অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: জীবনের প্রথম একটা ঠাস্কি খেয়েছিলোাম যেদিন ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরের Ronchi এয়ারপোর্টে নেমে বাসে করে প্রফেসর সালামের ইনস্টিটিউটে যাচ্ছিলাম। দেখি কী- বাস ড্রাইভার একদম সুন্দর। পরিপাটি ড্রেস, টাই পড়া, সুদর্শন একজন ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের ড্রাইভারদের চেহারা ভেসে উঠেছিলো। কী পার্থক্য। তারপর যখন ওই শহরে থাকতে থাকলাম দেখলাম এই বাস ড্রাইভাররা শুধু দেখতে সুন্দর, ভালো ড্রেস পড়া এমন নয়। তারা মানবিকও। বৃদ্ধ কেউ বাসে উঠতে চাইলে তাকে সাহায্য করা, কখনো কখনো সিট খালি না থাকলে এবং কেউ সিট অফার না করলে নিজে এসে সিট খালি করে বসিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
আসলে ঠাস্কি এরপর আরো খেয়েছি। ইনস্টিটিউটে যখন পড়ছিলোাম, মাঝে মাঝে ক্লাস শেষে বাসায় না গিয়ে লাইব্রেরিতে পড়তাম। সেইসময় প্রায়ই ইনস্টিটিউটের ক্যাফেতে কফি খেতে যেতাম। ৫টার পর ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বাসায় চলে যায়। এরপর আসে একদল ক্লিনার। তারা কাজ শুরুর আগে সবাই ক্যাফেতে একত্রিত হয়ে আড্ডা দেয়, কফি পান করে। এদের আড্ডায় প্রায়ই দেখতাম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর বা বড় কর্তারাও যোগ দিতো। কী আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সবাই আড্ডা দিতো। বোঝার উপায় নেই সেই আড্ডায় একজন বিখ্যাত গবেষক এবং প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যক্তি ক্লিনারদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। দেখতাম এই ক্লিনাররা কাজে আসতো গাড়ি চালিয়ে এবং কাজ শেষে আবার নিজের গাড়ি চালিয়েই যে যার বাসায় ফিরে যেতো। ইনস্টিটিউটের যে দারোয়ানরা ছিলো তাদেরও গাড়ি বাড়ি ছিলো।
আমি যখন ব্রুনেল পিএইচডি করি সেখানেও অনেক সময় আমি খুব ভোরে অফিসে চলে যেতাম। গিয়ে দেখতাম ৬০-৬৫ বছরের একজন মানুষ আমার অফিস রুমটি পরিষ্কার করতে আসছে। ধীরে ধীরে ওর সঙ্গে সখ্যতা হয়ে যায়। প্রায়ই সে ক্যা ফেলে অথবা কাজের শেষে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে আসতো। দেখতাম এই মানুষটার সঙ্গে সমাজের যেকোনো বিষয় নিয়ে গল্প করা যায়। একদিন সে বলছে ‘কামরুল জানো আমার না ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে হাসতে খেলতে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। তাই আমি যখনই সময় পাই আমার নাতি-নাতনির সঙ্গে খেলি। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময়, খেলার সময় আমাকে অভিনয় করতে হয় না। আমি আমি হয়ে ওদের সঙ্গে খেলতে পারি। দিবসের কেবল ওই সময়টুকুই আমি আমার মতো থাকতে পারি। ছোটরা আমার প্রতিটি কথার কারণ, উৎস, কেন ইত্যাদি খোঁজে না। এরা জাজমেন্টাল হয় না।’
