মো: দ্বীন ইসলাম হাওলাদার ।।
সারা বিশ্বজুড়ে হাসপাতাল একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান (সরকারি/বেসরকারি) আর ডাক্তার সেবক, এমনটিই প্রচলিত কথা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশের চালচিত্র অনেকটাই ভিন্ন। এখানকার পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ডাক্তার ও ঔষধ কোম্পানিগুলোর হাতে জিম্মি। তবে সেবাদানকারী ডাক্তার যে নাই, তা নয়।
কিন্তু তাদের সংখ্যা অতি নগন্য, রোগীরা যখন ডাক্তারের কাছে যান, তারা ডাক্তারদের সনদ দেখেন না। তাই আমাদের দেশে ভূয়া ডাক্তারের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকার জনগনের চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখেন ও ব্যয় করেন। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ ডাক্তারের জন্য সরকারি হাসপাতাল অবকাশ কেন্দ্র ও রোগী সংগ্রহের কেন্দ্র। ডাক্তারেরা প্রত্যেকেই কোন না কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল/ক্লিনিক/প্যাথলোজিতে কাজ করেন, অথবা নিজের ব্যক্তিগত চেম্বার থাকে।
সুযোগ বুঝে অধিকাংশ রোগিদেরকে মৌখিকভাবে বলেদেন বা চিরকুট ধরিয়ে দেন তার চেম্বার/প্রাইভেট হাসপাতালে যোগাযোগ করার জন্য। অনেকে আবার সরকারি হাসপাতালে বসেই ফি আদায় করেন স্পেশাল দেখার কথা বলে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো অধিকাংশ ডাক্তারই তাদের চুক্তি করা ডায়াগনিষ্টিক সেন্টিারে রোগীদের বিভিন্ন টেষ্টগুলো করাতে বলেন এবং টেষ্টের প্রায় ৬০%-৭০% শতাংশ অর্থ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার নিয়ে নেন। অনেকে আবার অর্থের লোভে বিনা প্রয়োজনেও অনেকগুলো টেষ্ট দিয়ে থাকেন।
তারা অনেকেই সরকারি হাসপাতালের টেষ্ট ভালো হয়না বলে, রোগীদেরকে, ডাক্তারদের চুক্তিকরা সেন্টারে যেতে বলেন। অনেকে আবার রোগীদের সাথে চুক্তিকরে প্রাইভেট ক্লিনিকে/হাসপাতালে অপারেশন করেন। অথচ, তারা কর্মরত সরকারি হাসপাতাল থেকে সকল ঔষধ নিয়ে অপারেশন সম্পন্ন করেন। বর্তমান ডাক্তারদের কর্মকান্ড ও হীন মানসিকতা উপলব্দি করেই প্রখ্যাত ডাক্তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত এরকম মন্তব্য করেন “ডাক্তাররা প্যাথলজির থেকে উৎকোচ/ টেষ্ট প্রতি অর্থ গ্রহণ না করলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমপক্ষে ৪৫% কমে যেতো।
এছাড়াও ডাক্তাররা নগদ অর্থ ও উপঢৌকনের বিনিময়ে নিম্নমানের কোম্পানির নিম্নমানের ঔষধ ব্যবস্থাপত্রে লেখেন। বিনিময়ে তারা পেনটি/ন্যাপকিন থেকে শুরু করে থ্রিপিচ, শাড়ি, ক্রোকারিজ সামগ্রী, ওভেন, টিভি, ফ্রিজ, ল্যাপটপ, সৌর বিদ্যুৎ, রাইচ কুকার, প্রেসার কুকার, প্রাইভেট কার, প্রসাধনী সামগ্রীসহ বাস্তব জীবনের সকল প্রয়োজনীয় সামগ্রী কোম্পানির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। এসকল নিম্নমানের ঔষধ সেবনে অনেক রোগী আরগ্যের পরিবর্তে আরো ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকেন। হাসপাতাল গুলোতে ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের ভীরে রোগীরা ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করতে পারছে না। পত্রিকায় দেখলাম যে ঔষধ তৈরীতে মাত্র ৩ টাকা খরচ হয় তা পরিবহন, প্রতিনিধিদের বেতন ও ডাক্তারদের উপঢৌকন ও কোম্পানির ব্যবসা সব মিলিয়ে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
স¤প্রতি দেখা যাচ্ছে ঔষধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা সরকারি হাসপাতাল, প্রাইভেট ক্লিনিক/হাসপাতাল, ডাক্তারদের প্রাইভেট ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে রাখে ও কোম্পানিতে জমা দেয়। উপঢৌকন ও উৎকোচ পাওয়া ডাক্তারবৃন্দ তাদের ব্যবস্থাপত্রে উৎকোচ ও উপঢৌকন প্রদানকারী কোম্পানির ঔষধ লেখেন কিনা তা মনিটরিং এর জন্যই এমনটি। ডাক্তাররা উৎকোচ গ্রহনের কারনে ঐসকল কোম্পানির নিম্ন মানের ঔষধ লিখতে বাধ্য।
ফলে ঐ সকল ঔষধ সেবনে রোগীরা আরোগ্যের চেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বেশি। আরো লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে বিনা প্রয়োজনে রোগীদেরকে আইসিইউতে রাখা হয় এমনকি মৃত ব্যক্তিকও আইসিইউতে রেখে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকেন। এমনকি বিনাপ্রয়োজনে অপারেশনের নামে পেট চিরে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। অনেক ঔষধ কোম্পানিগুলো বিএসটিআই এর পরীক্ষাগারে যে ঔষধ পরীক্ষার জন্য দেন তাতে সকল উপাদান সঠিকভাবে দিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে অনুমতির পরে যেনো তেনো করে ঔষধ তৈরি করেন ও বিক্রি করে থাকেন।
একই ঔষধ বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি করায় কোম্পানিগুলো নিম্ন মানের ঔষধ তৈরি করে ডাক্তারদেরকে উৎকোচের মাধ্যমে তাদের ঔষধ বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মতো কোম্পানিগুলোকে ঔষধ ভাগ করে দিলে তারা নিম্নমানের ঔষধ তৈরি থেকে বিরত থাকতো। একটি কোম্পানী যে ঔষধ তৈরী করবে তা অন্য কোন কোম্পানী তৈরী করতে পারবে না এবং ঔষধ চালানোর জন্য ডাক্তারদের কে এত উৎকোচ দিতে হত না। তখন রোগীরা স্বল্প ব্যায়ে চিকিৎসা পেতো। সরকার জনগনের চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে ডাক্তার ও কর্মচারীদের বেতন ও ঔষধের পেছনে। কিন্তু রোগীরা কি সেবা পাচ্ছে? অন্যদিকে ডাক্তাররা রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উন্নত দেশের মতো কষ্ট ফ্রি করলে চিকিৎসকরাও রাতারাতি কোটিপতি হতে পারতেন না। এত বেশি প্রাইভেট হাসপাতাল হতো না। রোগীদেরকেও এত ভোগান্তির পোহাতে হতো না।
প্রভাষক
দুমকি ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা
দুমকি, পটুয়াখালী।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
