পিয়াস সরকার।।
খুবই মানসিক যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। চাকরি করছি কিন্তু কোনো বেতন নেই। জীবন চালানোর জন্য ছোট ভাইয়ের কাছেও টাকা নিতে হয়। এভাবে আর কতদিন? টিউশনি যে করাবে কারিগরি শিক্ষকদের টিউশনি করানোর মতোও অবস্থা নেই। আমি এখনো বিয়ে করতে পারি নাই। এখন আমার একার জীবন চালানোই মুশকিল হয়ে গেছে। এর কারণে পারিবারিক, সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছি। প্রতিনিয়ত যেন তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি, এভাবেই কষ্টের কথা বলছিলেন ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউশনের শিক্ষক মো. তৌহিদ।
তৌহিদের মতো ৭৭৭ জন শিক্ষকের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। তারা শিক্ষকতা করছেন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউশনে কিন্তু মিলছে না বেতন। সিরাজগঞ্জ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউশনে কর্মরত আছে মো. মেহেদী হাসান।
তার ঘরে ছয় বছরের ছোট ছেলে। তিনি বলেন, বেতনহীনভাবে কাজ করছি। ছেলেটার ঠিকমতো দেখভাল করতে পারছি না। ছেলেটার মুখের দিকে চাইলে অনেক কষ্ট হয়। নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়। কিন্তু আমার যে করার কিছু নেই।
তিনি বলেন, এই বয়সে আমার মা’কে টাকা দেয়ার কথা। পরিবারের সম্বল হওয়ার কথা কিন্তু উল্টো আমি যেন বোঝা। আমার মা’কে টাকা কি দেবো উল্টা আমার মায়ের কাছে অনেক টাকা ধার করতে হয়েছে। সঞ্চয় যা ছিল সব শেষ এখন ধার-দেনায় জর্জরিত।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় প্রত্যয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি ৪৯টি পলিটেকনিকে প্রায় ১২ বছর ধরে শিক্ষকতা করে আসছেন ৭৭৭ জন শিক্ষক। মোট দু’টি ধাপে ‘স্কিল অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট, (স্টেপ) শীষর্ক প্রকল্পে ১০১৫ জন শিক্ষক সম্পূর্ণ বিধি মোতাবেক চাকরিতে যোগদান করেন। এই শিক্ষকরা বর্তমানে রাজস্বখাতে প্রক্রিয়াধীন। বর্তমানে ৭৭৭ জন শিক্ষক এই প্রকল্পে কর্মরত আছেন। এই প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই গত ২২শে মে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল শিক্ষকের চাকরি রাজস্বকরণে অনুশাসন প্রদান করেন। এরপর ৩০শে জুন ৭৭৭ জন শিক্ষককে সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য লিখিতভাবে স্টে-অর্ডার প্রদান করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ওই বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর স্টেপ শিক্ষকগণকে স্টেপ- হতে ‘রাজস্বখাতে প্রক্রিয়াধীন’- নামে অভিহিত করতে হবে। সেইসঙ্গে নিয়মিত শিক্ষকদের ন্যায় সকল কাজে ও দায়িত্বে তাদের যুক্ত করতে হবে পত্রের মাধ্যমে অবহিত করা হয়।
এরপর প্রকল্প শেষে সরকারি থোক বরাদ্দ থেকে ২০২০ সালের ১৮ই জুন বেতন ভাতা প্রদান করা হয়। এরপর থেকেই বেতন পান না এই শিক্ষকরা। করোনার সময়ে মানবেতর জীবন-যাপন করেছেন তারা। যা চলে আসছে এখনো। গতবছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে টানা ১৩ দিনের আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেন তারা। শিক্ষামন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসে ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. ওমর ফারুক পানি পান করানোর মাধ্যমে তারা অনশন প্রত্যাহার করেন। বাড়ি ফেরেন বেতনভাতা প্রাপ্তির আশ্বাসে। তারপর এক বছর দুই মাস অতিবাহিত হলেও ৭৭৭ জন শিক্ষক বেতনবিহীন আছেন। আরও একটি ঈদ পালন করতে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পলিটেকনিক টিচার্স ফেডারেশনের সভাপতি মো. সানাউল্লাহ বলেন, আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সবকিছুই আছে। প্রধানমন্ত্রী রাজস্বখাতে নেয়ার জন্য অনুমোদন দিয়েছেন। আমরা গতবছর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশন করি। আমাদের আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙানো হয়। কিন্তু এরপরও কোনো সুফল আমরা পাই নাই।
মেহেদী হাসান নামে আরেক শিক্ষক বলেন, আমরা এই ৭৭৭ শিক্ষকের মধ্যে প্রায় শ’খানেক আছেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তারপরও কোনো লাভ হচ্ছে না। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি। আমরা চাই আমাদের দাবি আদায় হোক। আর এই দাবি আদায় না হলে ৩০শে এপ্রিল মানবন্ধনের ডাক দিয়েছি। পর্যায়ক্রমে এই আন্দোলন আরও বেগবান করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো ওমর ফারুক বলেন, আমাদের তাদের প্রতি সহানুুভূতি আছে। আমরা একাধিকবার বলেছি এই শিক্ষকদের আমাদের প্রয়োজন আছে। তাদের জন্য আমাদের জনবল কাঠামো তৈরি করে বেতন দিতে হবে। আমরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলেই আমরা তাদের জন্য জনবল কাঠামো ঠিক করতে পারবো।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৮/০৪/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
