এইমাত্র পাওয়া

তামিমের অবসরে বেদনা ছুঁয়েছে ঢাবি শিক্ষার্থীদের

ঢাকাঃ সময়টা ২০২২ সালের ১৬ জুলাই। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। তার ঠিক এক বছরের মাথায় ওয়ানডে ফরম্যাটসহ পুরো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেই অবসরের ঘোষণা দিলেন তিনি।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের স্থানীয় এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেন দেশসেরা ওপেনার। কিন্তু ভক্তরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।

চট্রগ্রামের খান পরিবার, ক্রীড়া পরিবার থেকে উঠে আসা নাম তামিম ইকবাল। চাচা আকরাম খান এবং ভাই নাফিস ইকবালের উত্তরসূরী হিসেবে খুব দ্রুত সময়ে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন এই ক্রিকেটার। ক্যারিয়ারের শুরুতে নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও লর্ডসে এক প্রকার ঘোষণা দিয়ে করা সেঞ্চুরি জানান দিচ্ছিল এই তামিমের হাত ধরেই নতুন পথে হাঁটবে দেশের ক্রিকেট। নানা মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রল, ব্যাশিং স্বীকার হলেও ক্যারিয়ারজুড়ে বারংবার প্রমাণ করে গেছেন নিজেকে। যেবার এশিয়া কাপের ফাইনালে হারলো সেই সময়ও বাদ পড়া এবং স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কম সমালোচনা হয় নাই, কিন্তু তামিম কথা বলেছিলেন তার ব্যাট দিয়ে। ২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিজেকে চিনিয়েছিলেন নতুন করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই চোখে পড়ছে তামিমকে নিয়ে পোস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তামিমকে নিয়ে চলছে নানা প্রতিক্রিয়া। বিভিন্ন শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য জানাচ্ছেন। তবে তার এমন বিদায় প্রত্যাশা করেননি কেউই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রাহাতুল ইসলাম রাফি। তামিম ভক্ত হয়ে নিজের জন্মদিনে এমন খবর শুনবেন হয়তো কখনো ভাবেনও নি। তিনি মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের ইতিহাসে দুইটা জিনিস তামিমের জন্য বুক করা— এক. সবচে ড্যাশিং ব্যাটার! আর দুই. বেস্ট কাভার ড্রাইভ হিটার!’

‘এই দুইটা জিনিস হয়তো আজকের দিনে বলার মতো বিষয় না। বলছি, কারণ, এই দুই জিনিস দেখার জন্যই আমি বিশাল একটা সময় ধরে খেলা দেখতে বসতাম। তামিম ইকবাল খানের বিদায়টা হয়তো যুৎসই হয় নাই। এইটা এদিককার ক্রিকেট পাড়ার নিয়ম!’

শামস রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যিনি একই সাথে খেলা নিয়ে লেখালেখি করেন পত্রিকাসহ বিভিন্ন জায়গায়। তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি এমনটা বলছি না যে আমি তামিমের বড় কোনো ভক্ত। আমি বিভিন্ন সময়ে তামিমের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনাও করেছি। তবে তামিমের ম্যাচ আমাকে আনন্দ দিয়েছে। আমার দিনের সুন্দর সূচনা করতে পেরেছে।’

‘অন্যদিকে গত দুই বছরের তার খেলা আমাকে রাগান্বিত করেছে। আমি সমালোচনাও করেছি যথেষ্ট৷ কিন্তু যখন শুনলাম তামিম অবসর নিচ্ছেন, আমি চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। ক্রিকেটকে এতটা অবদান রাখার জন্য তামিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তামিমের এই বিদায় দেখা বাংলাদেশি ভক্তদের জন্য ভীষণ কষ্টের।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী তপু রায়হান। বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের কোনো ম্যাচ দেখা বাদ দেন না। ক্রিকেট নিয়ে করেন নানা আলোচনা-সমালোচনা আর লেখালেখিও। তিনি মনে করেন, তামিমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোমেন্ট হয়ত শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ম্যাচে ভাঙা হাতে ব্যাট করতে নামা। তখন তামিম বলেছিলেন, ‘ব্যক্তি থেকে দেশ বড়’। দেশের ক্রিকেট আজ একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসেছে, বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তিরা সমীহ করে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই এগিয়ে চলার পথে তামিম ছিলেন অন্যতম সারথি। তামিমের ক্যারিয়ার আরেকটু সুন্দরভাবে শেষ হতে পারত। হয়ত একটা সিরিজ বা টুর্নামেন্টে শেষে মাঠ থেকে সুন্দর বিদায় নিতে পারত। কিন্তু তা হয় নাই, মানতে না পারলেও মানতে হবে ক্রিড়াপ্রেমীদের কারণ তামিম বলেছে সে ক্রিকেট খেলেছে নিজের বাবার স্বপ্ন পূরণে। বাবা স্বপ্ন কতটা পূরণ করতে পেরেছে সেটা সময় বলে দিবে। ক্রিকেট থেকে অবসরের পর তামিম ভালো থাকুক ১৫ হাজার রান, ২৫ টা সেঞ্চুরি আর দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্তদের ভালোবাসা নিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী ইমরান নাফিস মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিম ইকবাল খানের ডেইবিউ/ডেবইউ (অভিষেক) হয় ২০০৭ সালে। মোট ২৪১ টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৭০টি টেস্ট এবং ৭৮টি বিশ ঔভারের ম্যাচ খেলেন তিনি। আমাদের তামিমের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রান পনেরো হাজারেরও বেশি। তার বর্ণাঢ্য ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তিনি ২৫টি শতরান এবং ৯৪টি অর্ধশত রান করেন।

