এইমাত্র পাওয়া

অধ্যাপক এমএ জব্বার এবং বাংলাদেশ শিক্ষাক্রমের দ্বিতীয় আবর্তন (পর্যালোচনা)

ড. আবদুস সাত্তার মোল্লা।।

স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চারবার জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। বর্তমানে চলছে শিক্ষাক্রমের পঞ্চম আবর্তনের কাজ। প্রথমবার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয় ১৯৭৬-৭৮ সালে। পরে দেশের পূর্ণ শিক্ষাক্রম আরও দুবার (১৯৯১-৯৫ ও ২০১১-১২) পরিমার্জন করা হয়েছে।

মাঝখানে ২০০২-২০০৫ সালে একটি অসম্পূর্ণ (শুধু প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম পরিমার্জন কার্যকর হয়েছিল, মধ্য-মাধ্যমিক উপস্তরের অর্থাৎ নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়েছিল, বাস্তবায়িত হয়নি)।

প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের সর্বোচ্চ উপস্তর উচ্চমাধ্যমিকের জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন (প্রথমবার) ও পরিমার্জনে (পরের পূর্ণ দুবার) সম্পৃক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল জব্বার এদেশের শিক্ষাক্রমের গুরু হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

১৯৩১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। প্রায় ৮৫ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন শেষে ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি অধ্যাপক জব্বার পরলোকগমন করেন। আজ বাংলাদেশ শিক্ষাক্রমের এই গুরুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী।

গত বছর এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আবর্তনে অধ্যাপক এমএ জব্বারের নিজ হাতে তৈরি শিক্ষাক্রম নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা লিখেছিলাম (দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত, ১৫/০১/২০২৩)। দ্বিতীয় আবর্তনের প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে অধ্যাপক এমএ জব্বার সম্পৃক্ত ছিলেন না।

কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের তিন উপস্তরের জন্য দেশে এপর্যন্ত সবচেয়ে মোটা (নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম দলিলের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৬০৮, মধ্য-মাধ্যমিকের ৬২৭ এবং উচ্চমাধ্যমিকের ১১৯৬)শিক্ষাক্রম দলিল প্রণয়নে অধ্যাপক জব্বার সম্পাদনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।উক্ত কমিটির সদস্য-সচিব ছিলেন তখনকার সদস্য (শিক্ষাক্রম), অপর শিক্ষাক্রম বোদ্ধা অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় আবর্তনের শিক্ষাক্রম দলিল ও এর বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের দ্বিতীয় আবর্তনের শিক্ষাক্রম দলিল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য একেবারে পৃথকভাবে প্রস্তুত ও প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক স্তরের (১ম-৫ম শ্রেণি) শিক্ষাক্রম দলিল প্রস্তুত করা হয় প্রথম ১৯৮৮ সালে নতুন ধারায়; এর নাম যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম।

মাধ্যমিক স্তরের তিন উপস্তরের জন্য যথারীতি তিন খন্ডে তিনটি পৃথক দলিল প্রকাশিত হয়।প্রথম খণ্ড নিম্ন-মাধ্যমিক উপস্তর(ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণি), দ্বিতীয় খণ্ড (মধ্য)মাধ্যমিক উপস্তর (নবম-দশম শ্রেণি), তৃতীয় খন্ড উচ্চ-মাধ্যমিক উপস্তরের (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি)শিক্ষাক্রম দলিল।

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক আদলে সাজানো হয়নি; তবে প্রথম আবর্তনের শিক্ষাক্রম থেকে এর বৈশিষ্ট্যে বিস্তর পার্থক্য আসে। দেশে প্রথমবারের মতো উদ্দেশ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্টভাবে বললে ফলাফলভিত্তিক , আরো নির্দিষ্ট করে বললে শিক্ষার সূক্ষ উদ্দেশ্য-শিখনফলভিত্তিক ‘শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীন বিকাশ ও উন্নয়ন সাধনই শিক্ষার লক্ষ্য’ বলে শুরু করে শিক্ষার যেসব সার্বিক লক্ষ্য ও সাধারণ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় তার মধ্যে ছিলঃ

