এইমাত্র পাওয়া

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগে পিএসসি: বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির মতো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারী (কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) নিয়োগের জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে (পিএসসি) দায়িত্ব দিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মর্মে সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখন থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং অধিদফতর, সংস্থার ১৩ থেকে ২০তম (পূর্বের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ দেবে পিএসসি। এসব পদে নিয়োগ দিতে পিএসসির অধীন আলাদা অনুবিভাগ বা পদভিত্তিক ‘বিশেষ পুল’ গঠন করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পিএসসিকে চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে পিএসসি। অবশ্য এর আগে ২৪ অক্টোবর অর্থ বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়- সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং অধিদফতর বা সংস্থায় বেতন গ্রেড ১৩ থেকে ২০ পর্যন্ত পদে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের জন্য পাবলিক বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা অধীনস্থ দফতর, সংস্থায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা বা প্রস্তাব করা যাবে না। গত কয়েক বছর ধরে গ্রেড ১৩ থেকে ২০ পর্যন্ত পদে সরকারি কর্মচারীর পদ পূরণে নিয়োগ বাণিজ্য যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তা নিরসনে নিরপেক্ষ সংস্থা পিএসসির মাধ্যমে এসব পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এ জন্য যে বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা প্রয়োজন, তার সফল বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের গুরুত্ব অনুধাবন করে স্বাধীনতার পরপরই সরকার পিএসসি গঠনের উদ্যোগ নেয় এবং ১৯৭২ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির ৩৪নং আদেশবলে প্রাথমিক পর্যায়ে পিএসসি-১ ও পিএসসি-২ গঠন করা হয়।

ওই বছরের ৪ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হলে সংবিধানে পিএসসি সংক্রান্ত ধারাগুলো কার্যকর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির একটি নতুন আদেশবলে ১৯৭২ সালের মে মাস থেকে কমিশন দুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিতকরণ সম্পন্ন করা হয়। কমিশন-১ ও কমিশন-২-এর দায়িত্ব ছিল যথাক্রমে গেজেটেড পদে (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে) এবং নন-গেজেটেড পদে (তৃতীয় শ্রেণির পদে) নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাই ও সুপারিশ করা।

১৯৭৭ সালের নভেম্বরে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুটি কমিশনের স্থলে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এটির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন, যা পিএসসি নামে অধিক পরিচিত।

সংবিধান ও আইনের আলোকে বর্তমানে পিএসসি যেসব দায়িত্ব পালন করে সেসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ১. ক্যাডার সার্ভিসগুলোতে সরাসরি নিয়োগদানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং নিয়োগদানের জন্য প্রদান; ২. নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদগুলোতে নিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং/অথবা সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং নিয়োগদানের জন্য সুপারিশ প্রদান;

৩. দ্বিতীয় শ্রেণির পদ থেকে প্রথম শ্রেণির পদে পদোন্নতির কার্যক্রম গ্রহণ ও সুপারিশ প্রদান; ৪. নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিধি, নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নীতিমালা, সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যকার পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নিরূপণের ক্ষেত্রে পরামর্শ প্রদান; ৫. কর্মকর্তাদের বিভাগীয় ও পেশাগত বিভিন্ন পরীক্ষার নিয়মাবলি ও পাঠ্যসূচি পরীক্ষা ও অনুমোদন এবং সেসব পরীক্ষার আয়োজন;

৬. সরকারি কর্মচারীদের চাকরির শর্তাদি প্রভাবিত করে এমন সব বিষয়ে পরামর্শ দান; এবং ৭. প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন শৃঙ্খলা ও আপিল বিষয়ে পরামর্শ দান।

এখন নিবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় ১৩ থেকে ২০ গ্রেডভুক্ত (পূর্বের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ পিএসসির আওতাভুক্ত করা নিয়ে আলোচনা করা যাক। আগেই উল্লেখ করেছি, নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের গুরুত্ব অনুধাবন করে স্বাধীনতার পরপরই সরকার একাধিক পিএসসি গঠন করে। কমিশন-১ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে এবং কমিশন-২ তৃতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের সুপারিশ করত।

নিরপেক্ষ সংস্থা কর্তৃক পরীক্ষা গ্রহণ ও সুপারিশ প্রদানের ভিত্তিতেই যেন সরকারের সব শ্রেণির পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে সংবিধান প্রণয়ন পরিষদ (কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) সংবিধানে একাধিক পিএসসি প্রতিষ্ঠার বিধান (অনুচ্ছেদ ১৩৭) সন্নিবেশিত করে। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক দুটি কমিশনের স্থলে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদগুলোয় নিয়োগ পিএসসির আওতাবহির্ভূত করার সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল না, পরবর্তী ঘটনাবলি তা প্রমাণ করে। দুর্নীতিবিরোধী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে চলতি শতকের প্রথম দশকে পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ বর্তমানে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার শীর্ষস্থানে না থাকলেও এখনও দেশটি তালিকায় লজ্জাজনক অবস্থান রয়েছে।

