।। ডক্টর মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন।।
ডা. মাহাথির বিন মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি। তিনি ১৯৮১ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল পর পর পাঁচবার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তিনি এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জন্ম: ১০ জুলাই, ১৯২৫ (বয়স ৯৮ বছর)।
এই বীরের সাথে আমার জীবনের প্রথম সাক্ষাত ২৮ জুলাই ২০২৩ শুক্রবার সকাল ১০টায়। ঘড়ির কাটায় যখন ৯টা তখন তিনি স্যোসাল বিজনেজ ডে উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। হল ভর্তি দর্শক তাঁকে দাঁড়িয়ে সন্মান জানান। ৯.১৫ হতে ৯.৫০ পর্যন্ত বক্তব্য রাখেন। নোবেলজয়ীর নানা কর্মকান্ড নিয়ে প্রশংসা করেন। এগিয়ে যাওয়া কথা বলেন। তারপর তিনি একটি হল রুমে চলে যান। কড়া সিকিউরিটি। ভেতরে কারো প্রবেশ নিষেধ।
অল্পক্ষণ পরেই নোবেলজয়ীর সাথে আমরা কয়েকজন প্রবেশের সুযোগ পাই। নোবেলজয়ী বললেন, যাও ছবি তুলে নাও। পাশে বসলাম। হাত বাড়িয়ে দিলাম কৌশল জানতে চাইলাম। সুন্দর হাসি মাখা মুখে নিকটজনের মত উত্তর করলেন। পাশে বসলাম। ছবি তোলা চলছিল। তিনি নোবেলজয়ীর সাথে কথা বলছিলেন। বহুক্ষণ পাশে বসে শুনছিলাম। কতটা জ্ঞান রাখেন!! কতটা মার্জিত!! রুচিবোধ সম্পন্ন। এমন রাজনৈতিক নেতাদের দেখলে মনে হয় রাজনীতি না করেই বরং ভুল করেছি।
কি গভীর মমত্ববোধ। ৯৮ বছর বয়সে এখনও নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে অনুষ্ঠনে আসেন। কোথায় পান এমন শক্তি। জানতে মন চেয়েছিল, পারিনি। দুই মহান মানুষের কথামালার মাঝে পড়ে নিজের ভিতর এক ধরনের কৌতুহল তৈরী হয়েছিল। কোথায় আছি। কতটা পথ পাড়ি জমিয়েছি। কতদুর হেঁটেছি। এই মহান মানুষটির জন্য বার বার মন থেকে বিনয়ের সাথে দোয়া যেন সুস্থ থাকেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহম্মদ সম্পর্কে প্রায় সকল পাঠকই অবগত, সকলেই জানেন যে, এই নেতা ১৯৭৪ সালে মালয়েশিয়ার শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দুই বছর পরে ১৯৭৬ সালে পান উপ-প্রধানমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব। ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই ৫৫ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করেন তিনি। সেই থেকে টানা ২২ বছর মাহাথির মুহম্মদ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
মাহাথির মোহাম্মদ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মালয়েশিয়াকে বদলে দেবার ক্ষেত্রে শিক্ষা হচ্ছে তার প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় শিক্ষার হার ৯০%। শিক্ষা ব্যয়ের ৯৫% সরকার বহন করছে। মালয়েশিয়ার বহু ধর্ম মত আর বিশ্বাসের মানুষকে তিনি গেঁথেছেন একই সুতায়। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আরোহণের মধ্য দিয়ে আবারও নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এ নেতা।
এত এত পরিচয়ের বাইরেও তাঁর আরেকটা পরিচয় আছে, বিশ্ববিখ্যাত এই মানুষটি আমাদের বাংলাদেশেরই রক্তের উত্তরাধিকারী। বাংলাদেশের মানুষদের অভিবাসী হওয়ার ইতিহাস অনেক পুরনো। ইউরোপ,আমেরিকা সহ পৃথিবীর নানা দেশে সর্ব প্রথম যারা থিতু হয়েছেন তারা প্রায় সকলেই ছিলেন জাহাজের নাবিক। এরকমই একজন যুবক নাবিকের বাড়ি ছিল চট্টগ্রাম জেলার উত্তরাংশে রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন চন্দ্রঘোনা ও কাপ্তাইগামী সড়কের সামান্য পূর্বে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম মরিয়মনগরে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এ যুবক জাহাজের চাকুরী নিয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি জমান। দেশটি তার কাছে ভাল লেগে যায়। তাই জাহাজ থেকে নেমে সেখানেই থেকে যান।
মালয়েশিয়ায় এ্যালোর সেটর অঞ্চলে গিয়ে একটা কোম্পানিতে চাকুরী নেন। এখানে গিয়ে তার সাথে পরিচয় হয় এক মালয় রমণীর। এক সময় তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এবং তাদের ঘরে জন্ম নেন মুহম্মদ ইস্কান্দার। আর এই মুহম্মদ ইস্কান্দারের ছেলে সন্তান হিসেবে জন্ম নেন মাহাথির মুহম্মদ।
২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মাহাথির বলেন, “চট্টগ্রামের কাপ্তাই রাঙ্গুনিয়ার কোন একটি গ্রামে আমার দাদার বাড়ি ছিলো এবং দাদা পরবর্তীতে মালয়েশিয়াতে বসতি স্থাপন করেন” তাঁর এই কথার সূত্রধরেই খোঁজ নিয়ে যানা যায় চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত মরিয়মনগর গ্রামেই উনার জন্ম।
এই মানুষটার সাথে কাটানো দীর্ঘ সময় আমাকে নানাভাবে প্রেরণা যুগিয়েছে। ভেতরে এক ধরনের বোধ তৈরী হয়েছে। স্বপ্ন দেখি একদিন এমন সুস্বাস্থ্যের মানুষ হওয়ার। সাহস বেড়ে গেল। দুই মহারথি ভালো থাকুক এই সুন্দর পৃথিবীর জন্য। আবারও কোন এক সময় দেখা হবেই। কোন এক মহাকাব্য রচনা করব। সমৃদ্ধ হব। সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকলাম॥
লেখক-শিক্ষাবিদ-নজরুল গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
