বইয়ের পাতা আর টেলিভিশনে শহিদ মিনার দেখে বড় হচ্ছে শিশুরা

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিমু। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিতে স্কুলে যাবে কি না জিজ্ঞেস করাতে সে বলে, ‘বইয়ের পাতায় ছবি আর টেলিভিশনে শহিদ মিনার দেখেছি। একুশে ফেব্রুয়ারি সেখানে মানুষ ফুল দিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শহিদ মিনারে গান, কবিতা পাঠের আসর ও নাটক মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের স্কুলে শহিদ মিনার নেই।’ আক্ষেপ ভরা কথাগুলো শুধু তার নয়, দেশের হাজারো স্কুলের লাখো শিক্ষার্থীর। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার জুবলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি গাইবান্ধা অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্কুল। ১৯৬২ সালে শহরের ভি-এইড রোডে স্থাপিত হয় স্কুলটি। ৬১ বছরে স্কুলের অনেক উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু হয়নি একটি শহিদ মিনার। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসেও এমন নজির দেশের প্রায় প্রতিটি কোনায় হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

পৃথিবীর বুকে বাঙালি অনন্য তার ভাষার কারণে। মাতৃভাষার অধিকার আদায় করতে গিয়ে রক্ত দেওয়ার নজির পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। ভাষা আন্দোলনের এ অনন্য ইতিহাসের কারণেই বাংলা ভাষা পেয়েছে তার আলাদা স্থান, বাঙালি পেয়েছে তার স্বতন্ত্র পরিচয়। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পুরো পৃথিবীতেই পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ১৮৮টিরও বেশি দেশে এদিন বাংলাদেশের ভাষাশহিদদের স্মরণে জ্ঞাপন করা হয় শ্রদ্ধা। অথচ মহান স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও দেশে হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেখা মেলে যেগুলোতে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া দেশের সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গড়া হয়নি কোনো শহিদ মিনার। এসবের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই কলাগাছ, ইট, কাঠ, বাঁশ, কাগজ, কাপড় দিয়ে অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে ফুল দেয় শিক্ষার্থীরা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় শুধু মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের। আবার কোথাও ২১ ফ্রেব্রুয়ারিতে ভাষাশহিদদের স্মরণে আয়োজন হয় না কোনো অনুষ্ঠানেরই। এতে বই-পুস্তকে ভাষা দিবস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলেও সশরীরে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী। ফলে শিক্ষার্থীদের মননে ঠিকভাবে ঠাঁই করে নিতে পারছে না ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগের তাৎপর্য। একুশের চেতনা ধারণ ও লালন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

জানা যায়, গাইবান্ধায় ৬৬ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই শহিদ মিনার। গাইবান্ধায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৪৬৫টি। এর মধ্যে শহিদ মিনার আছে ৫০২টি বিদ্যালয়ে। শহিদ মিনার নেই ৯৬৩টিতেই। এ ছাড়া ৪২২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শহিদ মিনার নেই ১৮১টিতে। জেলায় মাদরাসা আছে ২১৩টি। আর এর মধ্যে শহিদ মিনার নেই ১৩১টিতেই।

রাজবাড়ীর পাঁচটি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভায় মোট ৭৪৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৬৯ প্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার রয়েছে। বাকি ৫৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শহিদ মিনার। এ ব্যাপারে রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অহীন্দ্র কুমার মণ্ডল জানান, সরকারি নির্ধারিত কোনো বরাদ্দ না থাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নেই।

এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জ জেলায় শহিদ মিনার নেই ৪৬৫টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। অথচ এ জেলায়ও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলে বিদ্যালয় রয়েছে ৭৮৯টি। এর মধ্যে শহিদ মিনার রয়েছে মাত্র ৩২৪টিতে।

শহিদ মিনারের গুরুত্ব তুলে ধরে টঙ্গিবাড়ী সদর উপজেলার পূর্বরাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদার হোসেন বলেন, বাঙালি জাতির চেতনার প্রথম উন্মেষ ঘটে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে ও এর তাৎপর্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে বিদ্যালয়ে শহিদ মিনার স্থাপন গুরুত্বসহকারে নিতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার মো. ওবায়দুল হক ভূঞা বলেন, শহিদ মিনার স্থাপনের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একুশের চেতনা ধারণ ও লালন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি স্কুলে শহিদ মিনার রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলায় ২০টি মাদরাসার মধ্যে একটিতেও শহিদ মিনার নেই। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহুতল ভবন নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার ও শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় প্রতি বছর চাঁদা তুলে ‘কলা গাছের’ শহিদ মিনার তৈরি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দিবসটি পালন করতে দেখা যায় এখানকার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে স্কুল, হাই স্কুল, মাদরাসা ও কলেজ মিলে ২১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও ১৫৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শহিদ মিনার। গত বছর ১৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহিদ মিনার ছিল না। এ বছর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নতুন শহিদ মিনার নির্মাণ করার ফলে ১৫৩টি প্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নেই।

শহিদ মিনার নেই পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিতে অস্থায়ীভাবে শহিদ মিনার বানিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালনই করা হয় না। উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ৫টি কলেজ, ২৬টি মাধ্যমিক, ৭৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১১টি দাখিল মাদরাসা এবং ২টি ফাজিল মাদরাসা রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন।

এ ছাড়া ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায় ৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৬টিতে শহিদ মিনার থাকলেও ৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন পর্যন্ত শহিদ মিনার নেই। শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দূরদূরান্তে গিয়ে শহিদ মিনারে ফুল দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। এরকম নজির খুঁজলে পুরো দেশে পাওয়া যাবে ভূরি ভূরি।

স্বাধীন সার্বভৌম একটি মানচিত্রের জন্য যেসব বীর সন্তান জীবন দিয়েছেন সেসব সূর্যসন্তানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেন শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে যেন শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে-এমনটাই দাবি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২২/০২/২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.