১। ব্যক্তি শিক্ষার্থীর সহজাত ক্ষমতা ও গুণাবলির বিকাশের মাধ্যমে তার দৈহিক, মানস্কি নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন।
২। শিক্ষার্থীকে তার নিজ মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং তার সৃজনশীলতাকে লালন করা।
৩। শিক্ষাকে জীবনমুখী ও র্কম্মমুখী করার মাধ্যমে শিক্ষর্থীর মনে শ্রমের প্রতি মর্যাদাবোধ সৃষ্টি করা।
৪। শিক্ষাকে প্রয়োগমুখী করে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ, সৃজনশীল ও উৎপাদনক্ষম জনশিক্তি তৈরি করা।
৫। মৌলিক চিন্তার স্বাধীন প্রকাশে শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করা এবং সমাজে মুক্তচিন্তা, জীবনমুখী, বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভংগির বিকাশ ঘটানো।

(ক) প্রাথমিক স্তরের (প্রথম-পঞ্চম শ্রেণি) শিক্ষাক্রম প্রাথমিক স্তরের (প্রথম-পঞ্চম শ্রেণি) শিক্ষাক্রম দলিল প্রস্তুত করা হয় প্রথম ১৯৮৮ সালে নতুন ধারায়; এর নাম যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম। ১৯৯১ সালে এর সামান্য পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। উভয় শিক্ষাক্রম দলিলকে ‘আবশ্যকীয় শিখনক্রম’ নামে অভিহিত করা হয়। এতে মাতৃভাষা বাংলা, গণিত, আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি, পরিবেশ পরিচিতি প্রাকৃতিক ও সামাজিক), ধর্ম, সংগীত, শারিরিক শিক্ষা এবং চারু ও কারু কলাকে পাঠ্য বিষয় করে মোট এই ৮ বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাক্রম বর্ণিত হয়।

এই দলিলের পটভূমিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮১ সাল থেকে আমাদের দেশে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এই কার্যক্রমের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়ঃ

১। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগমন উপযোগী অধিক সংখ্যক শিশুর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা;
২। ভর্তিকৃত শিশুর অধিকাংশকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ধরে রাখা;
৩। জীবনের চাহিদা অনুযায়ী শিশুকে সফল শিক্ষালাভে সহায়তা করা।
যোগ্যতাভিত্তিক এই শিক্ষাক্রমের আবশ্যকীয় শিখনক্রমে প্রাথমিক স্তরের পঞ্চম শ্রেণিশেষে মোট ৫৩টি ‘প্রান্তিক’ যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে সদস্য (শিক্ষাক্রম) ছিলেন একক এবং দায়িত্বরত ছিলেন অধ্যাপক আলী আজম। অধ্যাপক কফিলউদ্দিন আহমদ তখন ছিলেন বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ। তা সত্ত্বেও তিনি ‘যোগ্যতাভিত্তিক’ শিক্ষাক্রমের গুরু হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশ শিক্ষাক্রমের দ্বিতীয় গুরুর মর্যাদা প্রাপ্য হয়েছেন। তিনি ২০২১ সালের ২৪ এপ্রিল ৭৫ বছর বয়সে করোনায় মৃত্যুবরণ করেন।

(খ) মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম:
আগেই বলা হয়েছে মাধ্যমিক স্তরের তিন উপস্তরের জন্য যথারীতি তিন খন্ডে তিনটি পৃথক দলিল প্রকাশিত হয়।প্রথম খণ্ড নিম্নমাধ্যমিক উপস্তর(ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণি), দ্বিতীয় খণ্ড (মধ্য)মাধ্যমিক উপস্তর (নবম-দশম শ্রেণি), তৃতীয় খণ্ড-উচ্চমাধ্যমিক উপস্তরের (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি)শিক্ষাক্রম দলিল।

শিক্ষার জাতীয় এবং উপস্তর ও বিষয়ভিত্তিক সাধারণ উদ্দেশ্য বর্ণনার পর সুনির্দিষ্ট উপস্তর ও বিষয়ের শিক্ষাক্রম শিখনফলভিত্তিক উদ্দেশ্যের বর্ণনা দিয়ে শুরু করা হয়। মাধ্যমিক স্তরের জন্য বর্ণিত শিক্ষার সাধারণ উদ্দেশ্যগুলো প্রধানত ছিল নিম্নরূপ।

মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের তিন উপস্তরের জন্য প্রধান উদ্দেশ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়-এ স্তরের শিক্ষাক্রমকে ক্রমশ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, বিশেষ করে এই অঞ্চলের দেশসমুহের শিক্ষাব্যবস্থার সমমান সম্পন্ন করা এবং জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভংগি অর্জনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে এমনভাবে শিক্ষাক্রমকে পুনর্বিন্যস্ত করা যাতে শিক্ষার্থী আত্ম কর্মসংস্থান ও উপার্জনে সক্ষম হয়।

দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এসব উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে শিক্ষাকে সাধারণ, মাদ্রাসা এবং ভোকেশনাল এই তিনটি উপব্যবস্থায় বিন্যস্ত করে সে অনুসারে শিক্ষাক্রম ‘প্রণয়ন’ করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই শিক্ষাক্রম স্বাধীন দেশের প্রথম প্রণীত (১৯৭৬-’৭৮) শিক্ষাক্রমের পরিমার্জন হলেও এতে ‘প্রণয়ন’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয় সম্ভবত এই জন্য যে বিষয়বস্তুভিত্তিক শিক্ষাক্রম থেকে উদ্দেশ্যভিত্তিক শিক্ষাক্রমে উত্তরণ ঘটানো হয়।

বিষয়বস্তু/পাঠ্যবিষয়:
এসব উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য নিম্ন-মাধ্যমিক উপস্তরে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ধর্মশিক্ষা, সামাজিক বিজ্ঞান, সাধারণ (প্রকৃতি) বিজ্ঞান, কৃষিশিক্ষা/গার্হস্ত অর্থনীতি, চারু ও কারুকলা এবং শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-এই ৯টি বিষয় আবশ্যিক করা হয়। তাছাড়া উচ্চতর বাংলা, উচ্চতর ইংরেজি এবং আরবির মধ্য থেকে যেকোনো একটি বিষয় ঐচ্ছিক হিসাবে নির্ধারণ করা হয়।

মধ্য-মাধ্যমিক উপস্তরে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ধর্মশিক্ষা, সামাজিক বিজ্ঞান/সাধারণ (প্রকৃতি) বিজ্ঞান ও কৃষিশিক্ষা/গার্হস্ত অর্থনীতি-এই ৬টি বিষয়কে আবশ্যিক রেখে বিজ্ঞান শাখার জন্য সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ বিজ্ঞান আবশ্যিক করা হয়।

এই ৬টি বিষয় ছাড়া বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার প্রত্যেক্টির জন্য নির্ধারিত বিষয়গুচ্ছ থেকে ২টি করে বিষয় নৈর্বাচনিক বিষয় হিসাবে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়।

উচ্চ-মাধ্যমিক উপস্তরের জন্য শুধু বাংলা ও ইংরেজি আবশ্যিক রেখে মোট পাঁচটি শাখার প্রস্তাব রাখা হয়; এগুলো ছিল বিজ্ঞান, মানব্কি, ব্যবসায় শিক্ষা, কৃষিশিক্ষা এবং ইসলাম শিক্ষা।

স্তর ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্যগুলো অর্জন ও মূল্যায়নের সুবিধার জন্য আচরণিক আদলে শিখনফল হিসাবে কী করবে বা করতে পারবে আকারে লেখা হয়। যেমনঃ
(ক) নিম্ন-মাধ্যমিক (ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণি) বাংলা বিষয়ের শিক্ষাক্রমের একটি অধ্যায়ে উদ্দেশ্য হিসাবে লেখা হয়ঃ
১। সমস্যামূলক কোনো বিষয়ে দলগতভাবে আলোচনা করবে;

২। সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য নির্ণয় করতে পারবে;

৩। পাঠ করার পর পঠিত বিষয়ের সারমর্ম বলতে পারবে;

৪। বানানের নিয়মাবলি (ষত্ববিধি, ণত্ববিধি, সন্ধি ইত্যাদি) জেনে-বুঝে শুদ্ধভাবে লিখতে পারবে।

(খ) মধ্য-মাধ্যমিক (৯ম-১০ম শ্রেণি) সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষাক্রমের একটি অধ্যায়ে উদ্দেশ্য হিসাবে লেখা হয়ঃ
১। বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারবে;

২। শক্তির নিত্যতা ও রূপান্তরের বর্ণনা দিতে পারবে;

