স্মার্ট শিক্ষার পূর্বশর্ত স্মার্ট শিক্ষক

শাকিলা নাছরিনঃ আমাদের প্রয়োজন মেধাবী, নৈতিক, সৃজনশীল, উন্নত জীবনমানের স্বপ্নদ্রষ্টা শিক্ষক। আমলা দিয়ে প্রশাসন চলে, শিক্ষা নয়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত পাঠ্যপুস্তক, অধিক প্রশিক্ষণ—সবই বৃথা হবে যদি প্রকৃত শিক্ষকের কাছে শিক্ষাটা বুঝিয়ে না দেওয়া যায়।

ভবিষ্যতের স্মার্ট জাতি গঠনের জন্য স্মার্ট শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু স্মার্ট শিক্ষক ছাড়া স্মার্ট শিক্ষা কী করে আশা করব?

শিক্ষার প্রথম স্তর বা ভিত্তিপ্রস্তর প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তরে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি থেকে বর্তমানে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মেধাবীরা এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

দেশ নানাভাবে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নতি ঘটেছে নানা পেশার। অথচ প্রাথমিকের শিক্ষকদের জীবনে কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। শিক্ষকদের ললাট লিখন একই রয়ে গেছে অর্ধশত বছর যাবৎ।

বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনার্স–মাস্টার্স। তার বেতনের চিত্রটা নিম্নরূপ:

গ্রেড: ১৩তম

বেতন স্কেল: ১১,০০০/– থেকে ২৬,৫৯০/–
বেসিক বেতন: ১১,০০০/–
বাড়ি ভাড়া: ৪,৯৫০/–
চিকিৎসা ভাতা: ১,৫০০/–
টিফিন ভাতা: ২০০/–
মোট: ১৭,৬৫০/–
বিএফ কর্তন: ১১০/–
রেভি. স্টাম্প: ১০/–
মোট কর্তন: ১২০/–
নিট প্রাপ্য: ১৭,৫৩০/–

একজন শিক্ষক এই বেতনে কেন তাঁর সারাটা জীবন উৎসর্গ করবেন?

সম্প্রতি ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের পদোন্নতি দিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। একজন এইচএসসি পাস ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী রাতারাতি দশম গ্রেডে উন্নীত হয়ে শিক্ষকদের ‘স্যার’ হিসেবে আবির্ভূত হলেন। এই অপমান কেন শিক্ষকদের হজম করতে হবে?

অর্থনৈতিক অসম্মান ছাড়াও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে নৈতিক অসম্মানের মুখোমুখি শিক্ষকেরা। সুতরাং আত্মসম্মানবোধের কারণেই আজ শিক্ষকদের দাঁড়াতে হচ্ছে রাজপথে।
গুরু দ্রোণাচার্য তাঁর অপমানের প্রতিশোধের জন্য তৈরি করেছিলেন অর্জুনকে। তাঁর শিষ্য গুরুর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এ দেশের শিক্ষকেরা শুধুই কি দুর্যোধন সৃষ্টি করেছেন? শিক্ষকদের ভাগ্য বদলের জন্য এ পর্যন্ত কোনো শিষ্য এগিয়ে আসেনি গুরুদক্ষিণা নিয়ে।

কম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অন্যরা যখন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তায় পদোন্নতি পাচ্ছেন, তখন শিক্ষকদের জন্য আজন্ম থেকে যাচ্ছে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর অসম্মান।

তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর অসম্মান থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষকেরা রিট করেছিলেন আদালতে। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, দেশের এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দশম গ্রেডের সুপারিশ জানানো সমীচীন হবে না।

দেশ নিজের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করেছে। অনেক মেগা প্রকল্প কার্যকর হওয়ার পথে। তাহলে ‘দেশের এই অবস্থা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

শিক্ষক আর মা–বাবার সম্মান যখন একটা জাতিকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়, তখন সে জাতির আত্মিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পায়।

শিক্ষক যখন তাঁর বঞ্চনার কথা, তাঁর অসম্মানের কথা তুলে ধরে আত্মমর্যাদাবোধের জন্য লড়াই করেন, তখন দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় নাকি প্রশাসন যখন ‘দেশের এই অবস্থা’ বলে শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী করে রাখে, তখন দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়?
স্মার্ট শিক্ষার জন্য যে স্মার্ট শিক্ষক প্রয়োজন, সেটা উপলব্ধি করতে হবে এ দেশের প্রতিটি মানুষকে।

শিক্ষকদের এবার লড়াই আত্মসম্মানের।

এই লড়াইয়ে পাশে থাকবে দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষ এবং নীতিনির্ধারকদের বোধোদয় হবে এটাই প্রত্যাশা।

লেখকঃ সহকারী শিক্ষক, জুরাইন আদর্শ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢাকা।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১১/০৫/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য় 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.