ভবন নেই, নেই শিক্ষার্থী আছেন শিক্ষক

ঢাকাঃ অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষক সংকট রয়েছে। কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। চারজন শিক্ষকের পদ থাকলেও দেখা যায়, শিক্ষক আছেন দুই বা তিনজন। খোদ রাজধানীতেই এমন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পাওয়া গেছে, যে বিদ্যালয়ে ৩৫ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। স্কুলটির কোনো ভবন নেই, নেই বেঞ্চ-টেবিল। ৩৫ বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থীও ভর্তি হয় না সেখানে। অথচ সেই স্কুলে সম্প্রতি পদায়ন দেওয়া হয়েছে একজন সহকারী শিক্ষককে।

রাজধানীর ওই স্কুলের নাম রমনা রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর ওই স্কুলে পদায়ন পাওয়া ভাগ্যবান শিক্ষকের নাম মোসাম্মাৎ ফাহমিদা আক্তার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাগজপত্র অনুযায়ী, তিনি ওই স্কুলে গত ২৫ মার্চ যোগ দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রমনা রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আগে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন এলাকায় ছিল। ৩৫ বছর আগে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন তৈরির সময় স্কুলটি বন্ধ করা হয়। পরে স্কুল নির্মাণের জন্য রাজধানীর মগবাজারের পাশে মীরবাগে জমি নেওয়া হয়। কিন্তু ৩৫ বছরে স্কুলে কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিরও সুযোগ ছিল না।

রমনা থানা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনাজ আক্তার বলেন, ‘স্কুলটির পুনর্নির্মাণের জন্য মীরবাগে জমি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভবন নির্মিত না হওয়ায় শিক্ষার্থী নেই। জানতে পেরেছি, স্কুলটি পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের আছে। একটি প্রকল্পের অধীনে স্কুলটি আবার নির্মিত হতে পারে।’

ওই স্কুলে সম্প্রতি কোনো শিক্ষকের পদায়ন হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, এখানে কোনো শিক্ষক নেই। যেখানে স্কুলই নেই, শিক্ষার্থী নেই, সেখানে শিক্ষক দিয়ে কী হবে?’

জানা যায়, ওই স্কুলে গত ২৫ মার্চ সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন মোসাম্মাৎ ফাহমিদা আক্তার। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা শহীদ স্মৃতি আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে এই স্কুলে যোগ দিয়েছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত  বলেন, ‘যেহেতু স্কুলটির নাম গেজেটে রয়েছে, তাই কোনো শিক্ষককে ওই স্কুলে পদায়ন করা হয়ে থাকতে পারে। স্কুলের কার্যক্রম না থাকলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে অন্য কোনো স্কুলের সঙ্গে সমন্বয় করবেন।’ সূত্র জানায়, প্রাথমিক শিক্ষকদের রাজধানীতে বদলি হয়ে আসা খুব কঠিন। আর অনলাইনে বদলি চালু হওয়ায় তা আরও কঠিন। তবে এই কঠিন কাজ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিমেষে করে দিচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেন একজন শিক্ষা কর্মকর্তা। অধিদপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তিনি সাত-আট লাখ টাকার বিনিময়ে রাজধানীতে একাধিক শিক্ষককে বদলি করে এনেছেন। এই সিন্ডিকেটে প্রভাবশালী একজন পরিচালকও রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বদলি সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ বিভাগের শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শরীফ উল ইসলাম। তিনি ২০১৪ সালে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করলেও পাঁচ বছর ধরে অধিদপ্তরেই আছেন। তার মূল কাজ প্রশিক্ষণে হলেও তিনি সারাক্ষণ বদলি-পদায়ন নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তিনি যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারেন বলে প্রাথমিক শিক্ষক ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কথা চালু রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোসাম্মাৎ ফাহমিদা আক্তারকেও বদলি করে এনেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এই সিন্ডিকেট। রমনা রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখনো কাগজে-কলমে বর্তমান। এখানে একজন শিক্ষকও নেই। এই সুযোগ নিয়েই এখানে তাকে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। একবার যেহেতু তাকে রাজধানীতে নিয়ে আসা হয়েছে, পরে হয়তো তাকে একই থানায় বা রাজধানীর মধ্যে অন্য কোনো স্কুলে বদলি করার সুযোগ রয়েছে। আসলে ওই শিক্ষককে রাজধানীতে পদায়নের জন্যই এই বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শরীফ উল ইসলাম  বলেন, ‘আমি ২০১৬ সাল থেকে অধিদপ্তরে রয়েছি। আমি যেহেতু আইসিটিতে দক্ষ, তাই অধিদপ্তরের এ সংক্রান্ত সব কাজেই আমাকে যুক্ত রাখে কর্তৃপক্ষ। স্বাভাবিকভাবেই বদলিসংক্রান্ত কাজেও আমি জড়িত ছিলাম। তবে আমি কেন, অধিদপ্তরের কেউ কোনো অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নয়।’ এর বেশি জানতে চাইলে ডিজি স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন তিনি।

এ বছর বদলির শেষ সময় ছিল গত ১২ এপ্রিল। এরপর অনলাইনে সব ধরনের বদলি কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। এরপরও অধিদপ্তরের ওই সিন্ডিকেট একের পর এক বদলি করে চলেছে। অনলাইনের বাইরে সম্প্রতি শরিফা খাতুনকে কেরানীগঞ্জের বালুচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামরুন নাহারকে রাজধানীর মহাখালীর আব্দুল হামিদ দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহনাজ পারভীনকে সুরীটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের নয়ানগর রফিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়ে শিক্ষকদের পদ ছিল ৬টি। সেখানে স্কুল কর্তৃপক্ষের কোনো প্রস্তাব ছাড়াই ৭টি পদ বানিয়ে আরেক জন শিক্ষককে বদলি করে এনেছে ওই সিন্ডিকেট।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৪/০৫/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.