সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: শিক্ষিত মানুষ কি বেশি গোঁড়া বা মৌলবাদী? এরকম একটা প্রশ্ন অনেকদিন থেকেই উঠছে। পাঠ্যবই ছিঁড়ে আলোচনায় আসা খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাব, কিন্তু শিক্ষিত, কাগজে কলমে শিক্ষিত। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বড় ডিগ্রি নিয়েছেন বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু তার মনোজগৎ কতোটা উদার হয়েছে উদার সমাজে থেকে? বরং তার আচরণে উগ্রবাদিতা স্পষ্ট। শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট থেকে আসে না, আসে উদার মূল্যবোধ থেকে সেটি আরেকবার প্রমাণ হলো এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে। তিনি উদার বা মানবিক দেশে শিক্ষা লাভ করেছেন কিন্তু নিজে উদার হতে পারেননি। যদি হতে পারতেন তাহলে ট্রান্সজেন্ডার মানুষের প্রতি এরকম একটি ঘৃণা দেখাতে পারতেন না। গ্লাসকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয় সমকামীদের অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। আর সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে তিনি এমন আচরণ করলো? তার ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে অনেকেই নানা ধরনের ছবি দিচ্ছেন। তিনি মদ্যপান করেন, মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে খোলামেলা ছবি দেন, পার্টি করেন আমি এগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাই না।
এগুলো উনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তিনি যখন আবার নিজের মতের মিল না থাকার জন্য বই ছিড়ে ফেলার মতো উগ্রতা দেখান এবং অন্যদের ছিড়তে উদ্বুদ্ধ করেন তখন সেটি আর ব্যক্তিগত থাকে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে গোঁড়ামি এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাব কমই থাকে। বরং দেখা যায় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি থাকে বেশি। এ কারণে একটা আতঙ্ক ধীরে ধীরে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে। শিক্ষিত সমাজের একটা অংশ আমরা দেখতে পাচ্ছি যুক্তিকে হারিয়ে বিকৃত আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়ে সহিংসতা ও উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে। গোঁড়ামি আর অশিক্ষা আমাদের সমাজে অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। শিক্ষিত গোঁড়া’রা সমাজ এবং সংস্কৃতিকে ধর্মীয় মোড়কে সবসময় ব্যাখ্যা করতে চায়। তার ফলে সমস্যার গতিপ্রকৃতি সবসময় হয়ে উঠে একমুখী। বিস্তার লাভ করে মতের ভিন্নতা থেকে সরে আসা, জন্ম নেয় বিদ্বেষ। আমাদের দাবি হলো বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক দেশ। অথচ মানসিকতার বিচারে বলতে গেলে একটা বিরাট প্রজন্ম এখনো অন্ধকার বিলাসী।
মানবধর্মের মূল কথা হলো ভালোবাসা। তাকে বাদ দিয়ে সত্যতা বাঁচে না। আমাদের এমন শিক্ষিত সমাজ সভ্যতা পরিপন্থী। আমরা জানি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বা সামাজিক অগ্রগতি আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে কি মন-মানসিকতার উন্নয়ন হচ্ছে? আমার মনে হয় তা ঘটছে না। এক শ্রেণির শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যেভাবে সংখ্যালঘু বিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করে, নারী প্রগতি মনোভাব লালন করে, যেভাবে হিজরা বা ট্রন্সজেন্ডারদের প্রতি উগ্রতা দেখায় তাতে আসলে সব ভালো ভাবনা মুখ থুবরে পরে। সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোতে বহু শিশু বলাৎকারের শিকার হয়। শিশুরা তাদের হুজুরদের দ্বারাই এই বলাৎকারের শিকার হয়। ইসলামী বিধানে এটি কবিরা গুণা। কিন্তু এরকম ধর্মীয় ব্যক্তি যারা ধর্ম নিয়ে কথা বলেন তারা এটিকে নিন্দা করতে দেখেছেন কোথাও, প্রতিবাদ করছে সংগঠিত ভাবে, সামান্য ঘটনায় যেভাবে তারা সংগঠিত হয়ে পরে?
যেই হুজুররা এসব কাজ করেন তারাও কিন্তু সমাজকে নানাভাবে নসিহত করেন। অথচ নিজেরা নিভৃত হননি এই পাপ কাজ থেকে। এরা আবার পাঠ্যবইয়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপন মেনে নিতে পারে না। একটা জিহাদি জোশে নেমে পড়ে রাস্তায়। এরজন্য কারা দায়ী সে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় রাজনীতি দায়ী। সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ভোটের রাজনীতির মোহে আজকে কার সঙ্গে আপোস করা হয়, কোনো শক্তিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়, সেটি বোধহয় বড় জিজ্ঞাসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক।
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার ফেসবুক পেইজের ভিডিও কনটেন্ট থেকে শ্রুতিলিখন
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/০১/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