এ জন্য অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি পদে নিয়োগ, বিশেষ করে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ বাণিজ্য অনেকটা দায়ী। এসব পদে নিয়োগ বাণিজ্যের খবর আমরা পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই দেখতে পাই। পিএসসির পরিবর্তে মন্ত্রণালয় ও অধস্তন দফতরগুলোর ওপর এসব পদে নিয়োগের দায়িত্ব ন্যস্ত হওয়ায় নিয়োগ বাণিজ্য ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ পিএসসির আওতাভুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে ইতিমধ্যে যেসব প্রশ্ন উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ বাণিজ্যের অবসান ঘটাতে বর্তমানে ওভারলোডেড পিএসসির ঘাড়ে আরও বোঝা চাপানো কতটা সঙ্গত হবে তা দেখা দরকার।

দুই. তৃতীয় শ্রেণির কোনো কোনো পদে গ্রেড নির্ধারণ এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত থাকায় এবং এ শ্রেণির পদের বিভিন্ন গ্রেডভুক্তদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এক না হওয়ায় একই পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দান সম্ভব হবে না। তিন. চতুর্থ শ্রেণির পদ করণিক ধরনের না হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম বা এসএসসি পাস হওয়ায় পিএসসি প্রার্থীদের কী পরীক্ষা নেবে?

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগে পরীক্ষা গ্রহণ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দানে সুপারিশ প্রদানে একটি বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা প্রয়োজন হবে। তবে কাজটি সাধ্যের বাইরে নয়। প্রথমে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলতে চাই তা হল, বর্তমান পিএসসির অধীন ‘অনুবিভাগ’ সৃষ্টি করে এটা করা ঠিক হবে না। এ জন্য আলাদা কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যাধিক্য।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে গত ২৪ নভেম্বর বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদসংখ্যা ১৭ লাখ ১০ হাজার ৭০৪। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার পদ রয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬৩ এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৫টি। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত পদ রয়েছে যথাক্রমে ১০ লাখ ৭৭৬ এবং ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬২০টি।

কাজেই বর্তমান পিএসসির অধীন একটি নতুন অনুবিভাগ খুলে এ বিপুল সংখ্যক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পরীক্ষা গ্রহণ ও নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তির নাম সুপারিশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই সংবিধানের আলোকে আরেকটি কমিশন গঠন করতে হবে।

দুই. নব্বইয়ের দশকে অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন ও প্রবিধি অনুবিভাগের প্রধানের (যুগ্ম সচিব) দায়িত্ব পালনকালের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, গ্রেড নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা শুধু তৃতীয় শ্রেণিতে নয়, গেজেটেড পদেও এ সমস্যা রয়েছে। তবে তৃতীয় শ্রেণির পদে এ সমস্যাটি একটু বেশি জটিল। এটা ঠিক যে, তৃতীয় শ্রেণির পদের বিভিন্ন গ্রেডভুক্তদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এক নয়। তবে এ শ্রেণির পদে সব গ্রেডের পরীক্ষা যে একই সঙ্গে নিতে হবে তা নয়। মোট কথা, এসব সমস্যার সমাধান সাধ্যের বাইরে নয়। তিন. বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে প্রবেশের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা এসএসসি পাস। যখন পঞ্চম শ্রেণি থেকে উত্তীর্ণের জন্য বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে, তখন চতুর্থ শ্রেণির পদের চাকরিতে অষ্টম শ্রেণি বা এসএসসি পাস প্রার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তবে পুরোপুরি শারীরিক শ্রমভিত্তিক চতুর্থ শ্রেণির কিছু কিছু পদ পিএসসির আওতাবহির্ভূত রাখতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঝাড়ুদার, সুইপার, কারপেন্টার, ওয়েল্ডারসহ আরও কিছু পদ। তৃতীয় শ্রেণিতেও এরূপ কিছু পদ পিএসসির আওতাবহির্ভূত রাখতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার যে দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিল, তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের উচিত হবে গৃহীত সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়া।

মনে রাখতে হবে, সব সিদ্ধান্তেরই ভালোমন্দ দু’দিক রয়েছে। যে সিদ্ধান্তে ভালোর পাল্লা মন্দের পাল্লার চেয়ে ভারি, সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। আলোচ্য বিষয়ে ভালোর পাল্লা মন্দের পাল্লার চেয়ে ভারি। এতে মন্ত্রণালয় ও অধস্তন দফতরগুলোর কাজ কিছুটা কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পদগুলো বিলোপ করা সম্ভব হবে।

লেখক: সাবেক সচিব, সূত্র: যুগান্তর


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.