শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ জানুয়ারির মধ্যেই সব শিক্ষার্থী নতুন বই পেয়ে যাবে—আশ্বাস দিয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। কিন্তু সেই আশ্বাস পূরণ করতে পারেনি সরকারি সংস্থাটি। এখনো বই পায়নি অনেক শিক্ষার্থী। কারণ হিসেবে বই ছাপানোর কার্যাদেশে দেরি ও কাগজ সংকট তো আছেই, সেইসঙ্গে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমতার বাইরে বই ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া এবং তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বই আদায়ে এনসিটিবির ব্যর্থতাকে দূষছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, শিক্ষার্থীরা নতুন বই না পেলেও চড়া দামে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর বাংলাবাজার, নীলক্ষেতসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন লাইব্রেরিগুলোতে। শ্রেণি কার্যক্রমে সন্তান যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফুটপাত থেকে এসব পাঠ্যবই কিনছেন অভিভাবকরা।
গত সোমবার রাজধানীর নীলক্ষেত বই মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাতের ওপর চার-পাঁচটি দোকানে বোর্ড বই বিক্রি হচ্ছে। দোকানগুলোর সামনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ২০২২ শিক্ষাবর্ষের পুরোনো বই। তাদের কাছে নতুন শিক্ষাক্রমের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই আছে কিনা জানতে চাইলে কয়েকজন নেই বলে জানান। এই ‘না’ এর পেছনে ছিল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ। তবে, একটি দোকানে বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি দাম হাঁকানো শুরু করলেন। ষষ্ঠ শ্রেণির এক সেট বইয়ের দাম হাঁকালেন ২ হাজার টাকা। মার্কেটের ভেতরে গিয়ে আরেকটি দোকানের অস্তিত্ব পাওয়া গেল, যেখানে সরকারি পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সরাসরি গেলে তারা বোর্ড বই দেন না। সেজন্য বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করতে হলো। মাধ্যম ব্যবহার করে জানা গেল, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বোর্ড বই পুরো সেট তারা বিক্রি করছেন ৯০০ করে ১৮শ টাকায়।
বাংলাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশেই বিক্রি হচ্ছে বোর্ড বই। এখান থেকে ষষ্ঠ, সপ্তমসহ সব শ্রেণির বই সেট আকারে কেনা যায়। এর মধ্যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির প্রতি সেট বই ৬৫০ টাকা করে বিক্রি করছেন তারা। নীলক্ষেতের মতো তারাও এসব বই দোকানে রাখেন না। কেউ কিনতে আগ্রহী হলে মার্কেটের ভেতর থেকে এনে দেন।
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুগদা শাখার অনেক শিক্ষার্থী এখনো বোর্ড বই পায়নি। স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরহাম খানের বাবা জাকির হোসেন কালবেলাকে বলেন, গত সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুল থেকে আমার ছেলেকে কোনো বই দেয়নি। মঙ্গলবার কয়েকটি বই দেওয়া হয়েছে। এখনো সব বই দেওয়া হয়নি। অথচ স্কুলের পাশের লাইব্রেরিতেই সেট করে সব শ্রেণির বই বিক্রি হচ্ছে।
সরেজমিন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পার্শ্ববর্তী লাইব্রেরিগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ইংরেজি ভার্সনের প্রতিটি বই ১৫০ টাকা দরে পুরো সেট বিক্রি হচ্ছে ১৩০০-১৫০০ টাকায়। বিক্রেতারা এসব বই সামনে রাখেন না, কেউ কিনতে চাইলে দোকানের ভেতর থেকে এনে দেন।
এ বিষয়ে জানতে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফাওজিয়া রাশেদীকে কল করা হলে তিনি অভিভাবকদের তার কাছে অভিযোগ দিতে বলে কল কেটে দেন।
ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের কাছে প্রতিদিনই বই আসছে। আমরা প্রতিদিনই বই বিতরণ করছি। সপ্তম শ্রেণির বই নিয়ে সংকট ছিল। আস্তে আস্তে সেটা কমছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ বলেন, ঢাকার বিভিন্ন উপজেলায় জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে প্রাথমিকের বইয়ের সংকট ছিল। তবে এখন সংকট নেই, সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের বই পৌঁছে গেছে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের এলাকা সিলেটের বিয়ানীবাজার। এই উপজেলার কাকরদিয়া-তেরাদল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নিজাম উদ্দিন জানান, এনসিটিবিকে চারবার তাগাদা দিয়ে কিছু বই সংগ্রহ করতে পারলেও এখন পর্যন্ত ষষ্ঠ, সপ্তম ও নবম মিলিয়ে ১২০০-এর বেশি বই তিনি পাননি।