৩। তথ্য ও সংবাদ আদান-প্রদানের আধুনিক ব্যবস্থা সম্পর্কিত ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারবে;

৪। জ্বালানির সংকট মোকাবিলায় শক্তির বিকল্প উৎস (যেমন সৌর শক্তি) অনুসন্ধানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে অপচয় রোধে তৎপর হবে।

(গ) উচ্চ-মাধ্যমিক (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি) সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষাক্রমের একটি অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হিসাবে লেখা হয়ঃ
১। সমাজবিজ্ঞানের যে কোনো পাঁচটি আধুনিক সংজ্ঞা বর্ণনা করতে পারবে;

২। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের তুলনা করতে পারবে;

৩। উদাহরণ সহ সম্প্রদায় ও সংঘের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারবে; ৪। সমাজ জীবনের উপর বংশগতির প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারবে।
উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু বর্ণনার পর শিখন-শেখানো কার্যাবলি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে তখনই রচনামুলক প্রশ্ন, ছোট প্রশ্ন, এমনকি কোনো কনো বিষয়ে বহু নির্বাচনী প্রশ্নের জন্য শতকরা ১৫ নম্বর ধার্য করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর বিজ্ঞান বিষয়ে যথারীতি ২৫ শতকরা নম্বর ব্যবহারিকের জন্য নির্ধারিত ছিল।
পাঠ্যপুস্তক রচনা ও শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন:
শিক্ষাক্রম অনুসারে পাঠ্যপুস্তক রচনার জন্য রচয়িতাদের নির্দেশনা শিক্ষাক্রমেই উল্লেখ ছিল এবং পুস্তক রচয়িতাদের ওরিয়েন্টেশন বা প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা ছিল।

বাস্তবায়নের জন্য প্রধান দু’ধারার কাজ করা হয়।

১) বিষয়ভিত্তিক বিস্তৃত শিক্ষক নির্দেশিকা রচিত হয়;

২) স্তরভিত্তিক (ঈধংপধফব) পদ্ধতিতে শিক্ষাক্রম বিস্তরণ কর্মসূচি বেশ সময়মতো বাস্তবায়ন করা হয়।

সেবার শিক্ষাক্রম বিস্তরণের জন্য যথাসময়ে তিন স্তরের প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষকের মাধ্যমে সারাদেশে, বিশেষত মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম বিস্তরণের বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।

ঢাকার কেন্দ্রে মাস্টার প্রশিক্ষকদের দিয়ে কোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে মাস্টার প্রশিক্ষক ও এই কোর প্রশিক্ষিকদের দিয়ে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সারাদেশে মাঠ-প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ হয়। সবশেষে মাঠ প্রশিক্ষকগণ দেশের প্রায় সকল শিক্ষকের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

শিক্ষাক্রম দলিল রচনা ও সম্পাদনা করা হয় ১৯৯৫ সালে; ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়। আমি তখন চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রভাষক। কুমিল্লা কোর্টবাড়িতে উচ্চ মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান বিষয়ের কোর প্রশিক্ষকের প্রশিক্ষণ হয় ১৯৯৬ সালের জুন মাসে।

বর্তমানে আনাড়ি নেতৃত্বে পরিচালিত শিক্ষাক্রম পরিমার্জন প্রক্রিয়ায় অনেক অভিনব পদ্ধতির দাবি করা হয়। লক্ষণীয়ঃ প্রাথমিক শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক হয়ে যায় ১৯৯১ সালে এবং এটি বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯২ সালে। শিক্ষার্থীদের যে দলগত কাজে অভিনবত্ব দাবি করা হচ্ছে তা দেখা যায় ১৯৯৫ সালে নিম্ন-মাধ্যমিক উপস্তরেই ছিল; আর ২০১১-’১২ সালের শিক্ষাক্রমে অধিকাংশ বিষয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজের ব্যবস্থা রাখা হয়, বেশ কিছু বাস্তবায়িতও হয়।

পুর্বের শিক্ষাক্রম পরবর্তী আবর্তনের শিক্ষাক্রম উন্নয়নের মূলভিত্তি হওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় আবর্তনের দলিলগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা প্রয়াত শিক্ষাক্রম গুরুকে সত্যিকার শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে পারি।

লেখক-
ড. আবদুস সাত্তার মোল্লা: শিক্ষাক্রম গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.