সমৃদ্ধি অর্জনে জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো বাস্তবায়ন জরুরি

 ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম এ হামিদঃ যে কোনো দেশ বা জাতি রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে অবশ্যই ঐ জাতি রাষ্ট্রের গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকে। উন্নত দেশসমূহে শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণের মানভেদে যোগ্যতার স্তর নির্ণয়ের জন্য জাতীয় যোগ্যতার সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। এ ধরনের স্তর বিন্যস্ত কাঠামো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক হাতিয়ার। শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের এই স্তর বিন্যাসকে

সাধারণভাবে জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো বা কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিশ্বের ১৫০টি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ জনশক্তিকে শ্রেণিবিন্যস্ত কর্মীবাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কোথাও ৮টি, কোথাও ১০টি যোগ্যতা কাঠামো স্তর বিন্যাস প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে। প্রতিটি দেশ নিজস্ব শিক্ষা ও দক্ষতার স্তর বিবেচনায় প্রাথমিক শিক্ষাকে লেভেল-১ এবং ডক্টরাল শিক্ষাকে লেভেল-৮ বা ১০ নির্ধারণ করে অন্য শিক্ষাকে প্রয়োজন বিবেচনায় ১ থেকে ৮ বা ১ থেকে ১০ স্তরে বিন্যাস করা হয়। উল্লেখ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় মানসম্মত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক একটি মৌলিক হাতিয়ার। যা সকল যোগ্যতায় প্রবেশাধিকার প্রদান করে এবং শিক্ষা প্রশিক্ষণ খাত ও চাকরির বাজারের মধ্যে একটি সহজ সেতুবন্ধন তৈরি করতে সহায়তা করে। এটি যোগ্যতা ও যোগ্যতার স্তরের মধ্যে তুলনা করার সুযোগ সৃষ্টি করে। এই ফ্রেমওয়ার্ক অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্জিত দক্ষতার স্বীকৃতি প্রদান করে ও এক্সপেরিয়েনশিয়াল লার্নিংসহ জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ প্রদান করে।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাক্সিক্ষত আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান শিক্ষাদর্শন দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রেক্ষিতে আইডিইবি থেকে স্বাধীন দেশোপযোগী উন্নয়ন উৎপাদন ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রবর্তনের মাধ্যমে ৪র্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়। তৎপ্রেক্ষিতে বিগত ১৭ জুলাই ২০১৭ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (বিকিউএফ) প্রণয়নের নির্দেশনা ও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ উক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাগিদ প্রদান করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৬ অক্টোবর ২০১৮ বিকিউএফ প্রণয়নের লক্ষ্যে ২১ সদস্য বিশিষ্ট বিকিউএফ স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে। উক্ত স্টিয়ারিং কমিটির ১২/১১/২০১৮ তারিখের সভায় দেশের সকল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বমূলক ৭টি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হয়। দীর্ঘ সময় পরে হলেও বৈশ্বিক চাহিদা ও অংশীজনদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার প্রায় ১ বছর পূর্বে বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো (বিএনকিউএফ) নাম অনুমোদন করে এবং চুড়ান্তকৃত বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো (বিএনকিউএফ) কে গত ১২ মার্চ ২০২৩ তারিখে চালু করার ঘোষণা প্রদান করে।

এই কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক বা যোগ্যতা কাঠামোতে শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে সকলের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অভিন্ন রেখে মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমুলক শিক্ষা, দক্ষতা বা অকুপেশনাল যোগ্যতা এবং উচ্চ শিক্ষা, এই তিনটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাখা হয়েছে জীবনব্যাপী শিক্ষার অবারিত সুয়োগ; যা হতে পারে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক বা উপানুষ্ঠানিক। শিক্ষার এই স্তরসমুহে সকল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিপরীতে একজন ব্যক্তির যে জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্ব থাকা উচিত, তা সাধারণভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন থেকে যায় বিএনকিউএফ প্রণয়নে যেখানে দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর সময় নেয়া হয়েছে, সেখানে এটি বাস্তবায়নে কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?

