নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লাঃ কুলসুম আক্তার কাকলী। অটোরিকশাচালক বাবার আদরের মেয়েটি এখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এক হাতের স্বল্প আয়ে দুই কন্যা আর স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয় বাবা কবির হোসেনকে। তার ওপর মেয়েদের পড়াশোনার খরচ। এর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা উচ্চমূল্যের গাইড বই। টানাটানির সংসারে ৯০০ টাকার গাইড বই মেয়ের হাতে তুলে দেওয়া বিলাসিতাই বটে অটোরিকশাচালক এই বাবার জন্য। কিন্তু উপায়ও তো নেই!
শিক্ষকদের নির্দেশ গাইড বই লাগবেই; তা না হলে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া যাবে না। শিক্ষকরাও পড়ান ওই গাইড বই দেখেই, পরীক্ষায় প্রশ্নও আসে ওই গাইড থেকেই। তাই আদরের মেয়েটাকে ভালোভাবে শিক্ষিত করার স্বপ্নে ঋণ-কর্য করে কিছুদিন আগে কিনে দিলেন ৯০০ টাকা মূল্যের ‘পপি’ সিরিজের সেই গাইড বই।
এ তো গেল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৬৩ নং নহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা।
একই চিত্র কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ধামঘর পূর্ব, রানীমুহুরী, সুবিলারচর, বোড়ারচর, নেয়ামতকান্দি, জাহাপুর, ধনীরামপুর, ১০১ নং রহিমপুর, মুরাদনগর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ২০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।
সরেজমিন গিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের জাঁতাকলে ঝরে পড়ছে অনেক দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনেক আগেই প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ করেছে। তারপরও মুরাদনগরের বাজারগুলোতে দেদার বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ সেই নোট ও গাইড বই।
এদিকে দোকানিদের দাবি, শিক্ষকরা যদি গাইড বইয়ে শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করে তাহলে আমরা চাইলেও গাইড বই বিক্রি করতে পারব না। তারা জানান, নোট ও গাইড প্রকাশনী সংস্থাগুলো বিদ্যালয় প্রধান ও শিক্ষকদের নানারকম সুবিধা দিয়ে গাইড বইয়ের চাহিদা ও দাম দুটোই বৃদ্ধি করে দিয়েছে। বিদ্যালয়গুলোকে ডোনেশনের নামে অনেক টাকা দেয় প্রকাশনী সংস্থাগুলো। সুবিধা দেওয়ার দৌড়ে যারা এগিয়ে আছে তাদের গাইড বইয়ের দাম বেশি হলেও বাজারে সেই বইয়ের চাহিদাই অনেক বেশি। কারণ শিক্ষকরা ওই গাইড পড়তেই শিক্ষার্থীদের চাপ দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘পপি’ প্রকাশনী একাই ৮০ শতাংশ বাজার দখল করে রেখেছে মুরাদনগরে।
ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নোট ও গাইড ব্যবসা বহু বছর ধরে চলে এলেও বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতির দোহাই দিয়ে তা আরও বেড়ে গেছে। এই পদ্ধতিতে পাঠদানে শিক্ষকরা যথেষ্ট দক্ষ নন বলে শিক্ষার্থীদের নোট ও গাইডের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছেন। এতে প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বিপরীতে লাভবান হচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে নহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফাসহ অন্য বিদ্যালয়ের প্রধানরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রয়োজনেই গাইড কিনছে।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান বলেন, প্রাইমারিতে গাইড বই একদম নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের গাইড বইয়ে উৎসাহিত করা এটি একটি অনৈতিক কাজ। যদি কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিন ভূঞা জনী জানান, নিষিদ্ধ নোট ও গাইডের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৬/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