এমনি আমি যেই নাপিতের কাছে চুল কাটতাম তার সঙ্গেও শিক্ষিত মানুষের মতো করে গল্প করা যেতো। ড্রাইভাররা এতো সুন্দর চেহারার, সুন্দর ড্রেস পড়া, সুন্দর মন হওয়ার কারণ কী? ক্লিনারদের সঙ্গেও ইন্টেলেকচুয়াল বা হালকা খোশগল্প করা যায় বলেই বিখ্যাত গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তাও তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে চলে আসেন এবং চুটিয়ে আড্ডা দেন। হয়তো তিনি মনে করেন ক্লিনারদের ওই আড্ডার সময়টাই তার জন্য দিবসের সেরা সময়। সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে অনেক মেপে, অনেক ভেবে কথা বলতে হয়। কিন্তু শিশু কিংবা ওই ক্লিনারদের সঙ্গে আড্ডাটাই হলো আসল আড্ডা। টাইটানিক ছবিতেও দেখি তৃতীয় শ্রেণীর ডকের পার্টিই আসল আনন্দ। উচ্চ শ্রেণীর পার্টিতে থাকে অভিনয়।
সবকিছুর শেষ কথা হলো বেতন বৈষম্য। আমাদের অফিসগুলোর বড় কর্তার সঙ্গে অফিসের দারোয়ানের বেতন এবং নানা সুবিধার পার্থক্য মনে হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। অফিসের বড় কর্তা যেই পাজেরো গাড়িতে চড়ে সেই গাড়ির পেছনে যতো টাকা তেল কিনতে ব্যয় করে সেই পরিমাণ টাকা অফিসের দারোয়ান বেতনও পায় না। তার উপর ড্রাইভারের খরচ, মেইনটেনেন্স খরচ ইত্যাদিতো আছেই। বৈষম্য আমাদের সমাজের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে। প্রতিটি ফ্ল্যাট বাড়ির বাসায় আছে সারভেন্টস টয়লেট। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে আছে শিক্ষকদের জন্য আলাদা টয়লেট, কর্মচারীদের জন্য আলাদা টয়লেট, ছাত্রদের জন্য আলাদা টয়লেট। শিক্ষায় বৈষম্য আছে। হতদরিদ্রদের জন্য আছে কওমি মাদ্রাসা, গরিবদের জন্য মাদ্রাসা বা বাংলা মিডিয়াম, মধ্যবিত্তের জন্য আছে বাংলা মিডিয়াম বা ভার্সন, উচ্চবিত্তের জন্য আছে ইংরেজি মাধ্যম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিব বাড়িতে সম্প্রতি দুটো টাওয়ার ভবন তৈরি হয়েছে। আর ফুলার রোডে শিক্ষকদের জন্য টাওয়ার ভবন তৈরি হয়েছে। শিব বাড়ির ১টি টাওয়ার (বঙ্গবন্ধু টাওয়ার) হলো কর্মচারীদের জন্য, অন্যটি শেখ রাসেল টাওয়ার। সেটি হলো কর্মকর্তাদের জন্য। আর ফুলার রোডের ভবনগুলো টিপিক্যাললি শিক্ষকদের জন্য। তিনটি ভবন দেখলেই বোঝা যায় কোনটি কর্মচারীদের জন্য, কোনটি কর্মকর্তাদের জন্য আর কোনটি শিক্ষকদের জন্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কীভাবে ইচ্ছে করে অসুন্দর ভবন বানায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এতো নগ্ন বৈষম্য কল্পনাতীত। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া উচিত বৈষম্যহীনতার চর্চা। আমরা আমাদের ছাত্রদের তাহলে কী শেখাচ্ছি?
সবকিছুর মূলে বেতন বৈষম্য। এই বেতন বৈষম্য যতোদিন না দূর হবে এই দেশ ততদিন সুখী সুন্দর দেশ হবে না। কারণ এই বিশাল জনগুষ্টিকে বেতনে মেরে অসুখী রেখে আপনি যতো বেতন বেশিই পান আপনি সুখী হবেন না। একটি সমাজের অধিকাংশের আয় খুব খুব কম হলে এই অধিকাংশ অসুখী মানুষের মেলে আপনি কীভাবে সুখে থাকবেন। সম্ভব না বলেই এই দেশে কোনো ধনী মানুষ থাকতে চায় না। টাকা হলে পরেই বিদেশে বাড়ি করে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে একদিন চম্পট।
লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০৯/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