আশরাফুল পরবর্তী যার ক্রিকেট আমরা দেখতে বাধ্য হতাম আশায় বুক বেঁধে, তিনিই আমাদের তামিম ইকবাল খান। তামিম আউট হয়ে গেলে ম্যাচ আর দেখতাম না, এমনই হতো বেশির ভাগ সময়। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আজকের অবস্থানে আনতে তামিম ইকবাল খানের অবদান অবশ্য অগ্রগণ্য। তিনি ক্রিকেট প্রেমিকদের হৃদয়ে থাকবেন যুগের পর যুগ।

তামিম ইকবাল খান একজন বিনয়ী ক্রিকেটারও ছিলেন। বহু নামি-দামি ক্রেকেটারের অনেক অভদ্র আচরণ পরিলক্ষিত হলেও, তিনি সেক্ষেত্রে ছিলেন ভিন্ন। তিনি খান সাহেব হিসেবেই ক্রিকেট জাগতেও তার বংশীয় আচরণের ভার ধরে রেখেছিলেন বলেই আমার বিশ্বাস। তামিম ইকবাল খান আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী অমিত হাসান বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম তামিম ইকবাল প্রেস কনফারেন্স ডেকেছেন। ভেবেছিলাম অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবে অবসরের সিদ্ধান্তের কথা জেনে কেন জানি চোখের কোণায় পানি অনুভব করেছি। এটা একটু বেশিই হয়ে গেল।’

‘বাংলাদেশের খেলা দেখা শুরু করেছি ২০০৯ সাল থেকে। এই সময়ে তামিম ইকবালের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের উথ্লান-পতন দেখেছি। আমি অসংখ্য বার তামিমের ডাউন দ্যা গ্রাউন্ড-এ এসে বোলারের মাথার উপর দিয়ে ছক্কা হাঁকাতে দেখেছি, আবার স্লিপে বারবার ক্যাচ দিতে দেখেছি। বোলারের বলের আঘাতে যেমন উইকেটের পতন হয়, সেভাবে সময়ের আঘাতে তামিমের ওপেনিং পার্টনারের পরিবর্তন দেখেছি অসংখ্য বার। তবে একটা মানুষ ঠিকই এক প্রান্ত আগলে রেখে ১৫ বছরেরও বেশি সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দুহাত ভরে দিয়েছেন। বাংলাদেশের খেলা দেখতে বসলে ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে তামিম ইকবাল নামটা আর শুনতে পাবো না। তামিমকে নিয়ে সমালোচনা আছে তিনি ডট বল খেলেন প্রচুর, তবে মনে রাখতে হবে তামিম যেদিন থেকে মারমুখী ভূমিকা থেকে সরে এসে ডট বল খেলা শুরু করেছেন, সেদিন থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তামিমের সবথেকে বড় সমালোচকও জানেন, তামিম বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ওপেনার, তার রিপ্লেসমেন্ট এখনও বাংলাদেশ ক্রিকেটে নেই। তামিমের অনুপস্থিতি একদিন আপনাদের অবশ্যই বলতে বাধ্য করবে, ” ইশ! আজ যদি তামিম ইকবাল থাকতো…. ’

‘এভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বল এক তাঁরা আকাশ থেকে ঝড়ে পড়লো আর আমি দুচোখ মুছে আবারও খেলা দেখতে বসবো বাংলাদেশের। তবে মনে পরবে তামিম ইকবালকে, মনে পরবে তার ডাউন দ্যা গ্রাউন্ড-এ এসে দৃষ্টিনন্দন শটগুলোকে।’

তবে তামিম ইকবাল সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন বলে মনে করেন অনেক শিক্ষার্থী। এমনই ঢাবির দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী আবরার নাদিম মুমশাদ।

তিনি বলেন, ‘যদি আমরা তামিম ইকবালের দুই থেকে তিন বছরের যে পারফরম্যান্স এটা যদি দেখি তাহলে আমার মনে হয় যে তামিম যে ডিসিশনটা নিয়েছে এটা ঠিকই নিয়েছে। কারণ থেকে শুরু করে তার ফিটনেস সবই খুবই বাজে অবস্থায় ছিল এবং অনেক সমালোচনা আসছিল। সেদিক বিবেচনা করে আসলে একটা কথা তো প্রচলিত আছে এই যে, ভিলেন হয়ে মরার চেয়ে হিরো হয়ে মরা ভালো। তো শরীক বিবেচনা করলে আসলে যে ডিসিশনটা নিয়েছে তা অনেকটা অনেক সাহসী একটা ডিসিশন ১৬ বছর ক্রিকেট খেলার পর এভাবে হঠাৎ থেকে সরে যাওয়া আসলে এত সহজ কোন কাজ নয়। হ্যাঁ শেখ অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য একজন কিংবদন্তি হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের পনেরো হাজার রান করা ও প্রথম লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম লেখানো প্রথম ব্যাটসম্যান আর শ্রীলঙ্কার সেই ম্যাচটা আমাদের সবারই মনে আছে যে এক হাতে ব্যাট করেছিলেন। বাংলাদেশ কখনো তামিমকে ভুলবে না। তিনি অবশ্যই বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য একজন পাইওনিয়ার। তবে তার এমন বিদায় আমরা প্রত্যাশা করিনি।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৭/০৭/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.