Dhaka: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছেলেদের জন্য নবনির্মিত শেখ রাসেল হল খুলে দেওয়ার ৯ মাসেও পড়ার চেয়ার-টেবিল ও আলমারি নিশ্চিত হয়নি। লোকবল সংকটে চালু হয়নি হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিন। ফলে শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী হলের আশপাশের দোকানগুলোতে যাচ্ছে খাবারের জন্য। কিন্তু সেখানে দ্রুত যাতায়াতের পথে দেয়াল তোলার কারণে অতিক্তি আধা কিলোমিটার এলাকা ঘুর যেতে হয়। হলের ভেতরে যখন-তখন লিফট বন্ধ হয়ে আটকা পড়ার পাশাপাশি বাইরে স্তূপ হয়ে থাকা বর্জ্যরে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হলের হাজারখানেক শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ছয়টি হলের মধ্যে দুটির নির্মাণকাজ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়। গত ২৩ জানুয়ারি মেয়েদের জন্য ফজিলাতুন্নেছা হল ও ছেলেদের জন্য শেখ রাসেল হলের চাবি তুলে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্টদের হাতে। পরে ২৯ জানুয়ারি শেখ রাসেল হল খুলে দেয় প্রশাসন। বলা হয়েছিল, নবনির্মিত আবাসিক হলগুলোতে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার সহায়ক পরিবেশ থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১০ তলা বিশিষ্ট নতুন হলগুলোর প্রতিটিতে ছয়টি করে লিফট (এলিভেটর), বিনোদনের জন্য তিনটি করে কমন রুম, সমৃদ্ধ পাঠাগার, ডাইনিং, ক্যান্টিন, শিক্ষার্থীদের নিজস্ব রান্নার জন্য প্রতি তলায় গ্যাসের চুলা, হল ছাত্র সংসদ, ব্যায়ামের জন্য জিমনেশিয়ামের ব্যবস্থা থাকবে।
তালিকা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি কক্ষে চৌকি, চেয়ার-টেবিল ও আলমারি, হলে মসজিদ, দোকান, সেলুন, লনড্রি, নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরাসহ ইন্টারনেটের ব্রডব্যান্ড সংযোগ সুবিধা থাকার কথা। এর মধ্যে অল্প কিছু পূরণ হলেও অপূর্ণ রয়ে গেছে অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেখ রাসেল হল চালু হওয়ার দেড়মাস পরেও ডাইনিং চালু করতে ব্যর্থ হয় হল প্রশাসন। পরে বিকল্প হিসেবে হলে ক্যান্টিন চালু করা হয়। কিন্তু পাঁচ মাস না যেতেই বন্ধ হয়ে যায় হলের ক্যান্টিন। ফলে শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল, সালাম-বরকত হল ও রফিক-জব্বার হল সংলগ্ন দোকানগুলোতে যেতে হয়।
এদিকে এই যাত্রায়ও ভোগান্তির শেষ নেই। ওইসব পয়েন্টে যাতায়াতের সহজ রাস্তায় দেয়াল তুলে দিয়েছে রফিক-জব্বার হলের ছাত্রলীগের একদল কর্মী। গত ২৮ জানুয়ারি প্রশাসনের আপত্তি থাকা সত্বেও দুই হলের মাঝখানের রাস্তায় দেয়াল তুলে দেয় তারা। এই ঘটনার আট মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলে শিক্ষার্থীদের রফিক-জব্বার হলের পেছনের কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়ে রাস্তাটি।
শেখ রাসেল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ওসমান বলেন, ‘আমাদের হলে ডাইনিং, ক্যান্টিন বন্ধ। খাবারের জন্য বটতলা, রফিক-জব্বার হলের দোকানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রতিদিন বিভিন্ন প্রয়োজনে ওই দিকে যেতে হয়। কিন্তু দেয়ালের কারণে আমাদের আধা কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে যেতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে ওই রাস্তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।’
ক্যান্টিন-ডাইনিং চালু করার বিষয়ে হল প্রভোস্ট মো. তাজউদ্দিন সিকদার বলেন, ‘লোকবলের অভাবে ডাইনিং চালু করতে না পেরে ক্যান্টিন চালু করেছিলাম। কিন্তু হলে লাইনের গ্যাস সংযোগ না থাকায় সিলিন্ডার গ্যাসে রান্না করতে হয়। এতে খরচ বেশি ও লাভ কম হওয়ায় মালিকপক্ষ ক্যান্টিন ছেড়ে দিয়েছে। আপাতত ডাইনিং চালু করার চিন্তা করছি। তবে গ্যাস সংযোগ না দিলে এর স্থায়ী সমাধান হবে না।’
