শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ নগরীর চট্টেশ্বরী রোডের পাশে নির্জন এলাকায় অবস্থিত চমেক হাসপাতালের প্রধান ছাত্রাবাস। শিবির কর্মী সন্দেহে গত বুধবার এই ছাত্রাবাসের ১৭ নম্বর কক্ষে আটকে রেখে চমেকের ৪ শিক্ষার্থীকে রাতভর পেটায় ১৬ শিক্ষার্থী। নির্যাতনকারীরা কক্ষটি প্রতিপক্ষকে নির্যাতনের জন্য টর্চার সেল হিসাবে ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, গত রবিবার নির্যাতনের শিকার ২ ছাত্রকে আইসিইউতে গিয়ে হামলাকারীরা হুমকি দিয়েছে, কাউকে ঘটনার বিষয়ে সাক্ষী দিলে আইসিইউ থেকে মর্গে পাঠানো হবে। এতে নির্যাতনের শিকার ৪ ছাত্র ও তাদের অভিভাবকরা আতঙ্কে রয়েছেন। এ ঘটনার পর সেখানে পুলিশ পাহারা দেওয়া হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে আহত শিক্ষার্থী জাহিদ হোসেন ওয়াকিল ও সাবিক হোসেন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হুমকির অভিযোগ উঠার পর ওয়ার্ডের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে চিকিৎসাধীন ওয়াকিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন অভিযুক্ত সাজু দাশ। তিনি ছাত্রলীগ কর্মী ও শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেলের অনুসারী হিসাবে পরিচিত। আর নির্যাতনের শিকাররা নাছির গ্রুপের কর্মী বলে জানা গেছে।
ওরা ভয়ংকর ১৬ জন: গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ৪ শিক্ষার্থীকে নির্যাতনকারীরা সংখ্যায় ছিল ১৬ জন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ৫৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রিয়াজুল ইসলাম জয় ও ৬০তম ব্যাচের অভিজিৎ দাশ। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ২ জনের অভিভাবক নির্যাতনের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে গত সোমবার কলেজ অধ্যক্ষ সাহেনা আকতারের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ বলেন, অভিযোগে ১১/১২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৫/৬ জন জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা লিখিত অভিযোগ তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিয়েছি। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যেভাবে নির্যাতন: লিখিত অভিযোগে নির্যাতনের বর্ণনায় জানানো হয়, বুধবার রাত ১টার দিকে প্রথমে সাকিবকে নিচতলার রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায় ৬২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জাকির হোসেন সায়েল, ইব্রাহিম সাকিব, মাহিন,সাজু দাশ ও সৌরভ দেবনাথ। এরপর তৃতীয় তলায় অবস্থিত ১৭ নম্বর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে ৫৯ তম ব্যাচের জাকির হোসের সায়েল, ৬০তম ব্যাচের অভিজিৎ দাশ, আকাশ, ৬১তম ব্যাচের সায়দুল ইসলাম হৃদয়, মো. হাবিব, ইমতিয়াজ আলম, নিবরাজ, ৬২তম ব্যাচের শোয়েব, চমন দাশ, ফাহিমসহ আরও ৪/৫ জন উপস্থিত ছিলেন। এরপর ডেকে আনা হয় জাহিদ হোসেন ওয়াকিল, আবু রাইয়াত ও মোবাশ্বির হোসেনকে। তারপর শুরু হয় নির্যাতন।
সাকিব ও ওয়াকিল নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, প্লাস্টিকের পাইপ, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, কাঠের লাঠি দিয়ে মাথা ও পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে মুখ বেঁধে মুখে পানি ঢালতে থাকে ইমতিয়াজসহ অন্যরা। রাতভর মারধর করার পর ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে তাদের রুমে পাঠানো হয়। আহতদের কাউকে কিছু না বলার জন্য হুমকি দিয়ে তারা বলে, কিছু বললে মেরে ফেলা হবে। ঘটনা জানাজানি হলে ছাত্রাবাস তত্ত্বাবধায়কসহ কয়েকজন শিক্ষক এসে ২ জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করেন। বাকি ২ জনকে নায়ায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারা সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হাফিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আহত ২ জনের লিখিত বক্তব্য পাওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং করেছি। ছাত্রাবাসের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। আহত ২ জন বাড়িতে রয়েছে। তাদের লিখিত বক্তব্য জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা রিপোর্ট জমা দেওয়া চেষ্টা করছি।’
প্রসঙ্গত, চমেক হাসপাতালে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপ শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান নওফেল ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাক সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসাবে পরিচিত। শুধু ছাত্রলীগই নয়, চমেকের শিক্ষক, ইন্টার্ন চিকিৎসক সকলেই দু’গ্রুপে বিভক্ত। এতদিন নাছির গ্রুপের একক আধিপত্য ছিল। সম্প্রতি চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসাবে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল মনোনীত হওয়ার পর তার অনুসারীরা আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। এতে দু’গ্রুপ প্রায় সময়ে মারামারিসহ নানা ঘটনা ঘটাচ্ছে।
গত ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আকিবকে লোহার রড ও ছুরি দিয়ে আঘাত করে মাথার হাড় ভেঙ্গে দেওয়া হয়। পরে তাকে চমেক হাসপাতালে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়। গত ২৭ এপ্রিল ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন। গত ১৭ জানুয়ারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশের ফার্মেসীতে হামলা চালায় ছাত্রলীগের একদল অনুসারী। দোকান কর্মচারী জনিকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/০২/২৩
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
