প্রাথমিকে বড় সমস্যা ঝরে পড়া শিক্ষার্থী

মঞ্জুর মোর্শেদ রুমনঃ বলা হয়ে থাকে, যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। আর এই শিক্ষার মূল ভিত্তি ধরা হয়ে থাকে প্রাথমিক শিক্ষাকে। প্রাথমিক শিক্ষার ওপরই নির্ভর করে পরবর্তী স্তরের শিক্ষা।

কাজেই প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি করা না গেলে মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষার জন্য যত চেষ্টাই করা হোক, তা তেমন ফলপ্রসূ হবে না। উন্নত দেশগুলোয় প্রাথমিক শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর হলো পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। নব্বই দশকের শুরুর দিক থেকে দেশে শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়। পাশাপাশি নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হয়। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার জন্য রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন স্কুল, ইবতেদায়ি মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ বাংলাদেশে আগের চেয়ে বর্তমানে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার কম হলেও তা এখনও আশঙ্কাজনক।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৯টি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে; যার মধ্যে শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ই আছে ৬৫ হাজার ৫৬৬টি এবং কিন্ডারগার্টেন আছে ২৮ হাজার ১৯৩টি। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিকে মোট শিক্ষার্থী ২ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯১ জন। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯০ হাজার ৫৭ জন। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী ঝরে পড়ার হার ছিল ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ; যা ২০২০ সালে ছিল ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, দেশে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার কিছুটা কমেছে। তবে এই হার এখনও উদ্বেগজনক।

প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে অনেক বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দারিদ্র্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২২-এর জরিপ অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হওয়ার আগে ১৭ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় দারিদ্র্যকে। ছেলে শিক্ষার্থীরা দারিদ্র্যের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করে ঝুঁকে পড়ে শিশুশ্রমে। আর মেয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকেই ঝরে পড়ে বাল্যবিবাহের কারণে। অনেক পরিবারের অভিভাবকরা মনে করে, সন্তান স্কুলের পরিবর্তে কাজে গেলে পরিবারের আয় বাড়ে। ফলে তারা সন্তানের শিক্ষা লাভের বিষয়টিকে অর্থের অপচয় হিসেবে বিবেচনা করে। এছাড়া কুসংস্কার, পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থা, তাৎক্ষণিক লাভবান হওয়ার আশা, ভাষা সমস্যা, বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রভৃতি কারণেও প্রাথমিকে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার একটি হলো উপবৃত্তির ব্যবস্থা। উপবৃত্তি পাওয়ার শর্ত হলো, শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে মোট পাঠ দিবসের অন্তত ৮৫ শতাংশ উপস্থিতি থাকতে হবে এবং ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীকে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। পিছিয়ে পড়া, অনগ্রসর এলাকাগুলোয় অভিভাবক সমাবেশ, মতবিনিময় সভা, উঠান বৈঠক কিংবা হোম ভিজিটের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন করা হচ্ছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধক আইন, শিশুশ্রম নিরোধ আইন প্রয়োগের মাধ্যমেও প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার জন্য সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণ, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম, মিড ডে মিল চালু, বিনোদনের মাধ্যমে শিশুদের পড়ালেখা করার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সর্বোপরি, প্রাথমিকে ঝরে পড়া রোধে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে।

লেখক, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২০/০৮/২০২৩  

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.