মৌলভীবাজার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলুর রহমান গত সোমবার বলেন, আমরা সপ্তম শ্রেণির ছয়টি বই এখনো পাইনি। আমরা মন্ত্রণালয় ও মাউশিকে বিষয়টি জানিয়েছি। এছাড়া, নবম শ্রেণির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের পাশাপাশি ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের বইগুলো এখনো আসেনি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, সাতটি উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বই আমরা পাইনি। বিভাগীয় উপপরিচালককে এ বিষয়টি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা উত্তম খীসা বলেন, কয়েকটি বিষয়ের বই আমরা এখনো পাইনি। নবম শ্রেণির ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক গ্রুপের বইগুলো আসেনি। এ ছাড়া সপ্তম শ্রেণির একটি বিষয়ের বই আসেনি। বিষয়টি আমরা এনসিটিবিকে জানিয়েছি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, প্রাক-প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বই শতভাগ চলে এসেছে। এছাড়া প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বইও এসেছে। তবে, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির তিনটি করে বই এসেছে, বাকি তিনটি আসেনি।
নোয়াখালী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নুর উদ্দিন মো. জাহাঙ্গীর বলেন, আমাদের কাছে আসা ৬৯ শতাংশ বই বিতরণ করা হয়েছে। আরও কিছু বই এসেছে। সেগুলো আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিব। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই আমরা কম পাচ্ছি।
ফেনী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্লাহ বলেন, আমাদের কাছে সব বই এসে পৌঁছায়নি। কোনো উপজেলায় ষষ্ঠ শ্রেণির বই বেশি পেয়েছে তো অন্য উপজেলায় সপ্তম বেশি পেয়েছে। সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশ বই এখনো বাকি। তবে, আশার কথা হলো প্রতিদিনই কিছু কিছু বই আসতেছে।
এনসিটিবি কর্মকর্তারা বলছেন, ছাড়পত্র অনুযায়ী, একটি প্রেস বাদে বাকিরা সব বই দিয়েছে। তবে, এটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, আগে বই বিতরণ করার পর সেটাকে ছাড়পত্রের আওতায় ধরা হতো। কিন্তু এখন বাঁধাই না হওয়া, বিতরণ না হওয়া বইগুলোকেও ছাড়পত্রের আওতায় দেখানো হচ্ছে। পাঁচটা বইয়ের দুটি প্রিন্ট হলেও ছাড়পত্র দিয়ে সেটার হিসাব দেখাচ্ছে এনসিটিবি। কতগুলো বই পাওয়া গেছে, উপজেলা থেকে তা অনলাইনে রিপোর্ট করা হয়, সেটা দেখলেও বোঝা যাবে এনসিটিবির তথ্য সত্য নয়।
প্রকাশকরা বলছেন, এক দিনে সর্বোচ্চ ৪০০ রিম কাগজ ছাপাতে পারে প্রেসগুলো। সে হিসাব ধরে ৬০ দিনের মধ্যে প্রেসগুলোকে বই ছাপিয়ে জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু, কাগজ, বিদ্যুৎসহ নানান সংকট বিবেচনায় আরও কয়েকদিন বাড়িয়ে ৭৫ দিন সময় দেওয়া হয়। এদিকে, দ্রুত কাজ তোলার জন্য কয়েকটি প্রেসকে সক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ দেওয়া হয়েছে। অল্প কয়েকটি প্রেসই পেয়েছে প্রাথমিকের ৬০ শতাংশ বই ছাপানোর কাজ। এর ফলে ওসব প্রেস নির্দিষ্ট সময়ে সব বই ছাপাতে পারেনি।
এ ছাড়া, গাইড কোম্পানির প্রেসকে দিয়ে বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে দেওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে তাদের কাছ থেকে বই পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মুদ্রণ সংশ্লিষ্টদের। তারা জানান, বারতোপা প্রিন্টার্স লিমিটেড পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। তাদের মূল ব্যবসা গাইড ছাপানো। তারা গাইড ছাপাতে গিয়ে পাঠ্যবই ছাপাতে দেরি করেছে। তবে, গাইড ছাপানোয় পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ দেরি হয়েছে, এ তথ্য সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বারতোপা প্রিন্টার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনুপ কুমার দে।
এনসিটিবি কর্মকর্তা বলছেন, অন্য সব প্রেস থেকে বই পেলেও এখনো বর্ণশোভা মুদ্রায়নে চার লাখ বই আটকে আছে। এ বিষয়ে বর্ণশোভা মুদ্রায়নের প্রকাশক মো. সাইফুল কুদ্দুস মুকুল কালবেলাকে বলেন, কাগজ সংকটের কারণে আমাদের বই পাঠাতে দেরি হচ্ছে। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই সব বই দিতে পারব।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, আমরা দ্রুতই বই পৌঁছাতে চাই। সে কারণে বর্ণশোভা কাজ জমা দিতে না পারলে অন্য কোনো প্রেসকে সেই বইগুলো ছাপানোর দায়িত্ব দেব। আর আগামী বছরের বই ছাপানোর কাজ আমরা এই বছরের মার্চ থেকে অল্প অল্প করে শুরু করব।
কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বই না পেলেও পাশের লাইব্রেরিতে বই পাওয়া যাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে স্কুলের সাথে লাইব্রেরিগুলোর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে সব প্রতিষ্ঠান এখনো বই পায়নি জানালে এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বলেন, এনসিটিবি থেকে বই ছাড় হয়েছে। থানা শিক্ষা অফিস থেকে আমরা যে তথ্য পেয়েছি, সে অনুযায়ী ৯৮ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার কথা। তার পরও শিক্ষার্থীরা বই না পেলে এখানে অন্য কারণ থাকতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছে করেই বিলম্বে বই নিচ্ছে কিনা তাও দেখা দরকার।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৬/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
