সময়ের কাঠগড়ায় উচ্চশিক্ষার মান

বিমল সরকারঃ উপমহাদেশে অন্য অনেক কিছুর মতো ইংরেজি তথা আধুনিক শিক্ষারও গোড়াপত্তন হয় ইংরেজদের হাতে। ইংরেজ রাজশক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের বছরই কলকাতা, বোম্বে (মুম্বাই) ও মাদ্রাজ (চেন্নাই)-এই তিন প্রেসিডেন্সি শহরে পৃথক তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৮৫৮ সালে প্রথমবারের মতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ মোট ১৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন এ পরীক্ষায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পরীক্ষা চালু হয় ১৮৬১ সালে।

দুই বছর পর ১৮৬৩ সালে এমএ পরীক্ষায় অংশ নেন মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী। নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মাঝেও উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে। প্রাপ্ত এক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮১ সাল পর্যন্ত প্রথম বিশ বছরে (১৮৬১-১৮৮১) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ডিগ্রিধারীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২৩-এ (বাঙালি-অবাঙালি মিলে)।

১৯০৫ সালে আসামসহ সারা বাংলায় (পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ তথা ব্রিটিশ বাংলা) কলেজ ছিল মোট ৩৭টি। এ ৩৭টির মধ্যে আসামসহ বর্তমান বাংলাদেশ এলাকায় ছিল মাত্র ১১টি কলেজ। বাকি ২৬টি অবশিষ্ট বাংলায়। ১৯২১ সালে যখন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়, তখন পূর্ববঙ্গের কলেজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ঢাকা কলেজ (১৮৪১), চট্টগ্রাম কলেজ (১৮৬৯), রাজশাহী কলেজ (১৮৭৩), হাজী মহসীন কলেজ (১৮৭৩), জগন্নাথ কলেজ (১৮৮৪), ব্রজ মোহন কলেজ (১৮৮৯), নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯০), আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ (১৯০৮) ইত্যাদি। তা সত্ত্বেও তখন পর্যন্ত (১৯২১) পূর্ববঙ্গের কারও মাস্টার্স ডিগ্রি তথা উচ্চশিক্ষা নিতে হলে তাকে ‘নিকটবর্তী’ কলকাতা যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পর উচ্চশিক্ষার পথ অনেকটা সুগম হয়।

‘এমএ পাশ’ শুনতে বেশ ভালোই লাগে; একইভাবে এমএসসি, এমকম (হালের এমবিএস)। অনার্সসহ মাস্টার্স, খুব আনন্দ আর গর্বেরই কথা। সরকারি-বেসরকারি, এমপিওভুক্ত-এমপিওবিহীন, খণ্ডকালীন আর চুক্তিভিত্তিক যে স্তরেরই হোক, আজকাল কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরিরত শিক্ষকদের মধ্যে দু-দশজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই-এমনটা বোধকরি ভাবনার অতীত। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস, সংস্থা বা সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টদের কথা না-ই বা উল্লেখ করলাম।

থাকবে না-ই বা কেন, উচ্চশিক্ষা দান-গ্রহণের সুযোগ-সুবিধা তো এখন আর কম নয়। দেশে ৫৪টি পাবলিক ও ১০৮টি বেসরকারি মিলে মোট ১৬২টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অন্তত ১৭০টি কলেজে মাস্টার্স পড়ার বন্দোবস্ত রয়েছে (এছাড়া মোটামুটি সবার জানা এবং বহুল আলোচিত একটি বিষয় হলো অনার্স পড়ানো হয় সাড়ে আটশ’র বেশি; অন্তত ৮৮২টি কলেজে)।

কিন্তু খানিকটা পেছনের দিকে ফিরে তাকালে, এমনকি স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরের কয়েকটি বছরের কথা মনে করলেও বেশ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যেতে হয়। তাহলে এই ছিল উচ্চশিক্ষা দান-গ্রহণের পরিবেশ-পরিস্থিতি তথা বাস্তবতা।

