এইমাত্র পাওয়া

প্রিয়নবীর (স.) শ্রেষ্টত্ব ও ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী

অধ্যাপক মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ।।

আজ ভক্তির উচ্ছাসে পরিপূর্ণ প্রাণের উৎসব ও প্রিয়নবীর (স.) আদর্শ চর্চার শপথ গ্রহণের ‘ঈদ’ হলো “ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)”। সবার সেরা, সবচেয়ে প্রিয় ও আলোচিত, পরিচিত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.)। প্রিয়নবীর (স.) মর্যাদা ও শ্রেষ্টত্ব বলে শেষ করবার নয়। হাজার হাজার বছর ধরে যাঁদের অবদানে আলোকিত আমাদের এ পৃথিবী তাঁদের শিক্ষা ও সংস্কার নিয়ে মাইকেল এইচ হার্টের অবিস্মরণীয় সংকলন‘দি হানড্রেড’ গ্রন্থে শত মনীষীর তালিকার ‘এক নম্বর’ ব্যক্তিত্ব হলেন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)।

 

যা তাঁর মর্যাদাকে করেছে চির ভাস্বর। সম্প্রতি পনের শ’ বছর পুরানো একটি বাইবেল আবিস্কৃত হয়েছে। তুরস্কে সংরক্ষিত এ সংকলনটির একটি পৃষ্ঠার ফটোকপির দাম পনের লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড বলে মনে করা হচ্ছে। আর এক কোটি চল্লিশ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড মূল্যের এ বাইবেলে স্বর্ণাক্ষরে হযরত ইসার (আ.) নিজ ভাষা তথা ‘আরামী’য় বা ‘সুরিয়ানী’ (হিব্রু) ভাষায় লিখিত হয়েছে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদের (স.) আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী! অন্যদিকে তাঁর জন্মের আবাহণে জাতীয় কবির নিবেদন
“সাহারাতে ফুটল রে রঙিন গুলে লালা

সেই ফুলেরই খোশ্বুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা
সে ফুল নিয়ে কারাকারি চাঁদ-সূরুয গ্রহ-তারা
ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগণ নিরালা”।

অনাচার, অসভ্য, অসত্যের নিকষ অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে প্রিয়নবীর (স.) আবির্ভাব হলো মহা সত্যের চিরন্তন জ্যোতিষ্কের উদয়। তাঁর জন্ম লগ্নে হাজার বছর ধরে প্রজ্জ্বলিত পারস্যের অগ্নিকুন্ড নিভে যায়। রোম স¤্রাটের প্রাসাদে ফাঁটল ধরে এবং ১২ টি চূঁড়া ধ্বসে পরে। কাবাঘরের প্রতিমাগুলো কেঁপে ওঠে এবং একটি সাগর শুকিয়ে যায়, যা ছিল নর বলির কেন্দ্রস্থল। এসময় প্রকৃতি ছিল তাঁর (স.) আগমন প্রত্যাশায় অধীর।

‘রবিউল আওয়াল’ অর্থ বসন্তের প্রারম্ভ। তাই মরুর উষর-ধূষর প্রান্তরে নবীর আগমন প্রতীক্ষায় প্রকৃতি সেজে ছিল মায়বীরূপ সজ্জায়। গাছে গাছে সবুজের সমারোহ, মৌ মৌ গন্ধে খেজুরের ছড়াগুলো উঁকি দিচ্ছে আর পাখ-পাখালীর কুঁজন, নদীর কলতান ও বাতাসের উদাসী গুঞ্জরন শোনায় বিশ্বনবীর আগমন বার্তা

“তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে
যেন উষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে…….”।

এতেই বোঝা যায় ‘নবীপ্রেম’ একজন মুসলমানের ঈমানী অঙ্গিকার। প্রিয়নবীর (স.) প্রতি সম্মান জানানো ছাড়া অথবা তাঁর মর্যাদায় বিশ্বাস করা ছাড়া নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কোন অধিকার কারো নেই। বরং ইহ-পারলৌকিক মুক্তি ও সাফল্যের জন্য তাঁর আদর্শ আমাদের ভালবাসা। কেননা, মহান আল্লাহ্ বলেন

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার তাদের জন্য রাসুল (স.) রহমত বিশেষ আর যারা আল্লাহ্র রাসুলের প্রতি কুৎসা রটনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব” (তওবা: ৬১)। অন্যদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভক্তিময় উচ্চারণ
“মুহাম্মদ নাম যতই যপি ততই মধুর লাগে
নামে এত মধু থাকে কে জানিত আগে”।

