যুবলীগ নেতার তাণ্ডবে স্কুল ছাড়া প্রধান শিক্ষক

বগুড়াঃ জেলার শাজাহানপুর উপজেলা যুবলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক মো. এসএম বাকিবিল্লাহ। তিনি বর্তমানে শাহজাহানপুরের খরনা এলাকায় মানিকদিপা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল আজিজকে বিধিবহির্ভূতভাবে সাময়িক বরখাস্ত করেন তিনি। এমনকি বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে প্রধান শিক্ষকের হাত-পা ভেঙে ফেলারও হুমকি প্রদান করেন। একক আধিপত্য, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়ম করার উদ্দেশ্যেই এমন কা- ঘটিয়েছেন বলে দাবি প্রধান শিক্ষকের।

রোববার দুপুরে রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা অধিদফতরে এ নিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন বিধিবহির্ভূতভাবে সাময়িক বরখাস্তের শিকার প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল আজিজ। প্রধান শিক্ষক তার অভিযোগে বলেন, ২০২২ সালে ২৯ মে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মনোনীত হন মো. এসএম বাকিবিল্লাহ। কিন্তু সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার আগেই ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামকে মৌখিকভাবে বিদ্যালয়ের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব পরিচালনার দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের হিসাব খাতায় আমার সিল মেরে জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু আমি সেই হিসাব খাতায় স্বাক্ষর না করায় আমার ওপর ক্ষিপ্ত হন বাকিবিল্লাহ। তিনি ম্যানেজিং কমিটির পদ ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আমাকে বারবার হিসাব বইয়ে স্বাক্ষর করার কথা বলেন। বরাবরের মতো বিষয়টি প্রত্যাখান করলে তিনি আমাকে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই হাত-পা ভাঙার হুমকি দেন। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের সময়ে তিনি আত্মীয়করণের উদ্দেশ্যে তার স্ত্রী মোছা. মজিদা আক্তার, শ্যালক রুহুল আমিন, আপন ছোট ভাই মোজাহিদুল ইসলাম, চাচাতো ভাই মো. হারুন-অর-রশিদ ও আরেক ছোট ভাই মো. নুরুজ্জামান শামীমসহ কতিপয় ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা প্রদানের রসিদ ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে তাদের নাম দাতা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এতে আমি আপত্তি জানাই। আবারও তিনি আমাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ভয়ভীতি দেখান। পরে বাধ্য হয়ে আমি তার চাপে পড়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তার ঘনিষ্ঠজনদের নাম সংবলিত তালিকাতে স্বাক্ষর করি। পরে ৩ অক্টোবর কমিটি গঠনের আগে ইউএনওর নির্দেশে প্রিসাইডিং অফিসার বিধিবহির্ভূতভাবে দাতা ভোটার তালিকা প্রস্তুত করার কারণে আমাকে এবং অ্যাডহক কমিটির সভাপতি বাকিবিল্লাহকে বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন। এরপর আমি ওই মাসের ৯ তারিখে ম্যানেজিং কমিটির মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১২ তারিখে বৈধ দাতা ভোটার তালিকাসহ ব্যাখ্যা প্রদান করি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সভাপতি বাকিবিল্লাহ ১৩ তারিখে আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাময়িক বরখাস্তের আইন অনুযায়ী, কোনো ফৌজদারি/নৈতিক স্খলন/দুর্নীতির মামলায় কোনো শিক্ষক-কর্মচারী অভিযুক্ত হয়ে আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবেন। কিন্তু তৎকালীন সভাপতি বাকিবিল্লাহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাময়িক বরখাস্তের কোনো আইনই অনুসরণ করেননি। বরং শিক্ষা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন বলে জানান ভুক্তভোগী, বিদ্যালয় ও ম্যানেজিং কমিটির সংশ্লিষ্টরা।

প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল আজিজের প্রদেয় লিখিত অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্ত, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদন ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথির সূত্রে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক আবদুল আজিজকে কারণ দর্শানো নোটিস ছাড়াই টেলিফোনে মৌখিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে মৌখিকভাবেই সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন। এ ব্যাপারে তিনি ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে কোনো সভা এবং রেজুলেশন ছাড়াই সাময়িক বরখাস্তের মতো হঠকারি সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি বিধিবহির্ভূত সাময়িক বরখাস্তের পত্রটি শিক্ষা দফতরে প্রেরণ করেন যা নিয়মে নেই। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে সভাপতি বাকিবিল্লাহর কর্মকা-ের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধান শিক্ষক আজিজুল। পরে প্রধান শিক্ষকের লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিষয়টি তদন্ত করে সভাপতি বাকিবিল্লাহর অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রমাণ পান।

এ নিয়ে তিনি জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হযরত আলী বগুড়া জেলা প্রশাসক, শাহজাহানপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের একটি পত্রের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করেন যেÑমানিকদিপা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল আজিজকে ওই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম তৎকালীন অ্যাডহক কমিটির সভাপতি বাকিবিল্লাহকে প্ররোচিত করে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন যার প্রমাণ তদন্তকারী কর্মকর্তা পেয়েছেন। এ কারণে তার সাময়িক বরখাস্ত অবৈধ এবং তিনি স্বপদে বহাল থাকবেন।

জানতে চাইলে শাহজাহানপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসের একটি লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমার ওপর তদন্তভার আসে। আমি যা সত্য তা তুলে ধরেছি। কমিটি সংক্রান্ত বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা বা তদারকি করে থাকেন। তাই এখন যা করার তারাই করবেন। তবে তার বেতন যেটা অবৈধভাবে বন্ধ ছিল তা আমরা চালু করে দিয়েছি।’

জানতে চাইলে সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি খুব ঝামেলার মধ্যে আছি। এই মুহূর্তে কথা বলতে পারব না বলেই ফোন কেটে দেন তিনি। পরে অবৈধভাবে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে তৎকালীন অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মো. এসএম বাকিবিল্লাহকে মোবাইল ফোনে কল করা হয়। মোবাইল ফোনে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘তার অনেক আর্থিক অনিয়ম আছে। এ ছাড়াও শিক্ষকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমি তাকে বরখাস্ত করেছি।’ কিন্তু কী ধরনের অভিযোগ এবং তার প্রমাণ কী আছে? তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি স্কুলে আসেন সাক্ষাতে কথা হবে। এখন আমি আমার রোগী নিয়ে হাসপাতালে ব্যস্ত আছি; তাই এখন কথা বলতে পারব না। পরে কথা বলবÑবলেই ফোন কেটে দেন।

এ ব্যাপারে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. কামরুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে এমন হাজারো অভিযোগ আসে। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ এবং বিদ্যালয়টির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের দ্রুত নির্দেশ প্রদান করা হবে বলে জানান তিনি।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/০৭/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.