লেখাটির গৌড়চন্দ্রিকা বেশ বড় হয়ে যাওয়ায় আমি দুঃখিত। প্রিয় পাঠকদের ধৈর্যের বাঁধটি থাকতে থাকতে মূল বক্তব্যে প্রবেশ করি।

১৯৬৩ সালে বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে আনন্দমোহন কলেজে (স্থাপিত ১৯০৮) বাংলা ও ইতিহাস বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। পরের বছর (১৯৬৪) কলেজটি সরকারিকরণ হয়। অনার্স চালুর দশ বছর পর ১৯৭৩ সালে উল্লিখিত বিষয় দুটিতে মাস্টার্স কোর্সও খোলা হলে বৃহত্তর ময়মনসিংহবাসীর ভাগ্যের দরজা খুলে যায়। প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের এমএ (বাংলা ও ইতিহাস) পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া; সামান্য কথা নয়। সামান্য কথা হবে কীভাবে, কেবল কি বৃহত্তর ময়মনসিংহ? টাঙ্গাইলসহ বৃহত্তর ঢাকা (৭ জেলা) ও বৃহত্তর ফরিদপুর (৫ জেলা) অর্থাৎ ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর অঞ্চলের ১৭টি জেলার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একমাত্র আনন্দমোহন কলেজেই (১৯৭৩ সাল পর্যন্ত) মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর পড়া ও পড়ানোর বন্দোবস্ত ছিল। এ ১৭ জেলার (দেশের বলতে গেলে এক-চতুর্থাংশ এলাকা) মানুষের প্রথমে ৬৩ বছর (১৮৫৭-১৯২১) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে ৫২ বছর (১৯২১-১৯৭৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আর কোথাও মাস্টার্স পড়ার সুযোগ ছিল না। এমন কঠিন বাস্তবতা এখনকার প্রজন্মকে কি বলে বিশ্বাস করানো যাবে, নাকি তা সহজে বিশ্বাস করার কথা?

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইতোমধ্যে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। মাস্টার্স তথা উচ্চশিক্ষার উদ্যোগ-আয়োজনের কথা সংক্ষেপে আগে খানিকটা ব্যক্ত করা হয়েছে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবলিক ও প্রাইভেট) বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো আছেই, শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরই দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থী প্রতি বছর মাস্টার্স পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছে। আগের তুলনায় অভাবনীয় তো বটেই, অনেকের কাছে তা অবিশ্বাস্য বলেও মনে হবে। বড় শহর, ছোট শহর (জেলা বা উপজেলা), এমনকি ইউনিয়ন স্তরের কলেজেও এখন মাস্টার্স পড়ার বন্দোবস্ত আছে। ফলে গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, এমনকি বাড়িতে বাড়িতে আজকাল মাস্টার্স পাশ বা উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯২১ সালে। রাজশাহী ১৯৫৩ আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৬৬ সালে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আগ পর্যন্ত দেশের ডিগ্রি স্তরের সবকটি কলেজ ছিল উল্লিখিত তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ২২০টিসহ সারা দেশের আনুমানিক ৪৫৫টি ডিগ্রি কলেজকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীনতা থেকে মুক্ত করে নতুন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। আর তখন থেকেই আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি যাবতীয় দুর্ভাবনা ও দুর্বিষহ বিপত্তির সূচনা। উচ্চশিক্ষার এক অবারিত বন্দোবস্ত করে দিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে উচ্চশিক্ষার দেখভালের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে না করতেই নতুন নতুন কলেজের অনুমোদন দেওয়া এবং কলেজে কলেজে অনার্সের পাশাপাশি মাস্টার্স কোর্স খুলে দিনে দিনে উচ্চশিক্ষাটাকে একেবারে ছেলের হাতের মোওয়া বানিয়ে ফেলেছে।

যে উচ্চশিক্ষা মানুষের কাছে ছিল এক আরাধ্য বস্তু; সেটিকে দিনে দিনে সবার সামনে কীভাবে সস্তা পণ্য বানিয়ে ফেলা হলো! সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো, এ ব্যাপারে যা কিছু করা হয়েছে, তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রযত্নেই। এভাবে শিক্ষার মান আজ সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/৩০/০৪/২০২৩  

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.