শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার দুই সহকারী শিক্ষক রতন কুমার সরকার ও এসবি ওয়াহিদা ইয়াসমিন বিদ্যালয়ে আসেন নিজেদের ইচ্ছেমত। মন চাইলে আসেন না চাইলে আসেন না। মানেন না নিয়মনীতি।
এমন অভিযোগ স্কুলটির প্রধান শিক্ষক আবু হানিফার। এমনকি গেল ২১ ফেব্রুয়ারিতেও তারা অনুপস্থিত ছিলেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারিও আসেননি বিদ্যালয়ে। এ কারণে হাজিরা খাতায় তাদের অনুপস্থিত দেখান প্রধান শিক্ষক। পরে হাজিরা খাতা দেখেই ক্ষেপে যান সহকারী শিক্ষক রতন কুমার। প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে হাজিরা খাতা কেড়ে নিয়ে ফ্লুয়িড দিয়ে লেখা সংশোধন করে নিজেদের উপস্থিত লিখে অপর শিক্ষক ওয়াহিদা ইয়াসমিনকে এগিয়ে দেন খাতা। তিনি স্বাক্ষর করেন ফ্লুয়িড দিয়ে মেশানো জায়গায়।
এ নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে অফিসের টেবিলের কাঁচ ভাঙচুর করেন শিক্ষক রতন। শিক্ষক ওয়াহিদা অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেন এ সময়। এসব অভিযোগ প্রধান শিক্ষক আবু হানিফার। বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ও উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যানকে জানালে তারা ঘটনাস্থলে যান।
এ ঘটনায় রোববার দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এলাকাবাসী, সাবেক ছাত্র ও অভিভাবকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আসেন বিদ্যালয়ে। উত্তেজিত অভিভাবক ও এলাকাবাসী অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের বদলির দাবীতে বিক্ষোভ করেন। পরে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে আলোচনায় বসা হয়। তার আগে ফিরে আসেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও শিক্ষা কর্মকর্তা।
বৈঠকে ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান শিমু, রায়গঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান দীপসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এ সময় এলাকার অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে দুই শিক্ষকের বদলির সুপারিশ করার আশ্বাস দেন ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যান।
রায়গঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হানিফা বলেন, তারা সরকারি নিয়মনীতি মানে না। ইচ্ছেমত স্কুলে আসে যায়। গত ২১ ফেব্রুয়ারি তারা আসেননি। ২২ ফেব্রুয়ারিও আসেননি। এ বিষয়ে আমাকে কিছু জানাননি। তাই আমি অনুপস্থিত দেখাই। এ কারণে তারা আমার সাথে ভয়ঙ্কর রকমের খারাপ আচরণ করেন। টেবিলের কাঁচ ভেঙে দেন। রতন এলাকার হওয়ায় প্রায়ই সে প্রভাব দেখায়।
অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক রতন কুমার সরকার ও এসবি ওয়াহিদা ইয়াসমিন হাজিরা খাতা কেড়ে নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাদের দাবী প্রধান শিক্ষক অন্যায়ভাবে তাদের অনুপস্থিত দেখিয়েছেন। তারা প্রধান শিক্ষকের কাছে মৌখিক বা মুঠোফোনে জানিয়ে ছুটিতে যেতেন।
সহকারী শিক্ষক রতন কুমার সরকার বলেন, আমার কয়েকদিন অনুপস্থিত দেখান প্রধান শিক্ষক। এ জন্য আমি খাতাটি চেয়ে নিয়ে স্বাক্ষর করেছি। আমার সহকর্মীও করেছেন। টেবিলের গ্লাসটা আমি ভাঙিনি।
অপর শিক্ষক এসবি ওয়াহিদা ইয়াসমিন বলেন, এ স্কুলে মোবাইল ফোনে ছুটি নেয়ার বিধান আছে। অনেকে নেয়। আমিও বলে যেতাম। আমার সহকর্মী খাতাটা টেনে নিয়েছেন ঠিক আছে। কিন্তু কাঁচ কে ভাঙলো বুঝতে পারছি না।
এলাকাবাসী মজিবর রহমানসহ কয়েকজন জানান, এ দুই শিক্ষকদের এ রকম ঘটনা নতুন নয়। তাদের কারণে কোমলমতি শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পরছে। দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়ে তালা লাগানোর হুমকি দেন অনেকে।
রায়গঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান দীপ বলেন, বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনার পরও বিষয়টি সমাধান হয়নি। ওই দুই শিক্ষক কোনো ছাড় দিচ্ছেন না। তারা স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নষ্ট করছে। মনে হচ্ছে এটা স্কুল ধ্বংসের একটি ষড়যন্ত্র। একবার দু’বার নয় ওই দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। আমরা আশা করছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেবেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান শিমুর স্ত্রী। ভাইস চেয়ারম্যানও সেখানকার অভিভাবক। তিনি বলেন, আমিও ওই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা লজ্জিত। সমস্যা যাতে না থাকে সে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি কর্তৃপক্ষের কাছে সেভাবে আবেদন করবো।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোবাশ্বের আলী বলেন, ঘটনা শোনার পর উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। প্রধান শিক্ষককে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি প্রতিবেদনটি দিয়েছেন। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জাহান বলেন, জেলার মিটিংয়ে থাকায় বিষয়টি আমি জানিনা। উপজেলা চেয়ারম্যান ও শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা গেছে, ১৯০২ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ ১০ জন শিক্ষক আছে। ছাত্র-ছাত্রী ২৩৫ জন। শিক্ষার্থী হিসেবে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা হবার কথা ৬ জন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক নেতা হওয়ায় সেখানে ১০ জন শিক্ষক বসে সময় পার করেন। এ কারণে সহকারী শিক্ষকরা নিয়মিত আসেন না। উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ছয়জনের জায়গায় দুই শিক্ষক দিয়ে কোনো মতে পাঠদান চলছে। অথচ এই বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত চার শিক্ষক। শিক্ষক সংকটের মাঝেও বেশ কিছু বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক রাখা হয়েছে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৭/০২/২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
