এইমাত্র পাওয়া

সিটবাণিজ্যের প্রতিকার নেই শিক্ষার্থী নির্যাতন বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ।।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোয় শিক্ষার্থী নির্যাতন এখন নিয়মিত ঘটনা। জিম্মি করে টাকা আদায়, আবাসিক হলের সিট দখল, বাণিজ্য, বৈধ সিটধারীদের হল থেকে বের করে দেয়াসহ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। করোনার আগের দুই বছর ও করোনা-পরবর্তী শিক্ষার্থী হয়রানি ও নিপীড়ন, চাঁদাবাজি মিলিয়ে শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগের প্রতিকার না মেলায় নীরবে সহ্য করছেন অনেকেই। লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে মাত্র ৩ ভাগের ১ ভাগ।

সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে কৃষ্ণ রায় নামের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। এ সময় তাকে মারধর করে ‘শিবির’ বলে চালিয়ে দেয়া ও হত্যার হুমকি দেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী হল প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। হল প্রাধ্যক্ষ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, করোনার পর থেকে চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসিক হলগুলোয় ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি, শিক্ষার্থী নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সিটবাণিজ্যের ঘটনায় এ রকম ২৫টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। তিন বছরের এসব লিখিত অভিযোগের মাত্র ১৫টি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। তার মধ্যে ছয়টি ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। বাকি নয়টি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। আর শৃঙ্খলা কমিটির সভা না হওয়ায় সেই ছয়টি প্রতিবেদন দেয়ার পরও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

করোনা-পরবর্তী নির্যাতনের ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর থেকে প্রকট আকার ধারণ করে সিটবাণিজ্য। ১১টি ছাত্র হলে করোনা-পরবর্তী অন্তত শ’খানেক অভিযোগের তীর এসেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। প্রতি মাসে কমপক্ষে একটি ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এসব ঘটনায় ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। মূলত সিট দখল নিয়েই শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেয়া, চাঁদা দাবির ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোয় নিয়মিত সিটবাণিজ্য, চাঁদাবাজি, শিক্ষার্থী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে হল প্রশাসনও অনেকটা অসহায় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন প্রাধ্যক্ষ।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগপত্র জমা দিলে সেটি হারিয়ে যাওয়ার নজিরও আছে। কিছু ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে অথবা সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি রায়হান আলী   বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এরপর অধিকাংশ ঘটনায় ছাত্রলীগের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেও প্রতিকার না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না তারা। উল্টো প্রশাসনের কাছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ছাত্রলীগের চক্ষুশূল হচ্ছেন। এজন্য তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছেন না।’

২০১৮ সালে কোটা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে একক আন্দোলন করে আসছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. ফরিদ উদ্দীন খান। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা না কমার কারণ হিসেবে তিনি   বলেন, ‘ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক ছাত্রনেতাদের দাপট বেড়েছে। এর কারণে এটি এখন লেখাপড়ার স্থান নয়, বিশ্ববিদ্যালয় এখন রাজনীতি চর্চার কেন্দ্র হয়ে গেছে। যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর শাস্তি না হওয়ায় আবাসিক হলগুলোয় শিক্ষার্থী নির্যাতন কমছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির কাছে অভিযোগগুলো পৌঁছাচ্ছে না, এর জন্য প্রশাসনের দায়বদ্ধতা আছে।

এছাড়া শিক্ষার্থী নির্যাতনের প্রতিবাদে নিপীড়নবিরোধী ছাত্র শিক্ষক ঐক্য, নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক নেটওয়ার্ক নামের দুটি প্লাটফর্মের অধীনে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দেখভালের দায়িত্ব প্রক্টরের দপ্তরে। শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের অপরাধকর্মে জড়িত হলে কিংবা কোনো ঘটনা ঘটলে সেসব ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি শুনানি করে এবং আগের কোনো কমিটির তদন্ত করা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা গ্রহণ করে শৃঙ্খলা কমিটি।

নিয়মানুযায়ী বছরে অন্তত দুবার এ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৩ সালের পর থেকে দীর্ঘ ১০ বছর কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয় না। ফলে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। ফলে শিক্ষার্থী নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতরা বিচারের আওতায় আসে না।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, পদাধিকারবলে শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন প্রক্টর। কমিটির সদস্য হিসেবে থাকেন উপউপাচার্য, অনুষদের ডিন ও ছাত্র-উপদেষ্টা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সুলতান-উল-ইসলাম জানান, ছাত্র নির্যাতন ও শিক্ষক লাঞ্ছনা প্রতিরোধ বিষয়ে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। দ্রুত এ কমিটির সদস্যরা আলোচনায় বসবেন এবং কীভাবে এর প্রতিকার করা যায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

নিপীড়ন বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক ড. আসাবুল হক   বলেন, ‘প্রতিকার হচ্ছে না এমনটা বলা যাবে না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারপর তদন্ত কমিটি রিপোর্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অনেক ঘটনার প্রতিকার আমরা সরাসরি করছি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হল থেকে বহিষ্কারও করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সাথে এমনটা যেন দ্বিতীয়বার না ঘটে সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তৎপর রয়েছে।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৪/০২/২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.