েছে। টি এন্ড টি কলেজ বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) কর্তৃক পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিটিসিএল এর এডিশনাল ডাইরেক্টর জেনারেল হিসেবে সভাপতি আবু তালেব ২০১৬ সালে কলেজটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এবং ২০২০ সালে পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে অবসরে চলে যান তিনি। নিয়ম অনুযায়ী অবসরে গেলে এই পদে থাকার কোন বৈধতা না থাকলেও তথ্য গোপন করে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই কমিটির মেয়াদ ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে শেষ হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত না করে ৩০ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি কর্তৃক ২২ মার্চ ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ পরিপত্র/প্রজ্ঞাপন মোতাবেক বেসরকারি কলেজে এনটিআরসিএর প্রবেশ পর্যায়ের পদ বাদে নিয়োগে বৈধ কমিটি অবশ্যই থাকতে হবে। শুধু তাই নয় গভর্নিং বডির সভাপতি আবু তালে পতিত হাসিনা সরকারকে রক্ষা করার জন্য হাসিনা সরকারের পলায়নের ঠিক দুই দিন আগে ৩ আগস্ট ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দে পেশাজীবীদের গণভবনের বৈঠকে প্রথম সারির চেয়ারে বসে ছিলেন। বর্তমানে পলাতক থাকলেও তাঁর কর্তৃক নিয়োগের বৈধতা দিয়ে তাকে এমপিওভুক্ত করেছেন মাউশির আওয়ামী ফ্যাসিবাদী একটি চক্র।
নিয়োগ জালিয়াতির এই মহা অনিয়ম নিয়ে টি এন্ড টি কলেজের ৯ জন শিক্ষক মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে মাউশি মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. হুমায়ুন কবিরকে তদন্তকারী কর্মকর্তা মনোনীত করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দে সরেজমিনে তদন্তে যান এবং তদন্ত করেন। তদন্তে তিনি উল্টো অভিযোগকারীদেরকেই জেরা করে অধ্যক্ষ নূর হোসেনের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন এবং এই প্রতিবেদনের আলোকে গত ৬ নভেম্বর ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দে মাউশি নুর হোসেনের এমপিওভুক্তিতে মাউশির ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মনোয়ার হোসেনকে নির্দেশ প্রদান করেন। মাউশির ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে গত ১৪ ডিসেম্বর তার এমপিওভুক্ত করে চূড়ান্তকরণের জন্য মাউশিতে প্রেরণ করে। মাউশি অধ্যক্ষ নূর হোসেনের এমপিও চূড়ান্ত করে। তবে তদন্তে অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে মর্মে পুনঃতদন্তের আবেদন করলেও তা আর কর্ণপাত করেনি মাউশি।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৬/১২/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