প্রিয়নবী (স.) সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহামানব। তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্টত্ব ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ্ বলেন-“ওয়ারা ফা’না লাকা যিক্রাক” অর্থাৎ আমি আপনার আলোচনাকে সর্বোচ্চে স্থান দিয়েছি। (ইনশিরাহ্: ০২) তাই তো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের নামের সূচনায় যুক্ত তাঁর (স.) নাম। ‘উম্মতে মুহাম্মদী’ সগৌরবে নিজের নামের সঙ্গে ‘মুহাম্মদ’ যুক্ত করে, যা আর কোন মহান ব্যক্তির অনুসারীদের মধ্যে দেখা যায় না।

পবিত্র কুরআনে প্রিয়নবীর (স.) মর্যাদা ঘোষণা করে একটি সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘মুহাম্মদ’। আর আলকুরআনে ‘মুহাম্মদ’ শব্দটি চারবার ‘আহ্মদ’ শব্দটি একবার উল্লেখসহ উনত্রিশটি গুণবাচক নামের বর্ণনা করে ২২৪ বার তাঁর (স.) আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে সারা কুরআন মাজিদ তাঁরই (স.) আলোচনা সম্মৃদ্ধ। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-“ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহ্মাতাল-লিল আ’লামিন” অর্থাৎ আমি তো আপনাকে বিশ্বের রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি (আম্বিয়া: ১০৭)।

শুধু তাই নয় মহান আল্লাহ্ আরো বলেন“নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম চারিত্রিক গুণে গুণান্বিত” (কলম: ০৪)। প্রিয়নবীর (স.) গুণ ও মর্যাদা বলে শেষ করবার নয়। তাঁকে সম্মান জানানো সবার কর্তব্য। কেননা, মহান আল্লাহ্ বলেন“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত (সালাত, সালাম, দোয়া) বর্ষণ করেন। হে মু’মিনগণ, তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ কর” (আহযাব: ৫৬)। প্রিয়নবীর (স.) প্রতি দরূদ পাঠ করা উচ্চ মর্যাদার আমল এবং তা ত্যাগ করা মারাত্মক অন্যায়।

প্রিয়নবী (স.) বলেন“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ্ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন” (তিরমিযি)। প্রিয়নবীর (স.) মর্যাদা ও সম্মান অতুলনীয়। বিশিষ্ট সাহাবী ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন “মহান আল্লাহ্, সব নবী-রাসুল ও ফেরেশতার ওপরে মুহাম্মদ (স.) কে মর্যাদা দান করেছেন” (মেশকাত)। শুধু তাই নয় ভক্তিবাদীদের কাছে তাঁর (স.) সৌন্দর্যের তুলনা হয় না । এপ্রসঙ্গে হযরত জাবের বিন সামুরা (রা.) বলেন “একদা আমি চাঁদনী রাতে নবী (স.) কে দেখলাম। অতঃপর একবার রাসুলের (স.) দিকে তাকালাম আর একবার চাঁদের দিকে …..আমার কাছে তাঁকে চাঁদের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল-চমৎকার মনে হলো” (তিরমিযি-দারামী)।

প্রিয়নবীর (স.) প্রতি ভালবাসা ঈমানের পূর্ণতার পূর্বশর্ত। কেননা, প্রিয়নবী (স.) বলেন “তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না ‘আমি’ ভালবাসার দিক থেকে তার পিতা মাতা ও সন্তান সন্তোতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় (বিবেচ্য) না হবো”(বুখারি-মুসলিম)।

