বাবা-মা হারা কোহিনুর পেল জিপিএ-৫, হতে চায় গরিবের ডাক্তার

ময়মনসিংহঃ এক যুগেরও বেশি সময় আগে স্ট্রোকজনিত কারণে মারা যান বাবা শাহাব উদ্দিন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন কাঠ কাটার শ্রমিক। তখন কোহিনুর আক্তারের বয়স চার বছর। কিছুদিন পর তার মা সাহেরা খাতুনেরও অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। তখন থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। বাবা-মা ছাড়া দারিদ্র্যপীড়িত সংসারে কখনো কখনো অনাহারেই স্কুলে যেতে হয়েছে তাকে। নানা প্রতিকূলতা এবং দারিদ্র্যতেও দমেনি সে। অভাব-অনটনের সংসারে একমাত্র ব্রত ছিল পড়াশোনা। পণ ছিল যে করেই হোক এসএসসিতে ভালো ফল করতে হবে। নিজের চেষ্টায় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কাছিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

তিন ভাই-বোনেরের মধ্যে কোহিনুর দ্বিতীয়। বড়বোন শাহিনুর আক্তার বিয়ের পর স্বামীর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। অভাবের সংসারে ছোট ভাই নূরে আলম কাজ নিয়েছে একটি মুদির দোকানের সহযোগী হিসেবে। যে কারণে পড়াশোনা করা হয়নি তার।

কোহিনুরের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের কাছিমপুর গ্রামে। তার ফলাফলে খুশি হয়েছে পরিবারসহ স্কুলের শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা। এ বিষয়ে অদম্য কোহিনুর আক্তার জানায়, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। মা থেকেও নেই। অভাবের সংসারে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আমার মনোযোগ ছিল একমাত্র পড়াশোনা। আমার পরিবারের দুরাবস্থা দেখে স্কুলের শিক্ষকরা আমার বেতন কম নিতেন। আমাকে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা বিনামূল্যে প্রাইভেটও পড়িয়েছেন এবং আমার প্রতিবেশী বাবুল দাদাও পড়াশোনাসহ সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। আমি তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। গরিবের যে কত কষ্ট তা আমি বুঝি, তাই আমি ডাক্তারি পড়াশোনা করে গরিবের ডাক্তার হতে চাই।

কোহিনুরের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষক এ টি এম কামরুল হাসান শামিম বলেন, ছোটবেলা থেকেই কোহিনুর মেধাবী। আমি যখন কাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলাম তখন থেকেই তাকে খাতা-কলম, জামাকাপড় ও পড়াশোনা ব্যাপারে সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেছি। সে নিজে থেকে কখনও কিছু চায়নি, আমি তার মেধা, চেষ্টা ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তার প্রতি খেয়াল রেখেছি।

প্রতিবেশী দাদা গোলাম সারোয়ার বাবুল বলেন, ছোট থেকেই মেয়েটা এতিম। কিন্তু সে মেধাবী ছাত্রী। বিষয়টি জানতে পেরে আমাদের এলাকার বউ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম কিছু সহযোগিতা পাঠাতেন। আমি তা পৌঁছে দিতাম এবং মেয়েটির সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে খেয়াল রাখি।

কাছিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরনবী মোস্তাকিম বলেন, কোহিনুর অনেক মেধাবী ছাত্রী। তার কেউ নেই, বাড়ির রান্না-বান্না শেষ করে সে স্কুলে আসত। আমরা তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে বেতন নিইনি। সে আমার স্কুলের বিজ্ঞান শাখা জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। আমি তার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, মেধাবী কোহিনুর আক্তার উপজেলার ভেতর কোনো কলেজে ভর্তি হলে তার উপবৃত্তিসহ বিধি মোতাবেক তার পড়াশোনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম বলেন, খবরটি শুনে আমি খুশি হয়েছি। কোহিনুরের স্বপ্নের কথা জানতে পেরে তিনি বলেন, অগ্রিম তো কিছু বলা যাবে না। সে যদি পড়াশোনা কন্ট্রিনিউ করে হয়তো আমরা তাকে হেল্প করব।

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১৩/০৫/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.