কোচিং-নির্ভর শিক্ষা ক্ষতিকর

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং উন্নয়নের চাবিকাঠি। শিক্ষা অন্ধকারকে দূরীভূত করে এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। তাই যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। জ্ঞান-বিজ্ঞানে যে জাতি যত উন্নত, প্রযুক্তির আবিষ্কার এবং অগ্রযাত্রায় সে জাতি তত বেশি এগিয়ে থাকে। প্রযুক্তির নিত্যনতুন আবিষ্কার সব সময় জ্ঞানী ব্যক্তিরাই করেছে। অশিক্ষিত কোনো জাতি উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এগিয়ে থাকতে পারে না। এটি সম্ভবও নয়। শিক্ষায় যে জাতি যত পিছিয়ে, উন্নয়ন এবং অগ্রগতিতেও সে জাতি তত পিছিয়ে। যুগে যুগে যে সব জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে ছিল, সে সব জাতিই সেই সময়ে উন্নত ছিল ও পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত জাতিই যুগে যুগে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আবার শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি সভ্যও হতে পারে না। তাই সভ্য হতে হলেও শিক্ষা লাগবে, উন্নত হতে হলেও শিক্ষা লাগবে। সুতরাং একটি আধুনিক, টেকসই এবং উন্নত জীবন গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা শুরু। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মানবজাতিকে উদ্দেশ করে বলেছেন- ‘পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আলাক, আয়াত-১)। আর মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: বলেছেন, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন করো’। কিন্তু মানব বসতির শুরুতে মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং তখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। মানুষের কাছ থেকেই মানুষ শিখত এবং একজন যা জানত তা অপরকে শেখাত। তখন প্রত্যেকেই ছিল শিক্ষক ও প্রত্যেকেই ছাত্র। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বেড়েছে এবং তারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। কালের পরিক্রমায় সময়ের অগ্রযাত্রায় জ্ঞানার্জনের জন্য দেশে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় জ্ঞানার্জনের জন্য আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে হাজারো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে আরো উন্নত লেভেলের প্রতিষ্ঠান। একজন মানবসন্তানের বয়স সাধারণত পাঁচ বছর হলেই জ্ঞানার্জনের জন্য প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হয়। যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা নিতে চায় তারা শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে। প্রাথমিক স্কুল সমাপ্ত করে হাইস্কুলে ভর্তি হয়। হাইস্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হয় এবং কলেজ শেষে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। আবার কিছু লোক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষ করে আবারো শিক্ষা অর্জনের নিমিত্তে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তারা ¯স্পেশাল কোনো বিষয়ে পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। আবার কেউ কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন না করলেও নিজেকে জ্ঞানার্জনে এবং জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত রাখেন। সময়ের ব্যবধানে এমন জ্ঞান সাধকরাই হয়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রথম সারির মানুষ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা অর্জনের প্রধান মাধ্যম হলেও আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে আরেক ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আর সেটি হচ্ছে কোচিং সেন্টার। আর এই কোচিং সেন্টারে ছাত্রছাত্রীরা টাকার বিনিময়ে শিক্ষা লাভ করে থাকে। আমাদের সময়ে বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলো পড়ার জন্য সীমিত পরিসরে কোচিং চালু থাকলেও এখন তা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের সময়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাই কেবল প্রাইভেট পড়াতেন এবং এর বাইরে তেমন কোনো কোচিং সেন্টার ছিল না। কিন্তু এখন স্কুল-কলেজের শিক্ষকের বাইরে অনেকেই কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক উচ্চশিক্ষিত যুবক এখন কোচিং সেন্টার পরিচালনাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে। এসব কোচিং সেন্টারে সব বিষয়ে পড়ানো হয়। স্কুল-কলেজের বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে এসব কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়, সেখানে ক্লাস করে এবং পরীক্ষা পাসের প্রস্তুতি নেয়। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য যেমন কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা হয়েছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন ক্লাসের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শিক্ষা লাভের জন্যও প্রতিষ্ঠা হয়েছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার। এসব কোচিং সেন্টারে সব সাবজেক্টের ওপর কোচিং করানো হয়। নিজ নিজ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা কোচিং সেন্টারে সে সব বিষয়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন। এসব কোচিং সেন্টারের পরিচালকরা বেশ ভালো টাকা আয় করে থাকেন। অনেকে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন। প্রকৌশল বিদ্যায় ডিগ্রি অর্জনকারী বহু প্রকৌশলী এখন প্রকৌশল সেক্টরে চাকরির পরিবর্তে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন এবং কোচিং করান। আবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকে এখন চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ না করে কোচিং করানোকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন এবং তারাও কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন এবং কোচিং করান। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকে চাকরি কিংবা ব্যবসার পরিবর্তে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন এবং কোচিং করান। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব কোচিং সেন্টারে ক্লাস চলে, আর ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে এখানে ক্লাস করে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকসহ সব ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এসব কোচিং সেন্টার কোচিং করায়। এক এক ক্লাসে ৪০-৫০ জন স্টুডেন্ট পর্যন্ত একসাথে ক্লাস করে। এসব কোচিং সেন্টার আজ হয়ে উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প পাঠশালা। স্কুল-কলেজে ক্লাস বাদ দিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী এখন নিয়মিত কোচিং সেন্টারে কোচিং করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বড় বড় শহরে এসব কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়ালে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনের পোস্টার আর পোস্টার। অনেক কোচিং সেন্টার আবার দেশব্যাপী তাদের শাখার মাধ্যমে কোচিং পরিচালনা করে। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য গড়ে উঠেছে ক্যাডেট কোচিং। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষে বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্যও আবার গড়ে উঠেছে নানা ধরনের কোচিং সেন্টার। এক কথায় চারিদিকে এখন কেবল কোচিং সেন্টার আর এখানে দল বেঁধে কোচিং করছে সব ক্লাসের হাজারো ছাত্রছাত্রী। কোচিং সেন্টারে কোচিং করাটা আজকে যেন শিক্ষা অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার পথ। আর কোচিং সেন্টারে কোচিং না করা মানে যেন শিক্ষা অর্জনে পিছিয়ে পড়া। মোট কথা, শিক্ষা ব্যবস্থাটা আজ কোচিং সেন্টারনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং দিন দিন এর পরিধি বাড়ছে। ছাত্রছাত্রীরা জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে আজ কোচিং করে শর্টকাট পথে ভালো রেজাল্ট করতে চায়।

