আল আমিন হোসেন মৃধা, শিক্ষাবার্তা, ঢাকাঃ মৃত সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংকে থাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ করেও বহাল তবিয়তে রয়েছে বাগেরহাট সদর উপজেলার এস.বি নাটইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোয়ায়েবুল ইসলাম। মৃত সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে আসলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এলাকায় দফায় দফায় মানবন্ধন ও এলাকাবাসী কর্তৃক জেলা প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন। দুই দুই বার জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত করলেও কোন ধরণের ব্যবস্থা না নেওয়ায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক সোয়ায়েবুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এস.বি নাটইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মোল্লা আব্দুল জব্বার গত ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। পাঁচ তারিখে সভাপতি মৃত্যু বরণ করার দুই দিন পর অর্থ্যাৎ ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মৃত সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বিদ্যালয়টির রূপালী ব্যাংক লিঃ বাগেরহাট শাখার (হিসাব নং- ২৮৪০০১০০০০২২২) ফাণ্ড থেকে ১৩ হাজার টাকা, ২৫ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ২২ হাজার টাকা, ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে ১৫ হাজার টাকা, ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে ৩০ হাজার টাকা সহ সর্বমোট নয়টি চেকের মাধ্যমে একলক্ষ একান্ন হাজার টাকা উত্তোলন করেন। বিদ্যালয়ের সাধারণ ফান্ডে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা থাকার শর্ত থাকলেও ৩০ জানুয়ারি ২০২১ তারিখ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ হাজার টাকা রেখে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সব টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক। বিষয়টি জানাজানি হলে তড়িঘড়ি করে ৯ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে বিদ্যালয় ফান্ডে ২৫ হাজার টাকা জমা করেন প্রধান শিক্ষক। তবে কি কারণে এই অর্থ জমা কিংবা এই অর্থের উৎস কি তা উল্লেখ করেননি প্রধান শিক্ষক।
শুধু মৃত সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাতই নয় গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখ থেকে অক্টোবর ২০২১ তারিখ পর্যন্ত মৃত সভাপতির স্বাক্ষর জ্বাল করে স্কুলের বেতন ভাতা উত্তোলন করেন এই প্রধান শিক্ষক। এছাড়াও ম্যানেজিং কমিটির অনুমতি ছাড়া স্কুলের দুইটি গাছ বিক্রির টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি।
জানা গেছে, শিক্ষকদের টিউশন ফি’র টাকার এক টাকাও শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন না করে এমনকি বিদ্যালয় ফান্ডে জমা না দিয়ে সম্পূর্ণ টাকায় আত্মসাৎ করেন। স্কুলের কম্পিউটার ও খেলার সরঞ্জামসহ সব মালামাল বাসায় ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করেন এই প্রধান শিক্ষক। স্কুলের তিনটা পুকুর ইজারার টাকা ২০১৪ সালে ৭২ হাজার টাকা এবং ২০১৯ সালে ৯৮ হাজার- টাকাসহ মোট এক লক্ষ ৭০ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা না করে আত্মসাৎ করেন। স্কুলের মাঠ ভরাট করার জন্য বিভিন্ন সময়ে সচিবালয় থেকে বিগত প্রত্যেক বছর ২০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ পেলেও স্কুলের মাঠ ভরাট হয়নি একবারও। স্কুল সংস্কারের জন্য বাগেরহাট জেলা পরিষদ থেকে প্রাপ্ত এক লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেলেও স্কুলের সীমানা প্রাচীরে শুধুমাত্র ৩০ হাজার টাকা দিয়ে প্লাস্টার করিয়েছেন। বাকী টাকা আত্মসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক সোয়ায়েবুল ইসলাম। এছাড়াও সরকার কর্তৃক বিনামূল্যের বইয়ের অতিরিক্ত চাহিদা দিয়ে চাহিদা তুলনায় প্রাপ্ত অতিরিক্ত বই কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
প্রথম তদন্ত থেকে এক বছর তিন মাস এবং ২য় তদন্ত থেকে ১১ মাস অতিবাহিত হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
স্বাক্ষর জাল করাসহ নানা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এস.বি নাটইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মৃত মোল্লা আব্দুল জব্বারের স্ত্রীসহ স্থানীয় ৫২ ব্যক্তি বাগেরহাট জেলা প্রশাসক বরাবর গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে লিখিত অভিযোগ দেন। লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৩১ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় থেকে সরেজমিনে প্রথম তদন্ত এবং ৬ জুন ২০২২ তারিখে সরেজমিনে ২য় তদন্ত করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি ও শিক্ষা)। প্রথম তদন্ত থেকে এক বছর তিন মাস এবং ২য় তদন্ত থেকে ১১ মাস অতিবাহিত হলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
