সিলেট: ‘আমরার বাড়ি ও এলাকার সব ঘরো পানি ঢুকি গেছে, ইতা নৌকা দিয়া উদ্ধার করা যার না, স্পিডবুট লাইগব। উত্তর লক্ষ্মীপ্রসাদ, দক্ষিণ লক্ষ্মীপ্রসাদ, আমবাড়ি ও কুওরঘড়ির অবস্থা ভয়াবহ। মানুষ উদ্ধার অওয়ার লাগি লাইন বান্দি দাঁড়াইয়া আছে। সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য আকুল আবেদন করছি।’ এভাবে বাঁচার আকুতি করে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট দেন কানাইঘাট উপজেলার দক্ষিণ লক্ষ্মীপ্রসাদ গ্রামের ডালিম আহমদ নামে এক যুবক।
এর আগে বুধবার রাত ১১টা ৯ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ফেরিঘাট এলাকার সাজিদুর রহমান সাজন নামে আরেক যুবক। তিনি বন্যার পানিতে আটকা পড়ে লিখেন ‘লাশ উদ্ধার অইমু হয়তো, জীবিত উদ্ধার অইতে পারতাম না, হয়তো এইটা শেষ পোস্ট।’
এর আগে রাত ১০টার দিকে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি পোস্টে লিখেন, ‘আমি দৌলা চেয়ারম্যান অর ভাতিজা দিলু মিয়ার পোয়া, বাড়ি ফেরিঘাট, আমরারে কেউ বাঁচাও, আমরার মরণ সামনে, কেউ বাঁচাও আমরারে, মা ভাই লইয়া আটকি গেছি।’
এদিকে উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী চেয়ে কানাইঘাট উপজেলার ২নং লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হাফিজ জামাল উদ্দিন গতকাল সকাল ৮টায় তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে লেখেন- ‘উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী ব্যবহার না হলে শেষ পরিস্থিতি কী হবে বলা যাচ্ছে না’।
এ ছাড়া জৈন্তাপুরের ময়নাহাটি খেয়াঘাট এলাকার আহমেদ নাইম রাত সাড়ে দশটায় ফেসবুকে পোস্ট দেন ‘একটা ইঞ্জিন নৌকার দরকার, কেউ বাঁচাও আমরারে’।
জামাল চেয়ারম্যান, ডালিম, সাজিদুর ও নাইমের মতো অনেকেই উদ্ধার হওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি জানিয়েছেন।
ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সিলেটের পাঁচ উপজেলা গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ। মঙ্গলবার বিকাল থেকে এসব উপজেলায় হু হু করে বাড়তে শুরু করে পানি। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখো মানুষ। অনেকের ঘরে গলা পর্যন্ত ঢুকে পড়ে পানি। অনেকের ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। ভেসে গেছে গবাদিপশু ও পুকুর-খামারের মাছ। এ অবস্থায় দিশেহারা ও আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। পাঠানো হয়েছে ত্রাণসামগ্রী।
কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউপি, ২নং লক্ষ্মীপ্রসাদ পশ্চিম ইউপি, ৪নং সাতবাঁক ইউপি, কানাইঘাট সদর ইউপি, কানাইঘাট পৌরসভা, ৫নং চতুল ইউপি, গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তুমপুর ইউনিয়ন, লেঙ্গুড়া, ডৌবাড়ি, নন্দীরগাঁও, পূর্ব ও পশ্চিম আলীরগাঁও, পশ্চিম জাফলং, মধ্য জাফলং, জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট লামাপড়া, বন্দরহাটি, ময়নাহাটি, জাঙ্গালহাটি, বড়খেলা, মেঘলী, তিলকৈপাড়া, ফুলবাড়ী, নয়াবাড়ী, হর্নি, বাইরাখেল, গোয়াবাড়ী, ডিবির হাওর, ঘিলাতৈল, মুক্তাপুর, বিরাইমারা হাওর, খারুবিল, লমানীগ্রাম, কাটাখাল, বাউরভাগ, বাওন হাওরসহ জকিগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া এই পাঁচ উপজেলার প্রায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
কানাইঘাট উপজেলার মুলাগুলের সতিপুর গ্রামের আবুল কালাম বলেন, আগে কখনও এমন ভয়াবহ বন্যা দেখিনি। বন্যার পানি বৃদ্ধি ও ঢেউয়ের গর্জনে সারা রাত জেগে থাকতে হয়েছে। আমার ইউনিয়নে টিলা ও উঁচু স্থান ছাড়া প্রায় এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ এই পাঁচ উপজেলায় মোট ২১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে গোয়াইনঘাটে ৫৬, জৈন্তাপুরে ৪৮, কানাইঘাটে ১৮, কোম্পানীগঞ্জে ৩৫ ও জকিগঞ্জে ৫৮টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বুধবার বিকাল থেকে মানুষজন উঠতে শুরু করেছেন।
গতকাল সকালে জৈন্তাপুরের পানিবন্দি এলাকাগুলো পরিদর্শন করছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজা আক্তার সিমুল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে সালিক রুমাইয়া প্রমুখ। ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতের ফলে সিলেটে সুরমা, কুশিয়ারা ও সারি-গোয়াইন নদী তিনটি পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট কার্যালয়ের তথ্যমতে, গতকাল সকাল ৯টায় সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় সারি নদীর পানি এক দিনে ২০২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়াও সুরমা নদী কানাইঘাট উপজেলা পয়েন্টে ১৯৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৬৬ সেন্টিমিটার ওপর, কুশিয়ারা নদী জকিগঞ্জের অমলসীদ পয়েন্টে ২২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ২০২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গতকাল সকাল ৬-৯টায় ৩৪.০ মি.মি., ৯-১২টা ২ মি.মি. ও দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ০.২ মি.মি. বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মোহাম্মদ সজিব হোসেন বলেন, আগামী তিন দিন সিলেটে অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান জানান, সিলেটের পাঁচ উপজেলা বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ। আকস্মিক এ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক তদারকি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বানভাসি মানুষের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসন ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা করেছে। প্রতি উপজেলায় ১৫ মেট্রিক টন চাল, ২০০ বস্তা খাদ্যসামগ্রী ও নগদ ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের তদারকিতে এগুলো বণ্টন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্যার্তদের আরও সাহায্যের জন্য চাহিদাপত্র প্রস্তুত করে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বরাদ্দগুলো আসামাত্রই বানভাসির কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। বন্যাকবলিত প্রত্যেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রত্যেক উপজেলায় চার থেকে পাঁচ শতাধিক পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনে তাদেরও উদ্ধারকাজে লাগানো হবে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/৩১/০৫/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