দেশের বর্তমান ও আগামীর সমগ্র জনবল এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের পরিকল্পনা ও বিকাশ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মান নিশ্চিত করতে এবং উন্নয়ন উৎপাদনের কর্মক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পেশার জন্য যথার্থ যোগ্যতার স্তর চিহ্নিত ও অর্জনে বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো শুধুমাত্র সহায়কই হবে না, বরং রাষ্ট্র ও জনগণ উপকৃত হবে।

বিএনকিউএফ যোগ্যতার স্বীকৃতি ও গুণমান নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রমিত ব্যবস্থা, যা জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রসার ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই সুবিধাগুলি একটি দক্ষ এবং অভিযোজনযোগ্য কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে, যোগ্যতার গুণমান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে এবং যোগ্যতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সাহায্য করতে পারে। বিএনকিউএফ’র গুণগতমান নিশ্চিতকরণে বিশেষ কিছু বিষয়কে অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-যোগ্যতার প্রমিতকরণ, যোগ্যতার শ্রেণিবিভাগ ও স্বীকৃতির জন্য একটি সাধারণ কাঠামো প্রদান। এটি যোগ্যতা মূল্যায়নে বৃহত্তর স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার জন্য একটি বিধান; যা যোগ্যতার গুণগতমান ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। এটি ক্রমাগত শেখার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করবে এবং টেকসই ও দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এনকিউএফকে আন্তর্জাতিক যোগ্যতার কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ডিজাইন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে যোগ্যতার স্বীকৃতিকে সহজতর করবে। বিদেশে কাজ করতে বা অধ্যয়ন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত যোগ্যতার স্বীকৃতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বিএনকিউএফ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। যার মধ্যে- এ জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, মোটিভেট করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিক পার্টনারশিপ জোরদার করতে হবে, প্রয়োজনীয় প্রচুর সাপোর্টিং লিগ্যাল ডকুমেন্ট প্রণয়ন করতে হবে। বিএনকিউএফ এর ফলে জীবনভর শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

২০১২ সাল থেকে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ভোকেশনাল কোয়ালিফেশন ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়ে আসছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় দুই লক্ষ অকুপেশনাল সনদধারী বের হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এখনও তা অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই। শ্রীলঙ্কা ২০০০ সালে তাদের কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন শুরু করে। মাত্র ৪ বছর পরই এই ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় সনদপ্রাপ্তদের নিয়োগের জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু বাংলাদেশ ২০১২ সালে এনটিভিকিউএফ বাস্তবায়ন শুরু করে। তবে, এই সনদপ্রাপ্তদের নিয়োগ, পদোন্নতি বা প্রণোদনার কোন সার্কুলার এখনও প্রকাশ করা হয়নি বা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এই বিষয়ে অতিশীঘ্রই সরকারি নির্দেশনা জারি করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর যথেষ্ট পরিমাণ গ্র্যাজুয়েট বের হলে কেবলমাত্র যোগ্যতা কাঠামোর অধীনে সনদপ্রাপ্তদেরই নিয়োগ করার বিধান জারি করতে হবে। এটা না করলে শিক্ষার্থী বা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো এই ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নে আগ্রহী হবে না। দেশের শিল্প কারখানাকে যুক্ত করে শিক্ষা ও দক্ষতার কোয়ালিটি নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা মান বা কারিকুলাম হবে কম্পিটেন্সি বেইজড বা আউটকাম বেইজড। ফলে উন্নয়ন উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি পাবে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সমাপনান্তে যে সার্টিফিকেট ইস্যু করবে তাতে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বিএনকিউএফ লেভেলটি উল্লেখ করতে হবে, যাতে দেশে বিদেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজতর হয়।

সর্বোপরি, এই সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে যে, গতানুগতিক অন্যান্য মানদণ্ড আইন বা বিধান নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যে ধরনের অনিয়ম বা প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়, বিএনকিউএফ অনুসৃত করার ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো অনাকাক্সিক্ষত বা অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত হবে না। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতীয় দক্ষতা কাঠামো প্রণীত হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে অংশীজনদের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও অংশীজনের সমন্বিত প্রয়াস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনকিউএফ’র সফল বাস্তবায়ন করতে হলে শিল্প-ইনস্টিটিউট-সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে অংশীদারিত্বমূলক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট সকলে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন।

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও সভাপতি, আইডিইবি

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৬/০৫/২০২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.