প্রিয়নবীর (স.) জীবন ও কর্মের প্রশংসা তাঁর মর্যাদকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ভক্তিময়তা ও ঈমানের দাবিতেই নয় সত্যের স্বীকৃতিতে অমুসলিম মনীষীগণও একমত হয়েছেন প্রিয়নবীর (স.) উচ্চ মর্যাদা ঘোষণায়ঐতিহাসিক গীবন বলেন-“তিনি বৈরাগ্যের কঠোরতা ও সন্নাসীর কৃচ্ছতা ছেড়ে অনায়াসে আরব সৈনিকদের মত অল্প আহার গ্রহণ করতেন….. জগতের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তাঁর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই”। বস্ ওয়ার্থ স্মীথ্ বলেন“ক্ষমতার উপকরণ ও আশ্রয় ছাড়া তিনি সর্বাধিক ক্ষমতায় ক্ষমতাসীন ছিলেন”। স্যার টমাস কারলাইল বলেন“এই পুরুষবর মুহাম্মদ, আর মাত্র এক শতাব্দী যেন একটি, মাত্র একটি অগ্নি স্ফুলিঙ্গ অনুমানের অযোগ্য তমাচ্ছন্ন বালুকাস্তুপে পতিত হল। কিন্তু দেখ, এই বালির রাশি বিস্ফোরক বারুদে পরিনত হয়ে দিল্লী থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত আকাশ প্রদীপ্ত করল”। স্বামী বিবেকানন্দ বলেন“তার বাণী ছিল ‘সাম্য’….সেই কার্য্যে পরিনত সাম্যই জয়যুক্ত হইল……”।

১২ রবিউল আওয়াল প্রিয়নবীর (স.) আগমনে বিশ্বে জাগে এক মহা পুলক ও প্রকৃতি হয় ধন্য-কৃতজ্ঞ। কবির ভাষায়
“আজকে যত পাপী ও তাপী
সব গুনাহ্রে পেল মাফী
দুনিয়া হতে বে-ইনসাফী
জুলুম নিল বিদায়……”।
(কাজী নজরুল ইসলাম)।

তাই তো দিনটি খুশির দিন। প্রিয়নবীর (স.) সম্মানে অবতীর্ণ আয়াতে আছে “বলুন (হে রাসুল) আল্লাহ্র দয়া ও অনুগ্রহে তোমরা উল্লাস প্রকাশ কর” (ইউনুস: ৫৮)। ব্যাখ্যাকারীগণের মতে আয়াতে উদ্ধৃত মূল শব্দ ‘ফাদ্লুন’ অর্থ দয়া এবং ‘রাহ্মাত’ অর্থ অনুগ্রহ, শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যথাক্রমে পবিত্র কুরআন এবং প্রিয়নবীকে (স.)। এ জন্যই ভক্তির উচ্ছাসে পরিপূর্ণ প্রাণের উৎসব ও প্রিয়নবীর (স.) আদর্শ চর্চার শপথ গ্রহণের ‘ঈদ’ হলো “ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)”।

ব¯ুু‘তঃ প্রিয়নবীর (স.) মর্যাদা ও সম্মান অনাগত বিশ্ববাসীর পথ ও পাথেয়। অথচ তাঁর জীবনী, কর্ম-দর্শন নিয়ে তেমন কোন চর্চা-গবেষণা হচ্ছে না বরং উল্টো নানান বিতর্ক, যা ঈমানের পরিপন্থি এবং কাম্য নয়। প্রিয়নবীর (স.) প্রতি ভক্তিময় আবেগ থেকে বেশি বেশি ‘সিরাত’ চর্চা হওয়া প্রয়োজন। কাজেই ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)’ নিছক ছুটির দিন হিসেবে পালন না করে স্কুল কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তা মহা আড়ম্বরে উদ্যাপনের জন্য সরকারি নির্দেশনা ও মনিটরিং থাকা একান্ত জরুরি। যেমন ‘বেগম রোকেয়া দিবসে’র অনুষ্ঠানমালা অথবা জাতীয় দিবসসমূহ পালনে সরকারি নির্দেশনা ও মনিটরিং থাকে।

‘ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)’ জাতীয় পদক প্রবর্তন এবং এ উপলক্ষে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন জেলা, উপজেলা পর্যায়ে র‌্যালি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, আলোচনা ও মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করলে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ধর্মের নামে অশিক্ষা- অপশিক্ষার অবসান ঘটতো। আর একথা সবাই স্বীকার করেন; প্রিয়নবীর (স.) দর্শন মানব মুক্তি ও সাফল্যের এক মহা সনদ। তাই তো এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে“মুহাম্মদ সকল মহাপুরুষ এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক কৃতকার্য ব্যক্তি”। তবুও যারা না বুঝে বা অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হন, তাদের জন্য নিবেদন
“ওরা কাদা ছুড়ে বাধা দিবে ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ
মোরা ফুল ছুড়ে মারবো ওদের বলবো আল্লাহ্ জিন্দাবাদ”।
(কাজী নজরুল ইসলাম)
লেখক: বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.