৫২ জন অভিযোগকারীর মধ্যে একজন হচ্ছেন সাবেক খাদ্য কর্মকর্তা আবু তাহের। তিনি শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, অনিয়মেরও তো একটা সীমা থাকে। কিন্তু প্রধান শিক্ষক সেই সীমাও অতিক্রম করেছেন। মারা যাওয়া সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বিদ্যালয় ফান্ড শূন্য করেছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। তদন্ত হলো কিন্তু তা আলোর মুখ দেখলো না। এ বিষয়ে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
এস.বি নাটইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মৃত মোল্লা আব্দুল জব্বারের স্ত্রী অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তা আজমিরা খাতুন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমার স্বামী একটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও এই স্কুলের সভাপতি। সভাপতি থাকাকালীন কেউ কোন দিন বলতে পারেনি তিনি কোন ধরণের অনিয়ম করেছেন। অথচ তিনি মারা যাওয়ার পর তার স্বাক্ষরই জ্বাল করে প্রধান শিক্ষক স্কুল ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ করলেন। স্কুলে শিক্ষার্থীদের থেকে পাওয়া বেতনসহ যাবতীয় আয় আত্মসাৎ করেন। আমি সহ প্রায় ৫২ জন এলাকাবাসী এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে দুই দুই বার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করে গেছে। তদন্তে এর সত্যতাও পেয়েছে। অথচ তদন্ত করে যাওয়ার বছর পার হলেও এখনও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রধান শিক্ষকের পরিবার আমাকে বলেন, অভিযোগ করে কি পেলেন কিছুই হবে না।
তিনি বলেন, স্বাক্ষর জাল করে জালিয়াতি করা একজন দুর্নীতিবাজ প্রধান শিক্ষক কিভাবে এখনও স্বপদে বহাল থাকে তা বোধগম্য নয়। এই অনিয়মের বিচার চাই আমরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এস.বি নাটইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোয়ায়েবুল ইসলাম মুঠোফোনে শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, এগুলো সব ফয়সালা হয়ে গেছে। অভিযোগগুলো এখন নেই। এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা কমিটির বর্তমান সভাপতি রুহুল আমিন শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আগে কি হয়েছিল সেই দায়ভার তো আমার না। কারণ আমি ২৬ জুলাই ২০২২ তারিখে এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেই এরপর নিয়মিত কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। আর স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ২০২০ সালে। তবে আমি এডহক কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথে প্রধান শিক্ষক সোয়ায়েবুল ইসলাম বিগত দিনের বিভিন্ন কাজের বিল ভাইচার আমাকে দিয়ে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করেন। যে কাজ আমি করিনি এবং আমি দায়িত্বে ছিলাম না সেই কাজের বিল ভাউচারে আমি কেন স্বাক্ষর করব। আমি আসার আগে সভাপতি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব আব্দুস সালাম। তিনি এই বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
এই বিষয়ে এস.বি নাটইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক এডহক কমিটির (পর পর দুই বার) সভাপতি আব্দুস সালাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি সভাপতি ছিলাম। মাত্র একদিন স্কুলে গিয়েছি। কোন বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করিনি। আর মৃত সভাপতির স্বাক্ষর জাল করার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
জানতে চাইলে বাগেরহাট সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এস মোরশেদ শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আমি যোগদান করেছি ২০২২ সালের শেষের দিকে। ঘটনা তার অনেক আগে। এই বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। তবে খোঁজ নিয়ে দেখব।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাবেক আইসিটি ও শিক্ষা, বর্তমানে সার্বিক) মোঃ হাফিজ-আল-আসাদ শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আমি ছিলাম। তবে এই বিষয়ে কথা বলতে হলে ডিসি স্যারের সাথে কথা বলতে হবে। আসলে ডিসি স্যারের বাইরে তো আমরা কোন কথা বলতে পারিনা।
জানতে চাইলে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আজিজুর রহমান এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেও কোন সাড়া মেলেনি।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৬/০৫/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
