ঢাকাঃ দেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করলেও এখনো চাকরি নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে শিক্ষকদের। এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চার লাখ শিক্ষকের মনে সুখ নেই। বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, উৎসব ভাতা প্রদান ছাপিয়ে এখন জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও টনক নড়ছে না সরকারের।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান। একটি সরকারি অন্যটি বেসরকারি এমপিওভুক্ত। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষ কম। তবে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে অসন্তোষ রয়েছে। এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। শিক্ষকদের একাধিক সংগঠন এতে অংশ নিয়েছে। তবে সব সংগঠনই এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের এক দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দাবিতে তারা মানববন্ধন, লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। কিন্তু ফলাফল এখনো শূন্য।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জানান, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ৯৭ শতাংশই বেসরকারি। যাদের বেশিরভাগই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা একই নিয়মনীতি অনুসরণ করেন। একই পাঠ্যক্রমে পাঠদান করান। একই প্রশিক্ষণ নেন। অনেক সময়ই দেখা যায়, সরকারির চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফল ভালো হয়। এর পরও তারা বৈষম্যের শিকার।
শিক্ষকরা জানান, ২০০৪ সাল থেকে শিক্ষকরা বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসব-ভাতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই ভাতায় জীবন চলে না—উল্লেখ করে দীর্ঘদিন ধরেই শতভাগ উৎসব-ভাতা, সরকারি শিক্ষকদের মতো চিকিৎসা-ভাতা ও বাড়িভাড়া দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। কিন্তু ১৮ বছর পার হলেও সরকার উৎসব-ভাতায় কোনো পরিবর্তন আনেনি।
বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা বলছেন, বিএড ডিগ্রি না থাকলে ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৭৫০ টাকা এবং বিএড ডিগ্রি থাকলে ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা পান তারা। তবে এর থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ ভাতা কেটে রাখা হয়। এর বাইরে তারা কোনো টাকা পান না। সরকারি স্কুলে একজন শিক্ষক বেতন পায় ২৫-২৬ হাজার টাকা। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে বিএড বাধ্যতামূলক নয়। এটা বৈষম্যমূলক পদ্ধতি।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস)-এর সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের মুখপাত্র মো. নজরুল ইসলাম রনি বলেন, একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে সামান্য বেতনে আমরা পরিবার, সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। সে কারণে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ চাচ্ছি; কিন্তু বেতন বৈষম্য দূর করতে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা জানান, সরকারি কলেজে প্রভাষকরা ২২ হাজার টাকা স্কেলে ৩৫-৩৮ হাজার টাকা বেতন পান। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও পান। কিন্তু বেসরকারি কলেজের প্রভাষকরা ২২ হাজার স্কেলে ২২ হাজার টাকাই পায়। বাড়তি কোনো সুবিধা তাদের দেওয়া হয় না।
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হক বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো দাবি মেনে নেওয়া হয়নি। আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে শিক্ষামন্ত্রীকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত বসেননি।
বাংলাদেশ মাধ্যমিক কারিগরি শিক্ষক পরিষদের মহাসচিব ও জাতীয়করণ প্রত্যাশী মহাজোটের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. আবুল বাশার বলেন, বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি আমরা সবাই একই ধরনের বৈষম্যের শিকার। সে কারণে আমরা সবাই চাই শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হোক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, সব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা চ্যালেঞ্জের বিষয়। এই মুহূর্তে সব প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের চিন্তা সরকারের নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার পর সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে সুফল পাওয়া যায়নি। সামনে জাতীয়করণ করা হলেও এখন যেভাবে করা হয়, সেভাবে হবে না, ভিন্নভাবে করা হবে। তবে, শিক্ষা খাতে সরকার আগের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, সরকারের উচিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের জাতীয়করণ করা। তবে সেটি অবশ্যই ঢালাওভাবে হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষকরা অবহেলিত সেটি সত্য। তবে ঢালাওভাবে জাতীয়করণ করলে এর ফল খারাপ হবে। তিনি বলেন, জাতীয়করণ করা উচিত, তবে সবাইকে নয়। একটি পরীক্ষার মাধ্যমে সেটি হতে পারে। প্রয়োজনে পরে শিক্ষক ঘাটতি থাকলে নতুন শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা। কিন্তু অবশ্যই দক্ষতার জায়গায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৭/০৪/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