কিন্তু কোচিং সেন্টারনির্ভর এই শিক্ষা, একটি শিক্ষিত জাতি গঠনের অন্তরায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। ছাত্রছাত্রীদের জানতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেকোনো শাখায় দক্ষ হতে হলে ওই বিষয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা ও সাধনা করতে হবে। আমাদের সময়ে এত বেশি কোচিং সেন্টার ছিল না এবং পড়াশোনা এত বেশি কোচিংনির্ভরও ছিল না। যুগে যুগে যে সব ব্যক্তি জ্ঞান-বিজ্ঞানে সফলতা অর্জন করেছে এবং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়ে আছে তারা কেউ কিন্তু এত বেশি কোচিং করেননি। তারা অধ্যয়ন করেছেন এবং নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়নই তাদেরকে জ্ঞানের জগতে সম্রাট বানিয়েছে। বিজ্ঞান কিংবা সাহিত্য সব ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য। আইনস্টাইন, নিউটন, মেরি কুরি, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস, আর্কিমিডিস, আলফ্রেড নোবেল, জেমস ওয়াট, মাইকেল ফ্যারাডে, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, গ্রেগর মেন্ডাল, জগদীশ চন্দ্র বসু, এ পি জে আব্দুল কালামসহ বিশ্ববিখ্যাত সব বিজ্ঞানী নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা ও গবেষণার মাধ্যমেই সফলতা অর্জন করেছেন। একই ভাবে শেকসপিয়র, জন মিল্টন, দান্তে, হোমার, টিএস এলিয়ট, লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, মার্ক টোয়েন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, আল্লামা ইকবাল, জালাল উদ্দিন রুমি, মির্জা গালিব, ওমর খৈয়াম, খলিল জিবরানসহ বিশ্ববিখ্যাত সব কবি সাহিত্যিকও নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা এবং গবেষণার মাধ্যমেই সফলতা অর্জন করেছেন।

তাই ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বলছি- তোমরা কোচিংয়ের পেছনে বেশি সময় ব্যয় না করে সেই সময়টুকু পাঠ্যপুস্তক অধ্যয়নের পেছনে ব্যয় করো। তোমরা পাঠ্যবইগুলো বারবার অধ্যয়ন করো। কোনো বিষয় না বুঝলে বা বুঝতে কষ্ট হলে তোমরা তোমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওই বিষয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে তা বুঝে নাও। এভাবে পড়লে সব বিষয় তোমার বুঝতে সুবিধা হবে এবং এক পর্যায়ে তা বুঝা হয়ে যাবে। কোনো একটি বিষয় এভাবে যদি একবার বুঝে যাও তাহলে ভবিষ্যতে আরো জটিল কোনো বিষয় বুঝতে আর কোনো সমস্যা হবে না। এভাবেই উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং জ্ঞানার্জনের পথে তোমরা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবে। তোমাদের সবারই মনে রাখতে হবে, কোনো পরীক্ষাতেই কিন্তু সিলেবাসভুক্ত বইয়ের বাইরে থেকে প্রশ্ন আসে না। সুতরাং তোমরা সবাই প্রতিটি বইয়ের প্রতিটি লাইন পড়ো, বুঝো এবং জানো। নোট এবং গাইড বই না পড়ে মূল বই পড়ো। একবার পড়া শেষ হলে আবার পড়ো এবং বারবার পড়ো। আর এভাবেই শিক্ষাজীবনে অধ্যয়ন করো এবং শিক্ষাজীবন শেষ করো।

শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য আবারো পড়াশোনা করো। আমি নিশ্চিত, নিয়মিত পড়াশোনা, পাঠ্যপুস্তকের খুঁটিনাটি অধ্যয়ন তোমাদের সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে এবং তোমরা অবশ্যই সফল হবে। সুতরাং আগে নিজে অধ্যয়ন করো, বুঝতে চেষ্টা করো। না বুঝলে শিক্ষকের কাছ থেকে বুঝে নাও। তারপরও বুঝতে কষ্ট হলে বা না বুঝলে তখন কোচিং সেন্টারের সাহায্য নাও। মনে রেখো, সার্টিফিকেট অর্জনের চেয়ে জ্ঞানার্জন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি। জ্ঞানার্জনে দক্ষ হলে কেউ তোমাকে আটকিয়ে রাখতে পারবে না। জ্ঞানার্জনে দক্ষ হওয়ার কারণে সার্টিফিকেট দুর্বল হওয়া সত্ত্বে ও অনেক মানুষ সফলতার শিখরে পৌঁছেছেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কারে অনেক ভূমিকা রেখেছেন। কোচিং সেন্টারের পেছনে না দৌড়ে, বই পড়ার পেছনে দৌড়াও। তাহলে তোমরা যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষ হবে, ঠিক তেমনি জাতি হিসেবেও আমরা দিন দিন আরো সমৃদ্ধ এবং উন্নত হবো। আর আমাদের এ পথেই হাঁটতে হবে।

লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১২/০২/২৩    


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.