ভরিয়ে রাখেন মা-বাবা। মমতার চাদরে ঢেকে লেখাপড়া শেখান; দেন ভালোমানুষ হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ। তবে সব শিশুর ভাগ্য এমন সুপ্রসন্ন হয় না। কারও কারও কপালে আদর তো দূরের কথা, দু’বেলা দু’মুঠো খাবারও জোটে না। ঘুমাতে হয় ফুটপাতে। অনেকেই মা-বাবার পরিচয়ও জানে না। পুতুল খেলার বয়সেই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধে নামতে হয় তাদের। এমন ভাগ্যবিড়ম্বিত পথশিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘পুতুল স্কুল’। রাজধানীর ধানমন্ডিতে তারা এই ছিন্নমুকুলদের পড়ালেখা শেখায়। প্রাথমিকের গণ্ডি পার করিয়ে মাধ্যমিকে ভর্তি ও শিক্ষার ব্যয়ও বহন করে তারা। ফলে লেখাপড়ায় মনোযোগী পথশিশুরা পাচ্ছে নিজের গন্তব্যে পৌঁছার সুবর্ণ সুযোগ।
পুতুল স্কুলের সহসভাপতি শবনম শাহজাহান সমকালকে বলেন, ‘ছোটবেলায় খেলার সময় আমরা নিষ্প্রাণ পুতুলকে মনের মতো সাজিয়ে অনেক যত্নে রেখে দিই। অথচ প্রাণ থাকা এই পুতুলগুলো (পথশিশু) মৌলিক অধিকারবঞ্চিত হয়ে অনাদরে-অবহেলায় বড় হচ্ছে। তাদের মানবিক গুণাবলি সমৃদ্ধ পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুতুল স্কুলের যাত্রা শুরু হয়।’
তিনি জানান, পথশিশুসহ নিম্ন-আয়ের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার বাস্তবায়নে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সামাজিক সংস্থা পুতুল। সমাজসেবী আনোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থার সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫০। তাদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া। পাশাপাশি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীও আছেন। ২০১৭ সালে চালু হয় এ সংস্থার সবচেয়ে সফল প্রকল্প- পুতুল স্কুল।
সংশ্নিষ্টরা জানান, ঢাকার ধানমণ্ডি, মিরপুর, উত্তরা, মতিঝিল ও গুলশানের পাঁচটি স্থানে পুতুল স্কুলের কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ধানমন্ডিতে। ধানমন্ডি লেকের পাশে একটি ঘরের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে পথশিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার কাজ চলছে। শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলে স্কুল। পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুলটি পরিচালনা করেন। মূলত প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় এখানে। পরে তাদের মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়াসহ শিক্ষার আনুষঙ্গিক খরচ বহন করা হয়। তাদের বই-খাতা, ব্যাগ, পোশাক, স্কুলের বেতন ও ভর্তি ফি দেয় পুতুল সামাজিক সংস্থা। পুতুল স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি প্রতিদিন শিশুদের খাবার সরবরাহ করা হয়। শুধু তাই নয়; এখানে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্মদিনও পালন করা হয়। ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সব বিভাগে এ স্কুল ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার অন্যান্য এলাকা বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলে একটি স্কুল চালু করতে চান উদ্যোক্তারা। সেই সঙ্গে সমাজের অবহেলিত শিশুদের সব মৌলিক চাহিদা পূরণ করা তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।
এদিকে জাতীয় দিবসগুলোয় পথশিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঈদের আগে শিশুদের দেওয়া হয় নতুন জামা, দুধ, সেমাই, চিনি ইত্যাদি। এ ছাড়া বন্যা বা তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মতো দুর্যোগপূর্ণ সময়ে দুস্থদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে এ সংস্থা।
পথশিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম ও খাবার সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে সংস্থার সদস্যরা প্রতি মাসে নির্ধারিত অঙ্কের চাঁদা দেন। এর মধ্যে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আনোয়ার হোসেনই দেন সবচেয়ে বড় অংশ। আগ্রহী কেউ পথশিশুদের পুনর্বাসনের এ উদ্যোগে যুক্ত হতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন সংগঠনের ফেসবুক পেজ-facebook.com/PutulOrg অথবা বাসা নম্বর-২, সড়ক নম্বর-৪, শেখেরটেক, আদাবর, ঢাকা- এই ঠিকানায়।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
