এইমাত্র পাওয়া

চবি: সংঘাত-সংঘর্ষে লাগাম নেই, ৯ বছরে তিন কমিটি বিলুপ্ত

চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষ-উপপক্ষের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ কিছুতেই থামছে না। সংঘঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, সাংবাদিক নির্যাতনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তিনটি কমিটি বিলুপ্ত করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

ছাত্রত্ব না থাকাদের বিভিন্ন সময় কমিটির নেতৃত্বে আনার কারণেও সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলছেন সাবেক নেতারা।

তাঁরা বলেন, অভিযুক্তদের কমিটিতে স্থান দেওয়ায় ভাবমূর্তি সংকটেও পড়েছে ছাত্রলীগ। আগের তিন কমিটির একাধিক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অনেককে কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হলেও ক্যাম্পাসে বেপরোয়া নেতাকর্মীদের লাগাম টানতে পারেনি কেন্দ্রীয় কমিটি। বরং দিন দিন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

গত কয়েক দিনে অন্তত ১৫ বারসহ চলতি বছরে ৩৫ থেকে ৪০ বার ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে শাটল ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ভিসি বাংলো, যানবাহনসহ ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা দুটি মামলার ১৪ আসামির মধ্যে ১২ জনই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁদের নাম এজাহার থেকে বাদ দিতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টিরও অভিযোগ আছে। সর্বশেষ গত রবিবার ক্যাম্পাসে প্রথম আলোর প্রতিনিধি মোশারফ শাহর ওপর হামলা চালিয়েছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। এর আগে আরো একাধিক সংবাদকর্মীর ওপর হামলা ও হুমকি-ধমকি, ছাত্রীকে তুলে নিয়ে অশালীন ছবি তোলার ঘটনায় আলোচনায় আসে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর নাম।

গত কয়েক দিনে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়াসহ নিজেদের মধ্যে টানা চার দিন সংঘর্ষ, সাংবাদিককে মারধরসহ বিভিন্ন ঘটনার পর চবি শাখা ছাত্রলীগের ৪২৫ সদস্যের কমিটি গত রবিবার বিলুপ্ত ঘোষণা করে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি। গত বছরের ৩১ জুলাই রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি ও ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৪২৫ সদস্যের এই কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর আগে ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই রাতে রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি ও ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যের কমিটি দেওয়া হয়।

গত এক বছরে বিভিন্ন ঘটনায় ছাত্রলীগের মোট ১৯ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে গত ৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব রেসিডেন্স হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির ভার্চুয়াল সভায় বিভিন্ন অপরাধের দায়ে একসঙ্গে ১৭ ছাত্রলীগকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আবার গত ২২ জুন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয় আরো দুই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে। এ ছাড়া গত দেড় বছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার হয়েছেন দুই ছাত্রলীগকর্মী।

এই কমিটির আগে ২০১৫ সালের ২০ জুলাই আলমগীর টিপুকে সভাপতি এবং এইচ এম ফজলে রাব্বীকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রথমে কেন্দ্র থেকে দুই সদস্যের কমিটি দেওয়া হয়েছিল। এরপর নিজেদের অনুসারীদের মধ্যে বারবার সংঘর্ষের জেরে ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরে ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই আলমগীর টিপুকে সভাপতি এবং এইচ এম ফজলে রাব্বীকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৬১ সদস্যের কমিটি দেওয়া হয়েছিল। এরপর নিজেদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা আবার বেড়ে যাওয়ায় ২০১৭ সালের ৪ মে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করার পরও সংঘাত বন্ধ হয়নি। অবশেষে ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

সংগঠনের একাধিক সাবেক নেতা জানান, এর আগের কমিটি কেন্দ্র থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছিল ২০১৪ সালের মাঝামাঝি। ২০১১ সালের মাঝামাঝিতে কেন্দ্র থেকে অনুমোদন দেওয়া ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন মামুনুল হক ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এম এ খালেদ চৌধুরী। ২০১৩ সালে আগস্টের শেষ দিকে শিবির তোষণ, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজিসহ নানা অভিযোগ এনে চবি শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মামুনুল হককে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ও নিষিদ্ধ করেছিলেন তাঁরই অনুসারীরা। এ ছাড়া কিছুদিন পর পর সংঘর্ষসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগের এক পর্যায়ে ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে ওই কমিটি বিলুপ্ত করেছিল কেন্দ্র। এর পরবর্তী কমিটির সাবেক সভাপতি আলমগীর টিপু ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ এরফান চৌধুরী এবং নগরের সিআরবি এলাকায় এক শিশুসহ দুজন হত্যার ঘটনায় আসামি ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ হয়েছিল।

গত রবিবার বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও বিভিন্ন সময় কেন্দ্র থেকে শোকজ করা হয়েছিল। চবি ছাত্রলীগের ইতিহাসে বিলুপ্ত হওয়া সর্বশেষ ৪২৫ সদস্যের কমিটি ছিল সবচেয়ে বড়। বিশৃঙ্খার কারণে ৪২৫ সদস্যের এই কমিটি ১৪ মাসে একটি সভাও করতে পারেননি।

জানতে চাইলে বিশ্বদ্যািলয় ছাত্রলীগের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘নিষিদ্ধ করা হলেও বগিভিত্তিক (শাটল ট্রেন) ১৫টি পক্ষ-উপপক্ষ (সংগঠন) সক্রিয়। এর মধ্যে আমার দুটি এবং সাধারণ সম্পাদকের একটি বগিভিত্তিক সংগঠন আছে। অন্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ছিল না। এসব বগি গ্রুপ আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছে। তারা চেয়েছিল ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সক্রিয় না হোক। আগামী কমিটিতে যাঁরাই নেতৃত্বে আসুন না কেন সবাই এই সমস্যার মুখোমুখি হবেন।’

বিলুপ্ত হওয়া আগের কমিটির সাবেক সভাপতি আলমগীর টিপু বলেন, ‘সর্বশেষ তিনটি কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। এর মধ্যে আমাদের সময়ে বিবিএ অনুষদ কমিটি করেছি। এরপর কেন্দ্রের নির্দেশনা থাকায় হল ও ফ্যাকাল্টি কমিটিগুলো করতে পারিনি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটি না হওয়ায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। কেউ কাউকে মানছে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘প্রকৃত ছাত্রদের দিয়ে কমিটি করা হলে সংগঠনও শক্তিশালী হবে এবং ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হবে না। অছাত্রদের নেতৃত্বে আনা, হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের এনে সংগঠন ভারী করলে চেইন অব কমান্ড থাকবে না। ২০০২ সালে দল ও সংগঠনের কঠিন দুঃসময়ের মধ্যেও ক্যাম্পাসে সম্মেলন হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর সম্মেলন না হওয়াটা আমাদের জন্য দুঃখজনক।’

তবে নিজেদের মধ্যে সংঘাত লেগে থাকাসহ বিভিন্ন অপকর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নেতারা মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তিন ঘটনা তদন্তে কমিটি

গত রবিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোশাররফ শাহর ওপর হামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া সমাজতত্ত্ব বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান তুষারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছাদিকুর রহমান সাগরকে আহত করার ঘটনা তদন্ত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য উপাচার্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এম নুর আহমদ স্বাক্ষরিত এই কমিটি গঠন করা হয়।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৬/০৯/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.