দেয়ালের বিষয়ে হল প্রভোস্ট তাজউদ্দিন বলেন, ‘গত প্রভোস্ট কমিটির মিটিংয়ে দেয়ালের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দেয়াল ভাঙ্গার বিষয়ে প্রশাসন পজিটিভলি চিন্তা করছে। তবে কবে নাগাদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা জানি না।’
হলে গ্যাস সংযোগে দেওয়ার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস সংযোগের জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। কিন্তু সরকার বর্তমানে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে না। তবে প্রশাসন সরকারের উপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়তো একটি সমাধানে আসা যাবে।’
নবনির্মিত হলের শিক্ষার্থীদের আরেক আতঙ্কের নাম লিফটে আটকা পড়া। হলে ছয়টি লিফটের ব্যবস্থা করা হলেও চালু থাকে চারটি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উঠানামার সময় প্রায়ই এগুলো বন্ধ হয়ে যায়। লিফটে আটকা পড়া হলের নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লিফট বন্ধ হচ্ছে বলে দাবি করছেন প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘লিফটগুলোকে চব্বিশ ঘণ্টা চালানো সম্ভব না। সময় নির্ধারণ করে পালাক্রমে চালাতে হয়। যেহেতু এটি একটি মেশিন, তাই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতেই পারে। তাই সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য একজন অপারেটর নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।’
এ ছাড়া নতুন হলে শিক্ষার্থীদের ব্যায়ামের জন্য জিমনেশিয়ামের ব্যবস্থা ও ইনডোর স্পোর্টসের সরঞ্জামের কথা থাকলেও, তা রয়ে গেছে কাগজে-কলমে।
হলে চোয়ার-টেবিল ও ব্যামের সরঞ্জাম সম্পর্কে জানতে চাইলে হল প্রভোস্ট মো. তাজউদ্দিন সিকদার বলেন, ‘চেয়ার-টেবিলের ডিজাইন অনুমোদন করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে টেন্ডার দেওয়া হবে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে চেয়ার-টেবিল পৌঁছে দিতে পারব, আশা করছি। আর আমরা অর্থের অভাবে ক্রীড়াসামগ্রী কেনা ও জিমনেশিয়াম চালু করতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থের ব্যবস্থা করে দিলে আমরা দ্রুত তার ব্যবস্থা করব।’
তবে প্রকল্প পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের চেয়ার-টেবিলের পাশাপাশি আলমিরা দেওয়ার কথা থাকলেও অর্থ সংকটের কারণে, তা দেওয়া হচ্ছে না। টেবিলের সঙ্গে যে বুকশেলফ থাকবে, সেখানে ছোট একটি অংশ থাকবে জিনিসপত্র রাখার জন্য।’
এদিকে ‘অত্যাধুনিক’ এই হলে নেই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থপনার ব্যবস্থা। হলের পাশে রয়েছে বিশাল ময়লার ভাগাড়। ফলে দুর্গন্ধে হলের ওপর তলায় টিকে থাকা দায়। রফিক-জব্বার হলের রাস্তায় দেয়াল তোলার কারণে শিক্ষার্থীদের ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়েই চলাচল করতে হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে হল প্রভোস্ট তাজউদ্দিন সিকদার বলেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে জানি না। তোমার থেকে মাত্র শুনলাম। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিব। করিডরে যে পানি জমে, এটি আসলে নির্মাণ ত্রুটি ছিল। কন্সট্রাকশন ফার্ম এখন পানি জমে থাকার জায়গাগুলোয় তা মেরামত করছে।’
নবনির্মিত শেখ রাসেল হলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই সেন্ট্রাল কোনো ড্রেনেজ সিস্টেম নেই। আগে সেন্ট্রালি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রেনেজ সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তবে এখন যে বর্জ্যগুলো জমছে সেগুলো এখান থেকে নিয়ে অন্যত্র ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি হল প্রশাসনের দেখার বিষয়।’
শেখ রাসেল হলের সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নুরুল আলমের গত সোম ও মঙ্গলবার তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৮/১০/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
